নগরীতে লকডাউন : হাসপাতালসহ জরুরি সেবায় যুক্তদের ভোগান্তি

আপডেট: জুন ১২, ২০২১, ১০:১৮ অপরাহ্ণ

মাহাবুল ইসলাম:


রাজশাহীতে করোনার ভারতীয় ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ রোধে চলছে কঠোর লকডাউন। প্রশাসনের ঘোষণাকৃত ৭ দিনের দ্বিতীয় দিনে লকডাউন কঠোরভাবে বাস্তবায়নে নগরীজুড়ে বাড়তি তৎপরতা দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর। জরিমানাসহ শাস্তিমূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা নিতেও দেখা গেছে। এতে নগরী প্রায় ফাঁকা ছিলো। গণপরিবহণও চলাচল করেছে হাতে গোনা। সুযোগ নিয়েছেন এসব চালকরাও। এতে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরিয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছে অনেকেই। স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও গাড়ি না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। ভোগান্তির শিকার এসব মানুষ লকডাউন চলাকালীন জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলোকে বিশেষ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন।
শনিবার (১২ জুন) নগরীর গুরুতপূর্ণ এলাকাগুলো ঘুরে দেখা যায়, প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী নগরীর মার্কেট, দোকানপাট, শপিংগুলো বন্ধ ছিলো। সকালের দিকে দু’একজন ব্যবসায়ী দোকান খোলার চেষ্টা করলে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি পরিবহণ ছাড়া নগরীর সকল যানবাহন চলাচল কড়াকড়িভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নগরীর প্রতিটি মোড়ে মোড়ে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখিন হতে হয়েছে সকল পরিবহণকে। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে এসেছেন- এটা প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। এককভাবে যেসব ব্যক্তি জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বেরিয়েছেন তাদের কেউ ভোগান্তির শিকার হতে দেখা গেছে। গাড়ি না পেয়ে এদের অনেকেই পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছেছেন। নগরীতে এদিন দুপুর পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের ৩ টি ভাম্যমাণ টিম ১৮ টি মামলাসহ সাড়ে ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করেছে।
নগরীর প্রবেশমুখগুলোতে প্রশাসনের তৎপরতা ছিলো বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও গোদাগাড়ির পরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণে এই মহাসড়কের একাধিক জায়গায় চেকপোস্ট বাসানো হয়েছে। বিশেষ করে এই এলাকার মানুষের নগরীতে প্রবেশের প্রধান পয়েন্ট কাশিয়াডাঙ্গা এলাকায় প্রশাসনের বাড়তি তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। এতে এই মোড় প্রায় ফাঁকা ছিলো। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা বলছেন, কঠোর নজরদারির মধ্যে দিয়ে শুধু জরুরি প্রয়োজনে নগরীতে প্রবেশ ও বাইরে বের হতে দেয়া হচ্ছে। মাস্ক না থাকলে তাকে নগরীতে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে।
এদিন, নগরীর সাহেব বাজার মাস্টারপাড়া কাঁচাবাজার, টিসিবির পণ্য বুথ ও করোনা টেস্টের বুথগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বেশি ছিলো। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতায় বাড়তে থাকে। এতে নগরীর গাড়ি চলাচল একেবারেই কমে যায়। এসময় বাজার করতে আসা অধিকাংশ মানুষকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে দেখা গেছে। নগরীর আমসহ ফলের দোকানগুলো খোলা থাকলেও ক্রেতা ছিলো না বললেই চলে। সকালের দিকে কিছু মুদি দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা না থাকায় সেগুলোও অনেক ব্যবসায়ী বন্ধ করে দেন।
এমন পরিস্থিতিতে হাতেগোনা যে কয়েকটি গাড়ি নগরীতে চলছিলো তারা যাত্রীদের থেকে সাত-আটগুন বেশি ভাড়া আদায় করছিলেন। চালকরা বলছেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে, কখনো অনেক অনুরোধ করে ঝুঁকি নিয়ে তারা গাড়ি চালাচ্ছেন। কখনো গাড়ির বাতাস ছেড়ে দিচ্ছে। এমন অবস্থায় কিছুটা ভাড়া বেশি না হলে কেমন করে হবে। অবশ্য বাড়তি ভাড়াতেই অনেককেই তার গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা গেছে। আবার অনেকেই গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে গেছেন।
ভোগান্তির শিকার হয়েছেন জরুরি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। তারাও গাড়ি না পেয়ে পায়ে হেঁটে রোগীর সেবার প্রত্যয়ে ফিরেছেন কর্মক্ষেত্রে। হঠাৎ লকডাউন দেয়ায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
জানা যায়, শুক্রবার বিকেল থেকে লকডাউন দিলেও শনিবার দুপুর পর্যন্ত সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্য পরিবহণের ব্যবস্থা করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এতে শুক্রবার রাতে বাড়ি ফেরার সময় গাড়ি না পেয়ে অনেকেই ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে নারীরা পড়েছিলেন বিপাকে। শনিবার সকালেও অনেকেই পায়ে হেঁটে অফিসে এসেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রামেক হাসপাতাল সেবার সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি জানান, এখানে সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীরা অধিকাংশই অটো কিংবা অটো রিকশায় চলাচল করেন। কিন্তু হঠাৎ লকডাউন ও পরিবহণকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করাই শুক্রবার রাতে ও শনিবার সকালে অনেকেই বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে হাসপাতালে আসতে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তারা জানিয়েছেন। কিন্তু এইভাবে যদি গাড়ি চলাচলে নিয়ন্ত্রণ আনা হয় তাহলে রোগীসহ আরো অনেকের সমস্যা হবে। সুতরাং লকডাউন চলাকালীন জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলো চিন্তা করে স্থানীয় প্রশাসনের একটি সুন্দর ব্যবস্থাপনার দাবি করেন তারা। একইসঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই পরিবহনের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সুব্যবস্থার দাবি জানান।
এবিষয়ে রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, হঠাৎ করে লকডাউন দেয়ায় এবং গতকাল (শুক্রবার) সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় তারা হাসপাতালের স্টাফদের জন্য বাসের ব্যবস্থা করতে পারেননি। এতে হয়তো তাদের যাতায়াতের কিছুটা সমস্যা হয়েছে। তবে শনিবার দুপুর থেকে দুইটা বাস চালু করা হয়েছে। এই সমস্যা আর থাকবে না।
এদিকে, লকডাউনে গাড়ি না চলায় স্বজনের বাসায় যাওয়ার সময় আম নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তেও দেখা গেছে অনেককেই। অনেকেই মনে করেছিলেন, অন্যান্য বারের এবারো হয়তো ঢিলেঢালাভাবে লকডাউন চলছে। এতে আম পচে যাওয়ার আগে স্বজনের বাসায় পৌঁছে দিতে গিয়ে নগরীর মোড়ে মোড়ে পুলিশের বাঁধায় গাড়ি না পেয়ে মাথায় বোঝা নিয়েও পথ চলতে দেখা গেছে অনেককেই।
নগরীর কাঁঠালবাড়িয়া এলাকায় দুই বৃদ্ধ নারীকে কোমরে আমের ব্যাগ নিয়ে পথ চলতে দেখা যায়। জামিলা বেগম ও রহিমা বেগম নামের এই দুই নারী জানান, তারা দুই বোন। গাছের আম পেকে পচে যাচ্ছে। তাই এই আমগুলো তারা মেয়ের বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু রাস্তার কিছুদূর আসতেই পুলিশ গাড়ি আটকে দেয়। তাদের শরীরও ভালো নাই। এখন গরমের মধ্যে হেঁটেই যাচ্ছেন। আর লকডাউনে একটাও গাড়ি পাবেন না এটা তাদের জানা ছিলো না।
রাজশাহী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শরিফুল হক জানান, করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ রোধে এবার অন্যান্যবারের চেয়ে অনেকটাই কঠোরভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যেন ভোগান্তির শিকার না হন সেক্ষেত্রে তারা সচেষ্ট আছেন। তবে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতে পারে। এটা যেন না ঘটে সে দিকে তারা লক্ষ্য রাখবেন।
তিনি আরো জানান, রামেক হাসপাতালের স্টাফদের জন্য সেখানকার কর্তৃপক্ষ বাসের ব্যবস্থা করেছেন। এরপরেও যদি কোনো প্রয়োজন হয় তারা চাইলে তারা সহযোগিতা করবেন।#

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ