নববর্ষের অঙ্গীকার : বাংলা-বাঙালিত্ব ভালোবাসি

আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০১৭, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

সুজিত সরকার


নববর্ষের প্রাক্কালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গেছেন তাদের স্বার্থ পূরণের জন্যে এটা বিএনপি নেতা-কর্মীদের বক্তব্য। তারা বলেছেন, বাংলাদেশ কেবল দেবে, নেবে না কিছুই। নিতেও পারবেন না। অন্যদিকে বিএনপি’ থিঙ্কট্যাঙ্গ নোবেল ক্রেতা ড. ইউনূস আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে ফোন করেছিলেন শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে। যে দুষ্কর্ম ভারতকে দিয়ে করানোর প্রস্তাব বিএনপি করেছিলো, সেই বিএনপি কী করে ভারতের বিরোধিতা করে দেশময় নৈরাজ্য সৃষ্টির ফাঁদ পাতে? শেষে তো সেই ষড়যন্ত্রকারীরাই ধরা খেলো, নাকি? আসলে ‘চোরায় না শোনে ধর্মের কাহিনি’ প্রবাদটা এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রযোজ্য। চোরা-ষড়যন্ত্রকারীদের এমন মন্তব্য এবং প্রতিদিনের কর্মকা- কতোটা অবিবেচকের পক্ষে করা সম্ভব, তা তাদের অতীত বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে। এ বিশ্লেষণের জন্যে মাত্র একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছিলেন তখন তিনি ভারতে গিয়েছিলেন। ভারত থেকে যেদিন ফিরেছিলেন, সেদিনই তাৎক্ষণিক তাকে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করেছিলেন, পানি চুক্তির বিষয়ে কতোদূর এগোলেন? এ বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে কি না? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘ও প্রসঙ্গে কথা বলতেই ভুলে গেছি।’ তাহলে তার সফরের লক্ষ্য যথার্থ ছিলো না। লক্ষ্যহীন, ¯্রফে ভ্রমণ বিলাসিতা। ওই সফরে দেশ ভারত থেকে কিছু এনেছিলো নাকি দিয়েছিলো, এখন সে প্রশ্নটা মৌলিক। উত্তর ¯্রফে বিলাসিতার বিদেশ ভ্রমণ। বিএনপি বিলিয়ে দিয়েছিলো জাতীয় সম্পদ নয়তো ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে দেশের মান-সম্মান বিসর্জন।
বঙ্গবন্ধু হত্যার আগে এদেরই বংশধরেরা ভারতকে তাদের পহেলা নম্বরের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধির ২৫ বছরের বন্ধুত্ব চুক্তিসহ পারস্পারিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও স্মারক স্বাক্ষর সবই ছিলো দেশ বিক্রির চুক্তি? সে সব কথা তারা সহ¯্রবার উচ্চারণ করে জাতিকে বিভ্রান্তির ভেতরে ফেলেছে। কিন্তু মোস্তাক-জিয়া ক্ষমতা দখল করে সে চুক্তি বাতিল করেননি। স্বাধীনতা বিরোধী বেশ কিছু রাজনীতিক দল ও সংগঠন পরাজিতদের অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে প্রচার করেছিলো লুঙ্গি ফেলে ধুতি পড়তে হবে। মুসলিম নারীদের শাঁখা-সিঁদুর পড়তে হবে। মসজিদে আযান হবে না, শঙ্খধ্বনি হবেএমন হরেক অপপ্রচার তারা করে তারা বঙ্গবন্ধু হত্যার নীল নক্সা এঁকেছিলো। ক্ষমতা দখল করে সামরিক সরকারকে বাংলাদেশকে উল্টো ভারতেরই সদিচ্ছের ওপর তাদের ওঠ্-বোস্ করিয়েছে। ভারতকে সংকটে ফেলার লক্ষ্যে দেশে তারা জঙ্গি-সন্ত্রাসী আর চাঁদাবাজির চাষ করেছে। ফলে ১০ ট্রাক অস্ত্র, তিন ট্রাক গোলাগুলি পাচারের আয়োজন করে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সন্ত্রাসীদের কাছে তারাই পাঠাচ্ছিলো সেগুলো। ভারতের সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিবেশ জামাত-বিএনপি জোটের সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছে। তারা বন্ধু সেজে পেটে ছুরি চালানোর লক্ষ্যে। এ ¯্রফে পাকিস্তানি কৌশল। অবশ্য তারা যে পাকিস্তানি অসভ্যতায় আস্থাশীল, নিজামীর ফাঁসির রায় ঘোষণা পর সেটা পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপিও প্রমাণ করেছে। বার বার তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধার সৃষ্টি করেছে। এ বিচার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয় বলে বিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দেশময় ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ অব্দি পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ পুড়িয়েছে। দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টিসহ বিডিআর বিদ্রোহেও ইন্ধন জুগিয়েছে। ঢাকায় শাপলা চত্বরে ধর্মান্ধদের সমাবেশ থেকে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়, তার পেছনেও বিএনপি নেত্রী বক্তব্য ও পৃষ্ঠপোষকতা ছিলো দিবালোকের মতো সত্য। এ সব দুষ্কর্মে দেশও যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাস-জঙ্গির উত্থান ঘটলে তার দ্বারা নিজের দেশও যে আক্রান্ত হয়, সে প্রমাণ যুদ্ধাপরাধী নিজামী-বাবর-তারেক সাফল্যের সঙ্গে রেখেছে।
বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে ততোটুকুই বন্ধুত্ব করেছে, যতোটুকু নিজেরা পাবে। অবশ্য এটা সত্যি, বিশ্বময় বাণিজ্য বৈষম্য রয়েছে। শিল্প প্রধান ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বৈষম্য থাকাটা অযৌক্তিক নয়। অনেকটা পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রে অন্যান্যভাবে যেমন-যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন, গ্যাস-বিদ্যুৎখাতে উন্নয়ন, জঙ্গি-সন্ত্রাস দমনে পারস্পারিক সহযোগিতা ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। কেনো না, একটি দেশের উন্নয়নে এ সবই প্রধান অন্তরায়। সংকট সৃষ্টি করে। সংকট মোকাবেলা বিশ্বের প্রতিটি দেশ অভিন্ন মতাদর্শের হওয়া নিরীহ-শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রত্যাশা। সরকার জনগণের সে প্রত্যাশা পূরণে অগ্রাধিকার দেবে। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে এই সংকট থেকে নিষ্কৃতি পেতে যারা বাধার সৃষ্টি করে, মুখরোচক বক্তব্য দিয়ে জনমানসে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, তারা নির্ভেজাল জাতির আকাক্সক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে, তা প্রমাণ করে।
এ দেশ থেকে অন্য দেশের আর্থ-বাণিজ্যিক সমতা মেলানো যাবে না। সে হিসেব করতে গেলে হতাশই হতে হবে। তার পেছনে কারণ আমরা নিজেরাই। শহরের ভেতরে ট্যানারি রাখতে হবে, শিল্পপতিদের এমন আচরণ গণবিরোধী। নদী দখল কিংবা বিল দখল সবই রাজনীতিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় হয়। অতীতেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। কিন্তু সেখানে একা কেউ রাজপুত্র নয়। এই সব ক্ষমতাধর রাজপুত্রের বিষাক্ত নখ উপড়াতে পারলে সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচির বাধাও দূর হবে। সেটার জন্যেও পারস্পারিক সহযোগিতা এবং সখ্য। এ দেশ থেকে কোনো সন্ত্রাসী কিংবা জঙ্গি অপরাধ করে যাতে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিতে না পারে, নিলেও যাতে তাকে ফেরৎ এনে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যায়, তার জন্যে চুক্তি অনস্বীকার্য। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের আসামিদের ভারত থেকে এনেই বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে যোগাযোগ। সুস্থ ও নির্বিঘœ যোগাযোগ ব্যতীত বাণিজ্য প্রসারিত হয় না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যদি আলোচনা ও চুক্তির আলোকে স্থল-বিমান ও নৌ যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারে, বাংলাদেশ লাভবান হবে। বাংলাদেশের নিকট শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত। নানা সম্পদে পরিপূর্ণ তারা। পাট-চা-গার্মেন্টস্ দিয়ে যদি আমরা কয়লা-পাথর-বিদ্যুৎ-যন্ত্রপাতি ইত্যাদি তাদের কাছে নিতে পারি ক্ষতি কী? ইরান-পাকিস্তানের সঙ্গেও ভারতের এমন চুক্তি রয়েছে। সৌদির সঙ্গেও নানামুখি বাণিজ্যিক চুক্তি ভারতের আছে। তাহলে সে দেশগুলো কি ভারতের দালাল নাকি তারা ভারতকে কেবল দিচ্ছে আর ভারত বিনিময়ে ‘কলা’ দেখাচ্ছে। এমন চিন্তা অপরাজনীতির ঘুণে ধরা মেধা ও মনন থেকেই সঞ্জাত। প্রকৃত রাজনীতি এমন নয়। হালে বাংলাদেশ নিজস্ব তহবিল দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করতে পারতো না এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির অবস্থারও উন্নয়ন হতো না। এ সবই ওই যে প্রবাদে আছে ‘দেখতে নারি চলন বাঁকা’র মতো। অর্থাৎ যাকে পছন্দ করি না, সমর্থন জানাই না, তার সব কিছুই খারাপ। ভালোটাও খারাপ। বিএনপি নেতাদের ধরেছে সেই রোগ। তাদের এ ব্যামো নিরাময় হওয়ার নয়। কারণ ব্যামোটাই তাদের রাজনীতি। সারবে কী করে!
আসলে বছর যতো গড়াচ্ছে বিএনপি ততোই অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। ক্ষমতার বাইরে তারা নিজেদের দেখতে অভ্যস্থ নয়। ক্ষমতায় গেলে ইতিহাসের তথ্য বিকৃতি করা যায়। সামরিক-বেসামরিক আমলাদের ঘুস-দুর্নীতি সঙ্গে যুক্ত করে বিত্তশালী হওয়া যায়। যেমন-তারেক রহমান ‘ছেঁড়া গেঞ্জি আর ভাঙা সুটকেস’ বিনিয়োগ করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তার সঙ্গী-সাথীরাও কম যায়নি। ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচার, শত শত ব্যাগ বিমানে তুলে সৌদি যাত্রা, টেন্ডারবাজি কী তারা করেনি যা রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থি নয়? সেই তারাই যখন ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের নীতি নির্ধারণ, রাষ্ট্রীয় চুক্তি সবই দুষ্ট চোখে দেখে আর বলে, বাংলাদেশ কিছুই পাবে না, সব দিয়ে আসবে। এমন বক্তব্য জনগণের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টিই মূল লক্ষ্য। তারপরও জনগণ যদি মনে করে যারা এক ম্যাগা ওয়ার্টও বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি তাদেরই সমর্থন দেবে, তো দেবে। সেখানে করার কী থাকতে পারে। এমন সমর্থনের অর্থ ‘নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারা’। খালেদা ক্ষমতায় এলে আরো একটা পদ্মাসেতু নির্মাণ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। দেশবাসী তো প্রত্যক্ষ করেছে, দু’বার প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি পদ্মাসেতু দূরে থাক দেশের কোনো খালের ওপরও একটা সেতু নির্মাণ করেননি। তিনি তখন ব্যস্ত কুড়োতে। অর্থাৎ গাছেরটা পাড়তে, তলারটা কুড়োতে। না হলে কেমন করে ‘ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি বিপুল অর্থে পূর্ণ হলো কী করে! তবে তার বিরুদ্ধে অসহায় এতিমদের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেটা আদালতই প্রমাণ করবেন। এমন অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় যারা লজ্জা পায় না, তাদের হাতে দেশের সম্পদ ও দেশবাসী নিরাপদ নয়। নিরাপদ নয় মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় অর্জন, ইতিহাসের তথ্য, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা। বিধায় ১৪২৪ থেকেই এই অশুভ-অপশক্তির বিপরীতে কেবল রাজনীতিক কর্মসূচিই নয়, সাংস্কৃতিক কর্মসূচি নিয়ে দৃঢ়বদ্ধভাবে অবস্থান নেয়া। জাতীয়তা বোধকে আরো শাণিত করে দেশবিরোধী সকল অশুভ অপশক্তির শেকড় উৎপাটন করতে হবে। তার বিকল্প এই মুহুর্তে নেই। নববর্ষে সূচনালগ্নে আসুন অঙ্গীকারাবদ্ধ হই, বাঙালি, বাংলাভাষা আর বাংলাদেশটাকে ভালোবাসি।