বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

নব্বুই-এর পাঁচ ডিসেম্বর এবং দুলাল

আপডেট: December 5, 2019, 1:14 am

আকবারুল হাসান মিল্লাত


জীবিত রফিকুল ইসালম দুলালের শেষ ছবি( গোল চিহ্নিত)। এই বক্তৃতা মঞ্চ থেকে নেমে যাওয়ার আধ ঘণ্টা পরে শহিদ হন। সূত্র: রাজশাহী ১৯০ ছবি থেকে প্রথম প্রকাশান, ১ জানুয়ারি ৯১।

হঠাৎ করেই সারা শহর স্তব্ধ হয়ে গেল, পাংশু-বিবর্ণ মানুষের অবয়ব। ভয়ঙ্কর কিছুর আশংকা। ভীতি-আতঙ্ক বাতাসে ছড়ায়। এ শহর জনপদ আকস্মিক গ্রাস করেছে চরম অনিশ্চয়তায়। প্রাণের স্পর্শ কোন জীয়ন কাঠির স্পর্শাভাবে থেমে গেল। নিদারুণ এক ছন্দপতন।
কিছুক্ষণ আগেই শহরের মানুষগুলো বিজয় উৎসবে মেতেছিল। প্রাণ-প্রাচুর্যে আর কোলাহলে পরিপূর্ণ ছিল শহর। সাহসী যৌবনে সিক্ত তারুণ্যের বজ্রকঠিন স্লোগানে মুখরিত ছিল এই জনপদ। হাজার হাজার জনতার সম্মিলন। ওরা জমায়েত হয়েছিল আনন্দ-উৎসবে।
স্বৈরাচার নিপাত গেছেÑগণতন্ত্র উত্তরণের এই মহেন্দ্রক্ষণে সমবেত গণতন্ত্রকামী মানুষ। সমবেত মানুষের কণ্ঠে মুক্তির গান। আনন্দ উছলে পড়ছে চারদিক। স্লোগানে স্লোাগানে মুখরিত গলি থেকে রাজপথ। তরুণেরা নৃত্যগানে উচ্ছ্বসিত-উন্মাতাল। দিকে দিকে পটকার দ্রিম দ্রুম শব্দ। রঙের খেলায় মত্ত এক ঝাঁক তারুণ্য।
এমন আনন্দ-উৎসব হঠাৎ গভীর বেদনায় ভরে উঠলো কেন? জনতার ভয়-বিহ্বল ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে এ কীসের ইঙ্গিত?
হৃদয়ের ভাঁজে ভাঁজে ব্যথাটা ভীষণ মোচড় দিয়ে উঠছে। কেন জানি নিজেকে বড় অপরাধী মনে হচ্ছে। প্রশ্ন আমাকেও জর্জরিত করছে। আমার কি কিছু করা ছিল? হয়ত ছিল, কিন্তু কীভাবে? আমি তো ওই বিশাল মিছিলের নেতৃপর্যায়ের কেউ নই। আমি কিইবা করতে পারতাম! নিদেনপক্ষে নেতাদের সকাতর অনুরোধ করতে পারতাম। কিন্তু সেটাও যে আমি সেভাবে করিনি! সফল হতেম কী না সেটা পরের কথাÑ কিন্তু আমি চেষ্টা করেছি, অন্তত এ সান্ত¦নাটুকু পেতে পারতাম। এটা কি দায়িত্বের প্রতি চরম অবহেলা? অসংখ্যা ছুঁচ যেন আমার হৃদয় ভেদ করে চলেছে। আমাকে ছিন্ন-ভিন্ন রক্তাক্ত করছে। আমি যন্ত্রণায় ছটফট করছি। উন্মাতাল মিছিলের গতিপথ ফিরাতে পারলে দুলালকে ওভাবে মরতে হতো না।
দুলাল গুলিতে নিহত হয়েছে। এ সংবাদ মুহুর্মূহ বজ্রপাতের মতই সারা শহরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুললো। তবে কী স্বৈরাচার নিপাত যায় নি, গণতন্ত্র মুক্তি পায় নি? নানা প্রশ্ন তখন মানুষের মনে, আমাদের মনে। অনেক দ্বিধা, অনেক বিভ্রান্তি শহরবাসীর মধ্যেও।
গতকাল রাতেই স্বৈরাচার এরশাদের পতন হয়েছে। সাড়ে আট বছর পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সফলতা। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্ষক্ষয়ের পর এই সফল্য, মানুষের সাফল্য। জনগণের রুদ্ধ রোষের কাছে পরাজিত হলো সামরিক স্বৈরশাসক। জনগণের এ এক ঐতিহাসিক বিজয়।
৫ ডিসেম্বর ১৯৯০। আজকের সকাল অন্য সকালের মত নয়। হৃদয়ের চাপা অনুভূতি প্রকাশের সকাল। এই সকাল অনেক অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনীতিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর খেই হারানো দুর্বৃত্তনির্ভর রাজনীতি থেকে উত্তরণের এক ঐতিহাসিক বাঁক। এ দিনের সকাল জাতীয় রাজনীতির কাছে নতুন এক শপথের অপরিহার্যতা। গণমানুষের কাক্সিক্ষত গণতন্ত্রের সুরক্ষার প্রত্যয় মিশ্রিত এক করোজ্জ্বল সকাল। দিনের প্রথম আলো সেই প্রত্যয়েরই উদ্ভাস শহর ও গ্রামের অলিতে-গলিতে প্রতিফলিত হচ্ছে।
‘এক দফা এক দাবি, এরশাদ তুই ক’বে যাবি’Ñ এই একটিই স্লোগান, একটাই দাবি সারা দেশের মানুষকে উজ্জীবিত করেছে, এক করেছে, রাজপথের সংগ্রামকে শাণিত করেছে, ত্বরান্বিত করেছে। গণঅভ্যুত্থানের অগ্নি-স্ফূলিঙ্গে স্বৈরাচারি এরশাদের তখতেতাউস জ্বলেপুড়ে ভষ্ম হয়েছে। পতন হয়েছে স্বৈরাচারি দানবের।
আমরা উপশহরের ছেলেরা দলমত নির্বিশেষে বিজয় মিছিলের কর্মসূচি গত রাতেই ঠিক করেছিলাম। আজ সকাল ৯ টায় উপশহর মোড় থেকে আনন্দ মিছিলের যাত্রা শুরু হবে। আবাল বৃদ্ধ ও তারুণ্যের যোগদানে ধন্য হলো বিজয় মিছিল। ব্যান্ড, বিউগলের তালে তালে আর পটকার দ্রিম দ্রুম শব্দ সম্ভারের সাথে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হলো বিজয় মিছিল। আকাশ,-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে বিজয়ের বার্তা চারদিক ছড়িয়ে পড়ছিল। পুরো উপশহর এলাকা একবার প্রদক্ষিণ করে বিজয় মিছিল শহর অভিমুখে রওয়ানা দিল। মিছিলের অগ্রভাবে জনতার বিজয় গৌরবে জাতীয় পতাকা পতপত করে উড়ছে। ব্যান্ডের তালে তালে একদল তরুণ তখন নৃত্যে-উন্মাতাল। ১৯৭১ সালে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বিজয়ী বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে বাঁচার স্পর্ধা শিখিয়েছিল। ১৯ বছর পর বাঙালি জাতি অন্য আরেক স্পর্ধার জন্ম দিয়েছে আজ- স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটিয়ে। এমনি অনেক স্পর্ধিত ঘটনার অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে বাঙালি জাতি। স্বৈরাচার পতনের স্পর্ধাই আজ আনন্দ- উৎসবে মুখর করে তুলেছে। স্বাধীনতার পর এমন উৎসব- উৎসবের এমন প্রখরতা স্বাধীন বাংলাদেশে আর কখনো দেখা যায় নি।
বিজয় মিছিল উপশহর মোড় হয়ে দড়িখরবোনার রাস্তা দিয়ে শহর-কেন্দ্র সাহেববাজার জিরোপয়েন্ট অভিমুখে চলতে থাকলো। গ্রেটাররোডের মসজিদের সামনের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণমুখি কাজিরগঞ্জ রাস্তা ধরে হেতমখা- সদর হাসপাতালের মোড় হয়ে সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে পৌঁছে বিজয় মিছিল বিশাল জনসমাবেশে সংহতি প্রকাশ করলো।
মাইকে অনুষ্ঠান সূচি ঘোষণা হচ্ছে। সাথে মহাউৎসবের পরিবেশ। গণমানুষের উচ্ছ্বাস উছলে পড়ছে। বিভিন্ন দিক থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে সমবেত হচ্ছে। কোনো মিছিলে এরশাদের রঙিন ছবি উল্টো করে বাঁশের মাথায় বেধে জুতার মালা পরিয়ে দেয়া হয়েছে। সবচেয়ে আকর্ষণ করেছে একটি দৃশ্য তা হলো- একটি কুকুরের গলায় এরশাদের ছবি বেঁধে দেয়া হয়েছে- সেই সাথে অন্য কাগজে লিখে সেটে দেয়া হয়েছে- ‘আমার বন্ধুকে খুঁজছি।’ সেই কুকুর মিছিলের অগ্রভাগে। আরেকটি দৃশ্য- এরশাদের কুশপুত্তলিকা তৈরি করা হয়েছে। কুশপুতুলের হাতে একটি হ্যারিকেন এবং পশ্চাদভাগে একটি বাঁশের অংশবিশেষ ব্যবহার করা হয়েছে। দুটো কাণ্ডই সমবেত জনতাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছিল। সমবেশ স্থলে অসংখ্যা লাল-সবুজের জাতীয় পতাকা মুক্তিকামী মানুষের হাতে হাতে বিজয়গর্বে উড়ছিল। অনেক বাড়িতেও জাতীয় পতাকা উড়ছিল।
নেতৃবৃন্দের সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা শেষে হাজার হাজার মানুষের মিছিলের যাত্রা শুরু হলো। পশ্চিম দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিজয় মিছিল। মিছিলের সামলে ছাত্র নেতৃবৃন্দ। মিছিল কোনো নিয়মের মধ্যে থাকলো না, বিশৃঙ্খল অবস্থা। মিছিলের কোনো দিকনির্দেশনাও দেয়া হলো না।
বিজয় মিছিল সিঅ্যান্ডবি মোড়ে এসে উত্তর দিকে মোড় নিয়ে এগোতে থাকলো। তখনই আশংকাটা মাথায় চড়ে বসলো। মিছিল যদি বর্ণালী সিনেমার মোড় অতিক্রম করে যায়- তা হলে সমূহ বিপদের আশংকা। কেননা ওই মোড়েই স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নূরুল নবী চাঁদের বাসবভন। একেবারে গ্রেটার রোড সংলগ্ন। নভেম্বরের একুশ তারিখে স্বৈরাচারবিরোধী মিছিলে ওই বাসা থেকেই গুলি ছোঁড়া হয়েছিল। গুলিবিদ্ধ হয় মুসলিম হাই স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র জিয়াবুল। ২৮ তারিখে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নুরুন নবী চাঁদ তখনো মন্ত্রীর সব প্রটৌকল পাচ্ছিল। ভয়টা সেখানেই। প্রতিমন্ত্রীর বাড়ির পাশ দিয়ে মিছিল সংগঠিত উপায়ে পার করা সহজ হবে না। মিছিলে ওই অর্থে নেতৃত্ব ছিল না। দ্বিতীয়ত মিছিলের উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। মিছিল থেকে যে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে!
বিজয় মিছিল যখন লক্ষ্মীপুর মোড় অতিক্রম করবে ঠিক তখনই জগলুল ভাইসহ আমাদের ক’জনের প্রচেষ্টা ছিলÑ যাতে করে মিছিলটা হাসপাতাল সড়ক ধরে সদর হাসপাতালের মোড় হয়ে আবারো সাহেববাজার জিরোপয়েন্টে গিয়ে শেষ করা যায়। কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। আমরা ৩০/৩৫ জনের মত লক্ষীপুর মোড় থেকে বেরিয়ে গেলাম। বিজয় মিছিলের মূল অংশ তখন সামনের দিকে অগ্রসরমান।
জগলু ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা ঘোষপাড়া মোড়ে এসে চা পানের জন্য অবস্থান করলাম। কয়েক দফায় চা এলো। চা খেতে খেতে খবর পেলাম প্রতিমন্ত্রী নূরুন নবী চাঁদের বাড়ির অভ্যন্তর থেকে গুলি বর্ষিত হয়েছে। মন্ত্রীর বাসভবনে সশস্ত্র অবস্থান নেয়া জাতীয় পার্টির ক্যাডাররা গুলি ছুঁড়েছে। চার-পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। একজন মারা গেছে। কিন্তু যে মারা গেছে তার নাম শুনে আমার মধ্যে অস্থিরতা ভীষণভাবে বেড়ে গেল। উত্তেজনায় শরীর কাঁপতে থাকলো। আমার ছোট ভাই সেন্টু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। দ্রুত ঘোষপাড়া মোড় থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উত্তরে প্রতিমন্ত্রীর বাসভবন। আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌছলাম। থমথমে ভাব। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই বিমূঢ় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে প্রতিমন্ত্রীর বাসভবনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন হয়েছে। এখানে এসে জানলাম নিহত ব্যক্তি আমার ছোট ভাই নয়। কিন্তু যে মারা গেছে সেও আমার ছোট ভাইয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ছাত্রলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম দুলাল নিহত হয়েছে। ছাত্রলীগের সৎ ও বলিষ্ট নেতা ছিল সে। আবেগ চাপা রাখতে পারিনি আমি কাঁদলাম।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক সোনার দেশ