নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে

আপডেট: জুন ৫, ২০২২, ১২:৪৫ পূর্বাহ্ণ

ওয়াসিফ রিয়াদ, রাবি:


চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠনে যুগোপযোগী করে তুলতে প্রণয়ন করা হয়েছে নতুন শিক্ষাক্রম। ২০২৩ সাল থেকে চালু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রমকে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা ইতিবাচক বলে মনে করছেন। নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষাব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনবে বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

তবে কিছু প্রতিবন্ধকতাকে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছেন শিক্ষাবিদরা। কেমন হবে এই শিক্ষাক্রম, কি ধরণের প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে এই শিক্ষাক্রমে এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক সোনার দেশের এক সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন ও শিক্ষাবিদরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল খালেক বলেন, শিক্ষার্থীদের জাতীয় কল্যাণের জন্যই এটি করা হচ্ছে। আগের দিনে যেমন আটস্, সায়েন্স কমার্স আলাদা ছিলো না, মেট্রিক পর্যন্ত একই সিলেবাস ছিলো। আমরাও সেভাবে পড়াশোনা করেছি। একদিক থেকে সেই পড়াশোনা ভালো ফল এনে দিয়েছিলো। এখন সেই বিষয়টি একটু আলাদা করে করা হয়েছে। মাধ্যমিকের পর যে যেই বিষয়ে এক্সপার্ট হবে সেই সেক্টরেই চলে যাবে।

তিনি বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই দেয়া হচ্ছে। অনেকেই ভাবছেন এটি বাস্তবায়ন হবে কি না। কিন্তু আমি মনে করি এটি অনেক চিন্তা ভাবনা আলাপ আলোচনা করে করা হয়েছে। এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা থাকছে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, বর্তমান বিশ্বে দক্ষতার মূল্য অনেক ওপরে। এজন্য কারিগরী শিক্ষার পাশাপাশি নতুন শিক্ষাক্রম নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আমি মনে করি। বিশ্লেষকরা বলছেন- আগামী বছরেই ২ কোটি থেকে ৭ কোটি লোক চাকরি হারাবে। এরপর ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী ৩৪ শতাংশ রোবোটস্ এর আন্ডারে চলে যাবে। এর সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের যে বিপুল জনগোষ্ঠী সেই কর্মের জায়গাগুলো নেই। একারণেই আমাদেরকে আধুনিক শিক্ষার দিকে যেতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এতো বেশি কাটা ছেঁড়া হয়েছে যে এটা বেশ উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁরিয়েছে। আমরা শুধু বাচ্চাদের কাঁধে বই তুলে দিচ্ছি। তাদের মধ্যে অন্যকিছু বিকশিত হতে দিচ্ছি না আমরা। শিক্ষার বাইরেও যে সহ শিক্ষা রয়েছে, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড রয়েছে, কো-কারিকুলার একটিভিটিস রয়েছে যেগুলো আমাদের শিক্ষাকে সু-সঙ্গত করে সেগুলোতে আমাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

তিনি আরও বলেন, আগামীর দিনে ডিগ্রির থেকে যেটা বেশি মূল্যায়ন করা হবে সেটা হলো দক্ষতা। আমাদের বাচ্চারা অহরহ জিপিএ-৫ পাচ্ছে, কিন্তু তারা কিছু জানতে পারছে না। ঠিক একারণেই বিশে^র সাথে তাল মিলিয়ে চলতে এবং আমাদের শিক্ষাকেও সেই উপযোগী করে তুলতে হবে।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-উর রশিদ আসকারী বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় সংস্কার নিয়ে আসবে। বর্তমানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিভিন্ন ধরণের চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আসবে। এই দিক থেকে শিক্ষার যে প্যারাডাইম, এর ব্যাপক পরিবর্তনের দরকার আছে। এই প্রয়োজনের সূত্র ধরে আমাদের যে সংস্কার সেটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আমি শিক্ষাব্যবস্থার এই পরিবর্তনকে ইতিবাচক ভাবেই দেখছি।

তিনি আরও বলেন, নতুন শিক্ষাক্রমটি বাস্তবায়ন করতে কিছু প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে। আমরা শিক্ষার্থীদের যে প্যারাডাইম শিক্ষার কথা বলছি, এটা শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, শিক্ষকদেরও ক্ষেত্রেও প্যারাডাইম শিফট করতে হবে। আমাদের শিক্ষকদের আরও দক্ষ করে তুলতে হবে। আমার মনে হয় একটি বিশেষ স্কিল দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় কেউ টিকে থাকতে পারবে না। সুতরাং আমাদের পরিবর্তনশীল দক্ষতার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য শিক্ষকদেরকে বিভন্ন সময় সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সর্বদা এগিয়ে থাকতে হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক আক্তার বানু আল্পনা বলেন, আপাত দৃষ্টিতে আমার মনে হচ্ছে এটি একটি ভালো উদ্যোগ। বাস্তবায়ন হলে সার্বিক বিষয়টি বোঝা যাবে। তবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বাচ্চাদের চাপ কমিয়ে আনা দরকার, তাদের স্বাধীনতা দরকার। তাদেরকে চিন্তা ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় যে পরিমাণ পরীক্ষা হয়, শিক্ষার্থীরা যেন অসুস্থ প্রতিযোগীতায় যোগ দেয়। একজন তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন প্রায় দশ থেকে এগাড়ো ঘন্টা পড়তে হয়, এবং একের পর এক পরীক্ষা। পাশাপাশি সেই সুযোগটা কোচিং সেন্টারগুলো লুফে নেয়।

তিনি বলেন, যদি নতুন শিক্ষাক্রম সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না করা হয় তাহলে এটা বিপরীত ফল দিতে শুরু করবে। যেহেতু পরীক্ষা থাকছে না, সেহেতু কি জন্য শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনযোগী হবে? এজন্য শিক্ষার্থীদের ক্লাসের প্রতি যত্নশীল করত সেই পরিমাণ দক্ষ শিক্ষকও দরকার। ক্লাসগুলো আকর্ষনীয় করে তোলা এবং শিক্ষা দেয়ার ধরণে অনেক প্রতিনিয়তই পরিবর্তন করতে হবে।

নতুন শিক্ষাক্রম সূত্রে জানা যায়, প্রাক্-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিদ্যমান পরীক্ষার চেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (শিখনকালীন) বেশি হবে। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা হবে না, পুরোটাই মূল্যায়ন হবে সারা বছর ধরে চলা বিভিন্ন রকমের শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে।

পরবর্তী শ্রেণিগুলোর মূল্যায়নের পদ্ধতি হিসেবে পরীক্ষা ও ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রম দুটোই থাকছে। নতুন শিক্ষাক্রমে এখনকার মতো এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা হবে না। শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে হবে এসএসসি পরীক্ষা। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে। প্রতি বর্ষ শেষে বোর্ডের অধীনে এই পরীক্ষা হবে।

এরপর এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া নতুন শিক্ষাক্রমে এখন থেকে শিক্ষার্থীরা দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন সিলেবাসে পড়বে। আর শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, মানবিক না বাণিজ্য বিভাগে পড়বে, সেই বিভাজন হবে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে।

গত ৩০ মে দেশের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় রকমের পরিবর্তন এনে প্রণয়ন করা প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের নতুন শিক্ষাক্রমের রূপরেখা। রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) যৌথ সভায় এই রূপরেখার অনুমোদন দেওয়া হয়।

যা সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বছর পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলটিং) বাস্তবায়ন শেষে আগামী বছর থেকে বিভিন্ন শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম পর্যায়ক্রমে চালু হবে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি; ২০২৪ সালে তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণি; ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণিতে চালু হবে। এরপর উচ্চমাধ্যমিকের একাদশ শ্রেণিতে ২০২৬ সালে এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ২০২৭ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে।