নজরুলের স্বাদেশিকতা

আপডেট: অক্টোবর ২৭, ২০১৯, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ড. মোহা. আজমল খান


বিংশ শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্যবর্তী উপনিবেশিক শাসনের এক অস্থির সময়ে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে কাজী নজরুল ইসলামের আবির্ভাব। নজরুল একই সঙ্গে অগ্নিবীণা, বিদ্রোহী, সাম্যবাদী, সর্বহারা, প্রলয়শিখা, ফনিমনসা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গানের রচয়িতা। অপরদিকে তিনি নবযুগ, ধুমকেতু, লাঙল, সেবক নামক প্রত্রিকার সাংবাদিক। আবার কখনো দোলন চাঁপা, চক্রবাক, সিন্ধু হিন্দোলে তিনি প্রেমিক কবি। সে সময়ের সমকালীন রাজনীতিক নানান অনুষঙ্গ প্রতিনিয়ত তাঁকে সংক্ষুব্ধ করে তোলে। তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় আন্দোলনের সঙ্গে নজরুলের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তাই প্রথম মহাযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮), রুশ বিপ্লব (১৯১৭), মোস্তফা কামাল (১৮৮১-১৯৩৮) এর তুরস্ক বিজয় (১৯১২), মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধীর (১৮৫৬-১৯৪৮) অসহযোগ আন্দোলন, আলি ভাতৃদ্বয়ের খিলাফত আন্দোলন এবং শেরে বাংলা একে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনদাশ (১৮৭০-১৯২৫) ও কমরেড মুজফফর আহমদ (১৮৮৯-১৯৯৩) এর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সান্নিধ্য নজরুলের মানস চেতনাকে আলোড়িত করেছিল। সুভাষচন্দ্র বসুর (১৮৯৭-১৯৪৫) সঙ্গে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে গিয়ে তিনি গান পরিবেশন করেছেন এবং বিপ্লবীদের সঙ্গে আড্ডা দিয়েছেন। রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য রাজরোষানলে পড়ে কারাবাস করেছেন। তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকদের শাসনের বিরুদ্ধে ধনী-দরিদ্র সকল মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার এমনকি দেশীয় জোতদার ও মালিকদের অর্থনৈতিক পীড়নের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিলেন। ফলে, প্রায় সকল শ্রেণির জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থীদের সমবেত উম্মাদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। তাই তাঁর কণ্ঠ রোধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের রোষও বারবার তৎপর হয়েছিল। সমাজের মানুষকে এক আসনে দেখতে সোচ্চার ছিল তাঁর সাম্যবাদী চেতনা। অপরদিকে তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন ধুমকেতু পত্রিকাতে। সমাজের যাবতীয় ভণ্ডামী ও অসাম্য এবং ধর্ম ও রাজনীতির নামে শোষণের বিরুদ্ধেই ছিল তাঁর সত্যকণ্ঠ প্রতিবাদ।
শৈশবের অসহনীয় দারিদ্র তাঁকে উৎপীড়িত ও শোষিতের প্রতি করেছিল সহানুভূতিশীল। তাঁর লেখনিতে উচ্ছ্বাসতা এনেছিল ছোট বেলায় ঘর ছাড়া। সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে এনে দিয়েছিল দুঃসাহস। এসবই তাঁকে উৎপীড়ক ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে সাহায্য করেছিল। নজরুল তাঁর রচনায় পরাধীন বাঙালি জাতিসত্তার বহুমুখী বঞ্চনা, অসন্তোষ ও বিক্ষোভই প্রধানত উচ্চারিত হয়েছে। জাতি, বর্ণ, ধর্ম, গোষ্ঠী সকলের ঊর্ধ্বে তিনি স্বদেশ তথা মানুষকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সর্বাত্মক গণজাগরণ, বৈষম্য, মুক্তি, সমাজ এবং পরাধীনতার চির অবসান। তাঁর কাছে মুক্তির অর্থ রাজনীতি ও শাসনের চিরাচরিত ধারার বিলোপ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিচিত্র ধর্মীয় ও সমাজিক কুসংস্কার থেকে মুক্তি।
প্রথম বিশ^যুদ্ধের সময় বিজলী ও মোসলেম ভারত পত্রিকায় একই সঙ্গে প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্রোহী এমনই খ্যাত হয় যে তা অতি দ্রুত নজরুলের নামের আগে স্থায়ীভাবে বিদ্রোহী কবি যুক্ত হয়ে যায়। বিদ্রোহী কবিতার অগ্নিঝরা পঙতিগুলির মধ্যে –
‘ যবে উৎপীড়নের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবেনা,
অত্যাচারীর খড়গকৃপানভীম রণ ভূমে রনিবেনা-
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত। ’
কবির বর্ণনায় পরাধীন ভারতবর্ষের অমানবিক অত্যাচার ক্লিষ্ট সমাজের চিত্র পরিস্ফুটিত। ইংরেজ শক্তির দানবীয় আক্রোশ বাজপাখির মতো নির্মমতা ভারতবর্ষের বুকে পদাঘাত করেছে। দেশকে এই অশুভ শক্তির হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি সত্যপুরুষকে আহবান জানিয়েছেন। যে অত্যাচার ক্লিষ্ট ভারত মাতাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। তাঁর ‘পথিক’ কবিতায় ভারতকে স্বাধীন করতে মুক্তিপাগল এক অকুতোভয় সৈনিককেই আহবান জানিয়েছেন। ‘বিদ্রোহীর বাণী’ কবিতায় কবির স্বাদেশিক বোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে
‘ আমরা জানি সোজা কথা, পূর্ণ স্বাধীন করব দেশ
এই দুলালুম বিজয় নিশান, মরতে আছি মরব শেষ। ’
এছাড়াও এ কাব্যের তূর্য নিনাদ, পাগল পথিক, বোধন, উদ্ধোধন, অভয়মন্ত্র, আত্মশক্তি, মরণ-বরণ প্রভৃতি কবিতায় স্বদেশের জন্য বাঙালিকে তিনি উদ্দীপনার মন্ত্র শুনিয়েছেন। নজরুল চেয়েছিলেন ভারতবর্ষকে স্বাদেশিকতায় উজ্জীবিত করে বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে স্বাধীন করতে। তাই ‘শিকল পরার গানে’ কবি বলেছেন
‘ মোরা আপনি মরে সবার দেশে আনব বরাভয়
মোরা ফাঁসি পরে আনব হাসি মৃত্যু জয়ের ফল। ’
১৯১৪ সালে বিষের বাঁশী ও ভাঙার গান কাব্য দুটি ব্রিটিশ রাজ রোষে পতিত হয়। ‘ভাঙার গান’ কাব্যটি ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে অপরিসীম দুঃখ ও লাঞ্ছনার প্রতিবাদ। নজরুল তাঁর এ কাব্যে আত্মশক্তির উদ্ধোধন ঘটিয়ে বিপ্লবী মন্ত্রে স্বদেশবাসীকে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন। তাই সকল বন্দিত্ব ও অসহায়ত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন
কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙে ফেল, কররে লোপাট
রক্ত জমাট
শিকল পরার পাষাণ বেদী।

লাথি মার ভাঙরে তালা
যতসব বন্দিশালায়
আগুন জ¦ালা
আগুন জ¦ালা, ফেল উপাড়ি।
এমন গান কোনো বঙালি কবি এর আগে রচনা করেন নি। সেই সময়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংগ্রাম চলমান ছিল। ব্যাপক ধরপাকড় ও জেলে পোরার মাধ্যমে আন্দোলনকে দমানোর জন্য বৃটিশ সরকার মরিয়া হয়ে ওঠে। সেই জেল-জুলুমের মধ্যে তাঁর ক্ষুরধার লিখন ভারতবাসীকে পরাধীনতার বিরুদ্ধে স্বদেশ প্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান এর মত সর্বহারা কাব্যের কবিতাগুলো জনমনে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তরুণদের মুখে মুখে সর্বহারার বাণী উচ্চারিত হতো। যেমন ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতায়
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সম্ভরন,
কান্ডারী আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ।
তেমনি ফরিয়াদ কবিতায়
সদা রবে সরকার টুটি চিপে,
এ নহে তব বিধান।
সে সময়ে বৃটিশ সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টে বলা হয়েছে সর্বহারার প্রতিটি কবিতায় বিপ্লবের সুর ‘Almost all the poems breath a spirit of revolt’
নজরুলের লেখনীতে বিদ্রোহীর সুর অব্যাহত থাকায় ১৯৩১ সালে ‘প্রলয় শিখা’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’ কাব্য দুটি বাজেয়াপ্ত করা হয়। ‘প্রলয় শিখা’ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে এক প্রলয়ের সৃষ্টি করেছিল। অল্পদিনের মধ্যে রাজদ্রোহিতার অভিযোগে নজরুল গ্রেফতার হন। সেই সময়ে গান্ধী-আর উইন চুক্তি হয়। সেই চুক্তির শর্তানুসারে নজরুলকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অনুরূপভাবে ‘চন্দ্রবিন্দুর’ কবিতাগুলিতে দেশত্মবোধক সুরের তীব্রতা লক্ষ্য করা যায়।
যেমন ‘তোবা’ কবিতায়
‘ দ্যাখে হিন্দুস্তান সাহেব মেমের
রাজা আংরাজ হারাম খোর
ওদের পোষাকের চেয়ে অঙ্গই বেশি
হাটু দেখা যায় হাটিলে জোর। ’
এছাড়া সমকালীন স্বদেশ, সমাজ, রাজনীতির প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ঠাট্টা-তামাসার চিত্র এ কাব্যগন্থের অন্যান্য কবিতার মধ্যেও সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়।
কবিতার মত নজরুলের লেখা প্রবন্ধগুলোও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদেরে বিরুদ্ধে ক্ষুরধার তরবারী হয়ে দাঁড়ায়। ধুমকেতু, নবযুগ, লাঙল, সেবক, গণবাণী প্রত্রিকায় প্রকাশিত মূলত যে প্রবন্ধগুলো তা সশস্ত্র আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদ, অসহযোগ, বঙ্গভঙ্গ, খিলাফত আন্দোলন প্রভৃতির নানামুখী সমকালীন চিত্র উল্লিখিত প্রত্রিকাগুলোতে আলোচিত হয়। তিনি তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থে পরাধীনতার লাঞ্ছনা, অসহ্য দারিদ্র ও দুঃখ কষ্ট, সমাজের ভণ্ডামী ও ধর্মের রাজনীতির নামে অসংখ্য রকম শোষণের বিরুদ্ধে ভারতবাসীকে জাগ্রত করে তোলেন। তাই প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবানী ১৯২২ সালে বৃটিশ সরকার কতৃক বাজেয়াপ্ত করা হয়। যুগবানীর প্রথম প্রবন্ধ নবযুগ এ নজরুলের আহ্বান
‘এ সুর নবযুগের। সেই সর্বনাশা বাঁশির সুর রুশিয়া শুনিয়াছে, আয়াল্যান্ড শুনিয়াছে তুর্ক শুনিয়াছে আরো অনেকে শুনিয়াছে এবং সেই সঙ্গে শুনিয়াছে আমাদের হিন্দুস্তান, জর্জরিত, নিপীড়িত, শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষ।’
নজরুল সম্পাদিত পত্রিকা ‘ধুমকেতু’। এই ধুমকেতু ১৯২২ সালের আগস্ট মাসের ১১ তারিখে প্রথম প্রকাশিত হয়। ধুমকেতুর মধ্য দিয়ে অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের ব্যর্থতার বিরুদ্ধে শক্তি সংগ্রহ করে বিপ্লব ও বিদ্রোহ জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন নজরুল। এই ধুমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি ভারতবর্ষের রাজমর্যাদাকে গভীরভাবে আঘাত করে। নজরুল দুর্দশাগ্রস্ত ভারতবর্ষে মাতৃআবাহন করলেন তীর্যক ভঙ্গিতে
আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল।
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
দেব-শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,
ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী?
মাদীগুলোর আদি কোষ ওই অহিংসা-বোল নাকি-নকি,
খাঁড়ায় কেটে কর মা বিনাশ নপুংসকের প্রেমের ফাঁকি।
হান তরবার; আন মা সমর, অমর হবার মন্ত্র শেখা,
মাদীগুলোয় কর মা পুরুষ, রক্ত দেখা, রক্ত দেখা।
এ কবিতার বিদ্রুপতা নজরুলের তীব্র জালার উদগীরণ। এ কবিতা রাজশক্তির বিরুদ্ধে শানিতধার তরবারী। তাই ধুমকেতুর উক্ত সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করা হয়। এ কবিতা প্রকাশের পর নজরুলের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। রাজদ্রোহিতার অভিযোগ এনে অপরাধী সাব্যস্ত করে বিচারক সুইন হোর আদালতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারা অনুসারে তাঁর এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। নজরুল এ মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে আদালতে যে জবানবন্দি দেন তা ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ বলে আখ্যায়িত। যা নজরুলের একটি অনন্য সৃষ্টি যা ধুমকেতুতে প্রকাশ করা হয়। সেখানে তিনি বলেন-
‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি রাজকারাগারে বন্দী ও রাজাধারে অভিযুক্ত, একধারে রাজার মুকুট, আরধারে ধুমকেতুর শিখা, একজন রাজা, হাতে রাজদন্ড, আর একজন সত্য, হাতে ন্যায়দন্ড।’
স্বদেশ প্রেমের অপরাধে বিচারের প্রহসনকে নজরুল তাঁর অভিভাষণে নিজস্ব যুক্তি দেখিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছেন।
ধুমকেতুর পথ প্রবন্ধে তিনি স্বাধীনতার সপক্ষে তীব্র অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি ভারতবর্ষকে স্বাধীন দেখতে চান পরিপূর্ণভাবে।
‘সর্বপ্রথম ‘ধুমকেতু’ পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমানু অংশও বিদেশীদের অধীন থাকবে না ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ন স্বাধীনতা রক্ষাকরা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়ের হাতে। তাতে কোন বিদেশীদের মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না।’
তৎকালীন রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে নজরুলের যত এমন সুস্পষ্ট করে আর কেউই উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদী ছিলেন না। এ সাহসী উচ্চারণ তাঁর কবিতা, প্রবন্ধ, অভিভাষণ, পত্রিকার সম্পাদকীয় ছাড়াও কথাসহিত্যেও বিশেষতঃ উপন্যাসের নায়ক চরিত্রে প্রতিফলিত। নজরুলের প্রথম পত্র উপন্যাস ‘বাঁধনহারা’ এর নায়ক নুরুল হুদার মধ্যে যে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে তা যেন নজরুলেরই স্বদেশ চেতনা।
উপন্যাসের বর্ণনায় এক জায়গায় বলেছেন
‘যে মহান অদম্য উৎসাহ আর অসমসাহসিকতা নিয়ে তরুন যুবা তোমরা সবুজ বুকের তাজা খুন দিয়ে বীরের মতো স্বদেশের মঙ্গল সাধন করতে দুর্গম দুর করতে ছুটে গিয়েছ, তা হেরেমের পুরস্ত্রী হলেও আমাদের মতো অনেক শিক্ষিতা ভগিনীই বুঝেন, তাই আজ অপরিচিতার অশ্রু তোমাদের জন্য ঝরছে।’
‘মৃত্যুক্ষুধা’ মূলতঃ সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের সুখ-দুঃখ আর জীবন সংগ্রামের আখ্যান। মূলত সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শাসক ও তাদের কূটকৌশলের কাছে পরাজিত এদেশের অশিক্ষিত অনাহারী মানুষের জীবানালেখ্য এ উপন্যাসটি। এ উপন্যাসে আনসারের বক্তব্যে নজরুলের সাম্যবাদী বিম্ব একেবারে সুস্পষ্ট-
‘তার মানে কোন এক শুভ প্রভাতে মাথাটা দেহের সঙ্গে নন্-কোঅপারেশন করে বলবে এই তো? তা ভাই, যে দেশের মাথাগুলো নোয়াতে নোয়াতে একেবারে পায়ের কাছে এসে ঠেকেছে, সে দেশের দু-একটি মাথা যদি খাড়া হয়ে থেকে তার ঔদ্ধত্যের শাস্তিস্বরূুপ খাড়ার খাই লাভ করে তাহলে হেঁট মাথাগুলোর অনেকখানি লজ্জা কমে যাবে মনে করি।’
‘কুহেলিকা’ উপন্যাসের চরিত্রসমূহে সন্ত্রাসবাদী আচরণ বিষয় বস্তুগত কারণে আভাসিত হলেও এর অন্তর্বয়নে স্বদেশানুরাগের পরিচয় সুস্পষ্ট। এ উপন্যাসে যেমন সন্ত্রাসবাদী দলের নেতা বলেন-
‘আর ইরান-তুরানের দিকে যে ওরা চেয়ে আছে ওদের খুব বেশী দোষ দেওয়াও চলেনা। দুর্বল মাত্রেই পরমুখাপেক্ষী। যে মাটি ওদের ফুলে ফলে শস্যে জলে জননীর অধিক স্নেহে লালন পালন করেছে সেই সর্বসংহা ধরিত্রীর মূক মাটির ঋণের কথা স্বরণ করিয়ে দিতে হবে।’
এভাবে নজরুল এদেশের মাটি, মানুষ এবং মানুষের ভালবাসার ঋণের কথা স্মরণ রেখে সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হয়েছিলেন। সাহিত্যকে নান্দনিক গুরুত্ব থেকে টেনে এনে স্বদেশিক দায়িত্ব বোধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।
লেখক: নজরুল গবেষক