নগর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে পদ্মার প্রবাহ

আপডেট: মার্চ ১০, ২০১৭, ১২:১৭ পূর্বাহ্ণ

বুলবুল হাবিব



রাজশাহী নগর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে পদ্মার পানির প্রবাহ। নদী সংলগ্ন তীর থেকে পদ্মার পানির প্রবাহ সরে গিয়ে সেখানে ধু ধু করছে বালুর চর। উৎসমুখ থেকে আসা পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে পানির সঙ্গে আসা পলি জমা হয়ে চর পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা ও নিয়মিত ড্রেজিং করা উচিত বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ-ত্রিশ বছর পর নদীর গতিমুখের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনটা ঘটে প্রাকৃতিকভাবে। তবে চাইলে পরিবর্তনটা নিজেদের সুবিধার্থে করা যায়। এর জন্য প্রয়োজন পড়ে নদী বিষয়ে জ্ঞান। নদীর গতি প্রকৃতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্যাদি। কিন্তু পদ্মায় চর পড়াটা মনুষ্যসৃষ্ট। কারণ প্রতিবছর বর্ষাকালে উৎস মুখ থেকে পানির সঙ্গে আসা পলি জমা হয়ে চর পড়ে। বর্ষাকালে পানি নেমে যাওয়ার পর পলিগুলো জমা হয়ে থেকে যায়। বর্ষাকাল ব্যতিত অন্যান্য সময়ে পানির প্রবাহ কম থাকায় পলিগুলো সরে যেতে পারে না। তখন চর পড়ে। এজন্য নদীতে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা ও নিয়মিত নদী ড্রেজিং করা উচিত।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েকবছর আগেও নদীর তীর ঘেঁষেই পানির প্রবাহ ছিল। বিশেষ করে নগরীর পঞ্চবটি, কুমারপাড়া, ফুদকি পাড়া, বড়কুঠি, দরগাপাড়া এলাকার তীরবর্তী জায়গা ঘেঁষে পদ্মার পানির প্রবাহ ছিল। গতবছর বড়কুঠি পদ্মা গার্ডেনের তীর ঘেঁষেই ছিল পদ্মার পানির প্রবাহ। সেখানে গ্রীষ্মকালেও পানির ¯্রােত ছিল। বিনোদনপ্রেমীরা নৌকায় চড়ে ভ্রমণ করতো। অথচ এই বছরে সেখানে ধু ধু করছে বালুর চর। পদ্মার পানির প্রবাহ সরে গেছে বহুদূর পর্যন্ত। একই অবস্থা নগরীর দরগাপাড়া লালন শাহ মঞ্চ সংলগ্ন পদ্মায়ও। গত কয়েক বছরে ওই এলাকায় পদ্মার পানির প্রবাহ বহুদূর পর্যন্ত সরে গেছে।
কুমারপাড়া এলাকার ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধ নিখিল সেন বলেন, ষাট-সত্তর সালের দিকে পদ্মার পানির প্রবাহ ছিল মধ্যচরে। এখন যেখানে চর পড়ে আছে ওই এলাকায় ছিল বাড়িঘর। কিন্তু তীর ভাঙতে ভাঙতে পদ্মা সরে এসে বর্তমান অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে তীর ঘেঁষেই বহু বছর ধরে নদীতে পানির প্রবাহ ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে আবার পদ্মার পানির প্রবাহ সরে যাচ্ছে। গত বছর যেখানে পানির প্রবাহ ছিল এখন সেখানে চর পড়েছে।
নৌকার মাঝি ইয়াকুব আলী বলেন, গতবছর গ্রীষ্মকালেও নৌকায় ভ্রমণ পিপাসুদের ভিড় ছিল। কারণ গতবছর পদ্মায় গ্রীষ্মকালেও পানির ¯্রােত বেশ ভালো ছিল। এইবছর পদ্মা অনেক দূর সরে গেছে। ফলে লোকজন অত দূরে গিয়ে আর নৌকায় চড়তে চায় না। পদ্মার চরেই হেঁটে বেড়ায়।
রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী ফাতেমা সীমা বলেন, নিরাপত্তার কারণেই কেউ আর মধ্য চরের পাশে প্রবাহিত পদ্মায় নৌকা চড়তে চায় না। আগে তীর ঘেঁষেই পানির প্রবাহ ছিল ফলে তখন গ্রীষ্মকালেও নৌকায় চড়া যেত। তার চেয়ে এখন এই ধু ধু পদ্মার চরে হেঁটে বেড়ানোই মানুষজন বেশি নিরাপদ মনে করে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, পদ্মার পানির প্রবাহ দূরে সরে গিয়ে চর পড়েছে। এটা মনুষ্যসৃষ্ট কারণেই ঘটেছে। কারণ পানির উৎস মুখ থেকে পানির প্রবাহ সেই অর্থে নেই। পানির উজানে বাঁধ দেয়ার কারণে পানির প্রবাহ অনেক কমে গেছে। ফলে বর্ষাকালে পানির সঙ্গে আসা পলি জমা হয়ে থেকে যাচ্ছে। তখন পানির প্রবাহ বেশি থাকে। অথচ পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে পানির ¯্রােত কমে যাওয়ায় পলিগুলো সরে যেতে পারছে না। তখন চর পড়ছে। কিন্তু অন্যান্য সময়ে বাঁধের গেট খোলা থাকলে পানির প্রবাহ ঠিক থাকতো। ফলে চর পড়তো না। এইজন্য সারাবছর পানির প্রবাহ ঠিক রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
গোলাম সাব্বির সাত্তার আরো বলেন, এছাড়া চর পড়া স্থানে ড্রেজিং করে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা হয় না। নিয়মিত ড্রেজিং করা হলে পানির প্রবাহ ঠিক রাখা সম্ভব হতো।