নগরীতে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস পালনে সংবাদ সম্মেলন

আপডেট: মে ১৫, ২০২২, ১০:৫৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


নগরীতে ফারাক্কা লং মার্চ দিবস উদযাপন কমিটির পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস পালন করার লক্ষে দিবসের আগের দিন সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার (১৫ মে) বেলা সাড়ে ১১ টায় নগরীর সাহেব বাজারের চিলিজ রেস্টুরেন্টে এই দিবস উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

এতে জানান দেয়া হয়, সোমবার (১৬ মে) ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চ দিবস উপলক্ষে জনসভার মাধ্যমে রাজশাহীতে ৪৬ তম ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উদযাপন করা হবে।

বক্তারা বক্তব্যে দেশের নদ নদীসহ খাবার ও ফসলের পানি সঙ্কট এড়াতে এবং নদী বাঁচাতে কয়েকটি দাবি উত্থাপনের মাধ্যমে সোমবার এই জনসভা করবেন বলে জানিয়েছেন। তারা আরও জানান, আওয়ামী লীগ সরকারই নয় বিএনপি, জাতীয় পার্টি সরকারের আমেলও এমন লড়াই করা হয়েছে। বাংলার মানুষ প্রতিবাদী। পানি সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবেই।

১৯৭৬ সালের ১৬ মে রোববার রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে মাঠে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের লাখো মানুষকে নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন। ‘মরনফাঁদ ফারাক্কা ভেঙ্গে দাও, গুড়িয়ে দাও’ স্লোগানে তারা ভারতের ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখে লং মার্চ শুরু করেছিলেন। সেসময় আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচিত হয় এই কর্মসূচি।

বক্তারা আরও বলেন, ফারাক্কা লং মার্চ কমিটির বাংলার মানুষ সমুদ্র জয় করতে পারলে পানি সমস্যা সমাধানও করতে পারবেন। আন্তর্জাতিক আদালতে পর্যায়ের মধ্য দিয়ে পানি সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে জানান তারা।

এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন কমিটির আহ্বায়ক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, পদ্মার উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রতিবাদে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে মরণবাঁধ ফারাক্কা অভিমুখে লাখো জনতার লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক চাপে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি করে। কিন্তু পরে আন্তর্জাতিক সব আইন লঙ্ঘন করে ভারত একাই গঙ্গার পানি নিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। দুঃখের বিষয় হলো, এতো বছর সমাধান হয়নি ফারাক্কা বাঁধের কারণে সৃষ্ট সমস্যা। এখনও ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় পানির আধার কমে যাচ্ছে।

তিনি জানান, ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশের মাটির উর্বরাশক্তি কমে গেছে। দেশের প্রায় ২১ শতাংশ অগভীর নলকূপ ও ৪২ শতাংশ গভীর নলকূপ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। গঙ্গার পানি চুক্তির পর বাংলাদেশে গঙ্গার পানির অংশ দাঁড়িয়েছে সেকেন্ডে ২০ হাজার ঘনফুটের কম।

অথচ ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমেও বাংলাদেশ ৭০ হাজার কিউসেকের চেয়ে বেশি পানি পেত। এখন ফারাক্কা বাঁধের কারণে দেশের প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাবে পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় টিউবওয়েলের পানি খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রচলিত ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। নদীতে মাছ না থাকায় হাজার হাজার জেলে বেকার। লবণাক্ততার কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রায় ১৭ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে।

মাহবুব সিদ্দিকী আরও বলেন, গঙ্গা নদীতে দেওয়া ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে ভাটিতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২ কোটি মানুষ সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের আরও প্রায় ৪ কোটি মানুষ ও এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ এলাকায়ও সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আর্থিক হিসাবে বছরে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তখন থেকে আজ অবধি প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সরকারসহ সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান এই নদী গবেষক।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের রাজশাহীর সভাপতি এনামুল হক, সাধারণ সম্পাদক আলী হোসেন পিয়ারা, রাজশাহী অ্যাডভোকেট বার সমিতির সাধারণ সম্পাদক পারভেজ তৌফিক জাহেদী, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের রাজশাহীর সাবেক সভাপতি ডা. ওয়াসিম হোসেন, বাসদের রাজশাহীর সদস্য শামসুল আবেদীন ডন, ব্যবসায়ী নেতা ফরিদ মামুদ হাসান, সমাজ তান্ত্রিক ছাত্রদলের আহ্বায়ক রিদম শাহরিয়ার, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক নাদিম সিনাসহ আরও অনেকে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফারাক্কা লংমার্চ দিবস উপলক্ষে সোমবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর পাঠানপাড়ায় লালন শাহ মুক্তমঞ্চে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। এই জনসভায় সকল স্তরের মানুষকে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।