নগরীতে আক্রান্তদের মধ্যে করোনায় পাঁচজন সুস্থ

আপডেট: জুন ৭, ২০২০, ১০:৩২ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) এলাকায় করোনাভাইরাসকে জয় করে ফিরেছেন ৫ জন রোগি। তারা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। সম্প্রতি তাদের নমুনা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করানোর পর ফল নিগেটিভ আসে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রাসিকের স্বাস্থ্য বিভাগ।
এদিকে রাসিক বিষয়টি নিশ্চিত করলেও রাজশাহী সিভিল সার্জনের পাঠানো প্রতিবেদনগুলোতে রাসিক এলাকার কোনো রোগিকে সুস্থ দেখানো হয়নি। সিভিল সার্জন অফিস থেকে প্রতিদিন নিয়মিত রাজশাহী জেলার করোনা আক্রান্ত ও সুস্থ হয়ে ফেরাদের তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
রাসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান ডা. আঞ্জুমান আরা জানান, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় শনিবার পর্যন্ত মোট ২০ জন করোনা আক্রান্ত রোগি শনাক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে রাবির একজন শিক্ষক ঢাকায় তার নমুনা পরীক্ষা করেন ও সেখানে করোনা পজিটিভ আসে। এই ২০ জন রোগির মধ্যে ১জন মারা গেছেন এবং পদ্মা আবাসিক এলাকা একজন মিশন হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিসাধীন আছেন।
রাসিকের এই কর্মকর্তা আরো জানান, এই রোগিদের মধ্যে ৫ জনের নমুনা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা করা হয়েছে। যেখানে তাদের ফল করোনা নেগেটিভ এসেছে। এদের মধ্যে ৩ জন একই পরিবারে সদস্য। এই ৫ জন এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। সংখ্যার হিসেবে রাসিক এলাকায় এই মুহূর্তে করোনা আক্রান্ত রোগি ১৪জন।
আরও দুই জনকে আমরা চিহ্নিত করেছি। তারা আগের চাইতে সুস্থ বোধ করছেন। সোমবার অথবা মঙ্গলবার এই দুজনের নমুনা আবারো টেস্ট করা হবে। আমরা আশা করছি তাদের ফলও নেগেটিভ আসবে।
এদিকে নগরীর উপর ভদ্রা এলাকার এই পরিবারটির প্রথম এক নারীর করোনা শনাক্ত হয় গত ১৫ মে। রাজশাহী মহানগরীতে শনাক্ত হওয়া প্রথম করোনা রোগী তিনি। তার নাম উম্মে কুলসুম (৫০)। কয়েকদিন পর তার স্বামী খাদেমুল ইসলাম (৬১) এবং মেয়ে রুকাইয়া ইসলামেরও (১৯) করোনা শনাক্ত হয়।
খাদেমুল ইসলাম বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। রুকাইয়া ইসলাম ঢাকা সিটি কলেজের মার্কেটিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তার মা উম্মে কুলসুম একজন গৃহিনী। তার ছোট ছেলে কাওসার ইসলাম কমল নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজের এইচএসসির ছাত্র।
উম্মে কুলসুম কাওসারের কাছেই গিয়েছিলেন মাস দুয়েক আগে। তারপর ফেরেন ১০ মে। সঙ্গে তার বড় ছেলে শিবলী ইসলাম কাননের স্ত্রী ফাহমিমা সাইফ রুমকিও ছিলেন। সেদিন ফেরার পথে লকডাউনের কারণে তারা পথে পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। তবে উম্মে কুলসুম কথা দিয়েছিলেন, বাসায় ফিরে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন। তিনি কথা রাখেন। বাসায় ঢুকেই তিনি বোয়ালিয়া থানায় ফোন করেন। এরপর পুলিশ তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করে।
এরপর বাইরে থেকে ফিরেছেন বলে উম্মে কুলসুম, তার ছোট ছেলে এবং পূত্রবধূর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ১৫ মে পরীক্ষায় দুইজনের রিপোর্ট নেগেটিভ হলেও উম্মে কুলসুমের করোনা শনাক্ত হয়। কয়েকদিন পর তার স্বামী এবং মেয়েরও করোনা পজিটিভ রিপোর্ট আসে। রুকাইয়া ইসলাম কয়েকদিন শারীরিকভাবে বেশ অসুস্থ ছিলেন। তবে তার বাবা-মায়ের তেমন উপসর্গ দেখা দেয়নি। এরই মধ্যে তাদের আবারও নমুনা সংগ্রহ করা হয়। দ্বিতীয় দফা এ পরীক্ষায় কয়েকদিন আগে সবার রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য গত শুক্রবার তৃতীয়দফা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষা শেষে শনিবার (০৬ জুন) রাতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস উম্মে কুলসুমকে ফোন করে জানিয়েছেন, তৃতীয় পরীক্ষাতেও তাদের তিনজনের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। তারা এখন করোনামুক্ত।
বিষয়টি স্বীকার করে নগরীর বোয়ালিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নিবারন চন্দ্র বর্মন বলেন, পরিবারটি খুবই সচেতন। কীভাবে করোনা জয় করতে হয় তা তারা দেখিয়ে দিলেন। আমরা তাদের ফুলের শুভেচ্ছা জানাব। এভাবে সব মানুষ যদি সচেতন থাকতেন তাহলে করোনা মোকাবিলা সহজ হয়ে যেত- যোগ করেন ওসি।
করোনাজয়ী খাদেমুল ইসলামের বড় ছেলে শিবলী ইসলাম কানন বলেন, আমার আম্মু রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মধ্যে প্রথম আক্রান্ত রোগী। তখন খুব খারাপ অনুভূতি ছিল। সেটা এ রকম যে, আমি আমার নিজের শহরটাকে বিপদে ফেলে দিলাম! আক্রান্ত হওয়ার চেয়ে আমাদের নিজেদের বেশি অপরাধী মনে হয়েছে। সেই টেনশন থেকেই আমরা সিরিয়াস হয়েছি। একজন থেকে বাড়িতে রোগী তিনজন হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ঘরে রেখে সবকিছু সামলেছে আমার স্ত্রী। কিন্তু আমরা এটা বলতে পারি যে, আমাদের পরিবার থেকে কোথাও করোনা ছড়ায়নি।
তিনি বলেন, সবেমাত্র আমাদের পরিবারকে করোনামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। এখনই কেউ বাসার বাইরে যাবে না। আমিও চাকরির সুবাদে বাইরে থাকি। কিন্তু রাজশাহী শহরের কোনো করোনা আক্রান্ত পরিবারের কারও কোন সহযোগিতা লাগলে অবশ্যই আমরা এগিয়ে যাব। কারণ, আমরা ওই সময়টা পার করেছি। আমরা বুঝেছি, সময়টা কত কষ্ট করে পার করতে হয়। এই সময়টা মানুষের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
শিবলী কানন বলেন, আমরা সুস্থতা পেয়েছি। আল্লাহ আমাদের সুস্থ করেছেন। আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া। করোনা জয় করার পর প্লাজমা ডোনেট করা যায়। এখন ডাক্তার যদি আমাদের পরিবারকে প্লাজমা দেয়ার পরামর্শ দেন, তাহলে আমরা অবশ্যই দেব। কারণ, আমাদের মাধ্যমে যদি কারও জীবন বাঁচে সেটা অনেক বড় পাওয়া। করোনায় পরিবারের তিনজন আক্রান্ত থাকার এই কঠিন সময় যারা সহযোগিতা করেছেন, সাহস জুগিয়েছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি।
দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। আর রাজশাহী জেলায় প্রথম শনাক্ত হয় ১২ এপ্রিল পুঠিয়া উপজেলায়। এরপর ১৫ মে রাজশাহী শহরে প্রথম শনাক্ত হন উম্মে কুলসুম।