নজরুল স্মরণ

আপডেট: আগস্ট ২৭, ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির:


অনেক সময় হুজুগ আর ক্ষমতাবানদের তুষ্টির বিষয়টি সামনে রেখে ব্যক্তির নান্দী-পাঠ চলে। অন্তরের ছোঁয়া বা বাস্তবের মাপকাঠিতে তা যাচাই হয়না। মানুষকে চমক দেয়ার জন্য কিছু চেনামুখ মঞ্চে অবতীর্ণ হন। আমরা মূল সত্য থেকে বিচ্যুত হই। ভারতের আদি কবি হিসেবে কথিত বাল্মীকি এবং জ্ঞাত ইতিহাসের ভারতীয় প্রথম মানববাদী কবি কালিদাসের কবিত্বের স্ফুরণ নিয়ে কিছু কল্পকথা প্রচলিত আছে। পরবর্তীকালের পাঠক তা নিয়ে তেমন প্রশ্ন তোলেনি। এখনো যে তার পুনরাবৃত্তি হয় না, তা নয়। কখনো সাম্প্রদায়িক জোশে আবার কখনো হীনমন্যতা বশে।
এরিস্টটলের ভাষ্য: মানুষ ফেরেস্তা বা শয়তান নয়। মানুষ মানুষই। তবে ‘মোরাক্কাবুন মিনাল খাতায়ে ওন্নিশিয়ান’ অর্থাৎ ত্রুটি ও বিস্মৃতি প্রবণতার সমন্বয়ে সৃষ্টি। সে মানুষ কবি হোন অথবা অকবি। কিছু মানুষের মাঝে আবেগের প্রাবল্য। আবার কেউ কেউ শুষ্কং কাস্টং। এটা সৃষ্টির লীলা।
নজরুল আপাদমস্তক মানুষ এবং যা কিছু তাঁর সৃষ্টির পশরা সবই মানুষের জন্য। তাঁর বিশ^াস: ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’ এই যে মানুষের জন্য দায়বদ্ধতা, তা তিনি ভোলেন নি বলে শিল্পকে নিখুঁত করতে গিয়ে মানুষকে খর্ব করেন নি। তাঁর সৃষ্টভুবনের কুশীলবগণ ‘কান্না হাসির দোল দোলানো পৌষ ফাগুনের মেলা’র মাঝে মাটির কাছাকাছি মানুষ। রবীন্দ্রনাথ বোধকরি এবংবিধ অভিব্যক্তিকে স্মরণ করে লিখেছিলেন: ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি, সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।’ তিনি স্রোষ্টার উদ্দেশ্যে আরো বলেছিলেন: ‘অগ্নিবীণা বাজাও তুমি কেমন করে।’ মানুষের কবি নজরুল অগ্নিবীণা বাজালেন আপন সুরে। তিনি ঘোষণা দিলেন: ‘আমি সেইদিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।’ তিনি আবেগের উচ্ছ্বাসে বিস্মৃত হয়েছেন, ‘মর্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে এ জগতে।’ কবি ওয়ার্ডস ওয়ার্থের ভাবনা, ইমোশান রিকালেকটেড ইন ট্রাঙ্কুয়িলিটি’তে অনেক ক্ষেত্রে আবদ্ধ থাকতে পারেন নি। আবেগের আতিশয্যে রাজনীতির মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছেন। সফল হননি। বরং দারিদ্রের কষাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন। কবির কৃষ্ণনগরে অবস্থানের দিনগুলি ফিরে দেখলে আমরা বুঝবো তা কতখানি অসহনীয় ছিলো। সেখানে বসেই তিনি ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের প্যাকালে কুর্শি-রেতোকামার-মেজোবৌ এর জীবনচিত্র এঁকেছিলেন।
কৃষ্ণনগরে বসে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ রচনার আগে ‘সিন্ধুহিন্দোল’ কাব্যে (১৩৩৪) ব্যক্তিগত দারিদ্র্য লাঞ্ছিত জীবনের কথা বলেছিলেন ’দারিদ্র্য’ কবিতায় আমরা লক্ষ্য করবো, পারস্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি ওমর খৈয়ামের সাথে নজরুল ইসলামের কী আশ্চর্য মানস-সাযুজ্য। নজরুল খৈয়ামভক্ত এবং রুবাইয়াতের অতুলনীয় অনুবাদক, সৈয়দ মুজতবা আলী অনুবাদের ভূমিকায় যথার্থই বলেছিলেন নজরুল ‘সকল কাজের কাজী’। সেই জীবন যন্ত্রণার বয়ান কবি ওমর খৈয়াম দিয়েছেন এইভাবে : ‘বিষণœ অন্তর মোর চেয়েছি যখনি গাহিবারে আনন্দের গান,/ হে আকাশ বুকে তুমি হেনেছ তখনি/ নিদারুন বজ্রসম বান। … ফেলিয়া দিয়াছ মোরে নির্বিচারে
ধূলি পরে রুধিরাক্ত প্রাণ।’ (রুবাইয়াতে ওমর খৈয়াম)
সমাজসৃষ্ট বৈষম্যের ফলে জীবনক্লিষ্টতার পরিচয় দিতে গিয়ে নজরুল উচ্চারণ করলেন:
দুঃসহ দাহনে তব হে দর্পী তাপস,
অম্লাণ স্বর্ণেরে মোর করিলে বিরস,
অকাশে শুকালে মোর রূপ রস প্রাণ’। (‘দারিদ্র’)
কবি নজরুল ‘সর্বহারা’ কাব্যের ‘সাম্যবাদী’ কবিতাগুচ্ছ প্রকাশ করলে উন্নাসিক তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ কটাক্ষ করে বলতে থাকেন, মার্ক্সীয় তত্ত্ব তিনি গভীরভাবে পড়েন নি। কবি তাঁর ‘আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় তাদের কটাক্ষের কথা স্মরণ করে বলেছেন: ‘পড়ে নাক বই, বয়ে গেছে ওটা’। না তিনি বয়ে যাননি। বরং হাতে কলমে জীবনতন্ত্র পাঠ গ্রহণ করেছেন রক্তাক্ত অভিজ্ঞতায়। জীবনযন্ত্রণার অভিঘাতে যে গরল তিনি পান করেছিলেন, তাই দিয়ে তাঁর সৃষ্টির পশরা সাজিয়েছেন। বাস্তব জীবনকে ফাঁকি দিয়ে অলীক শিল্পসাধনা তিনি করেন নি।
করোনাক্লিষ্ট বিশে^র শোষিত মানুষ দেখছে, মহামারি নিয়েও মানবতার কী অপমান! শ্রেষ্ঠত্ব আর অভিজাত্যের বড়াই। নজরুল সেই তথাকথিত অভিজাত্যের বিষদাঁত ভাঙতে চেয়েছিলেন প্রায় শতবর্ষ আগে।
অধিকাংশ সাধারণ মানুষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাঝে সংস্কৃতির স্বাদ পান। মোতাহের হোসেন চৌধুরী এ বিষয়টি সরস উল্লেখ করেছেন। নজরুল ইসলাম এই বোধের আগেই হিন্দু-মুসলমানের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে ছোট করে দেখেন নি। বরং সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে তুলে মুসলিম শাক্ত-বৈষ্ণব ধারার অভিব্যক্তিকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছেন। সমাজের উচ্চ-নিচ ধনী-দরিদ্রের বিষম প্রাচীর যেমন ভাঙতে চেয়েছেন, তেমনি সাংস্কৃতিক ভুবনকে করতে চেয়েছেন উন্মুক্ত।
ধর্ম বিশ্বাসীদের মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হওয়া পরিবেশ প্রত্যক্ষ করে কবি ইকবাল ‘শেকওয়া’য় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছিলেন:
“কাহ্র তো এ হায় কাফের কো মিলে হুর-আওরকসুর/ বেচারে মুসলমান কো ফাকাৎ ওয়াদায়ে হুর।” অর্থ: দুঃখের বিষয়, অবিশ^াসীরা পায় অতুল ললনা (হুর) আর বিলাসী বালা খানা। হতভাগা আত্মসমর্পণকারীদের জন্য কেবল হুরের অঙ্গীকার! নজরুল ইসলাম সেই সুরে সুরমিলিয়ে ‘ফরিয়াদ’ করেছিলেন: “তোমারে ঠেলিয়া তোমার আসনে বসিয়াছে আজ লোভী” তবে আর দেরি নয়, স্রষ্টার ‘দেওয়া এ বিপুল পৃথ্বি সকলে করিব পান।’ এ অভিযোগ আর আকাক্সক্ষা বঞ্চিত মানুষের। এ বঞ্চনা ছিলো, আছে বা থাকবে বলে আত্মসমর্পণ আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মনুষ্যত্বের পরিচায়ক নয়। নজরুল ইসলাম মানুষের বিদ্রোহী সত্তার সাথে পরিচিত ছিলেন বলে ঘোষণা করতে দ্বিধা করেননি; আবারও উচ্চারণ করি: ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!’ (মানুষ, সর্বহারা)
বঙ্গবন্ধু জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় জেলে কাটিয়েছেন, শোষণমুক্ত সমাজ এবং বাধাহীন সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য। তাই তাঁর স্বপ্নের অগ্রপথিক কবি কাজি নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসতে বিলম্ব করেননি। কারণ নজরুল কৈশোরে ‘রাজপুত্র’ পালাগান রচনাকালে স্বাধীনতার স্বাদ পূর্ণ করার অভিলাষে লিখেছিলেন: “দেখিলাম কিন্তু নিরবধি স্বদেশ জাগিছে অন্তরে”। এই আগস্ট মাস, তাঁদের প্রয়াণকে শোকার্ত হৃদয়ে স্মরণ করে তাঁদের আদর্শ বাস্তবায়নে ব্রতী হতে পারাই বোধকরি আজকের করোনা আক্রান্ত দিনে সবার মানুষ হবার সাধনা করে যেতে পারাই হবে বাঞ্ছনীয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ