নরওয়ে ভ্রমণ

আপডেট: অক্টোবর ৩১, ২০১৯, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রা রাণী চন্দ


ঘুরে এলাম স্বপ্নের দেশ ইউরোপের নরওয়ে। এক অদ্ভূত ভালোলাগা কাজ করছে মনে মনে যা ভাষায় প্রকাশ করা খুব দুরূহ। অসলো এবং ক্রিস্টান স্যান্ড মিলে ১০ দিন কেমন করে কেটে গেলো ভাবতেই অবাক লাগে। শুনেছি ছবির মতো সুন্দর দেশ। কথাটি যথার্থ। সমুদ্র ও পাহাড় বেষ্টিত দেশটি আয়তনে আমাদের দেশের আড়াই গুন গুনের বেশি, লোকসংখ্যা মাত্র ৯৫ লক্ষ। সভ্যতার অগ্রযাত্রার দিক থেকে সম্ভবতঃ ইউরোপই সবচেয়ে এগিয়ে। অসলো নরওয়ের রাজধানী ক্রিস্টানস্যান্ড একটা সিটি। আমাদের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ক্রিস্টান স্যান্ডে। অপূর্ব এদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ওখানে শীত এখন, তাপমাত্রা ২/৩ ডিগ্রি। সামনের সপ্তাহে বরফ পড়ার কথা। পাহাড়ি শহরটি ঘিরে রয়েছে অসংখ্য গাছ-পালা। যেদিকে চোখ যায় শুধু হলুদ আর লালের সমাহার। রয়েছে বার্চ গাছ- যার পাতা শুরুতে সবুজ, পরে আস্তে আস্তে তা হলুদ হয়ে যায়। আর এক ধরনের গাছ বেশি দেখা যায় যার পাতা শুরুতেই লাল-স্থানীয় লোকেরা তার নাম জানাতে পারে নি। আছে স্যাপেল গাছ। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় কখনো কখনো বৃষ্টি ভেসে বেড়ায়। ছাতা মাথায় থাকলে মাথাটা ভেজে না কিন্তু বাতাসে ভেসে বেড়ানো বৃষ্টিকণায় কাপড় ভিজে যায়। শীত বলেই গাছের লতাগুলো হলুদ আর লাল পাতায় ভরা। বাড়িগুলো সব একই রকম দেখতে- সারি সারি বাড়ি, কোনোটাই নির্দিষ্ট সীমার বাইরে নয়। পাঁচ তলার বেশি উঁচু কোনো বাড়ি নেই। প্রায় সব বাড়িই কাঠের তৈরি। একটা এলাকায় (ক্রিস্টান স্যান্ডের) প্রায় তিনশ’ কাঠের বাড়ি এক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়ায় ওই বাড়িগলো পাথর ও কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হয়। সব বাড়িতেই শীত ও গ্রীষ্মে বাস করার আলাদা বাসস্থান আছে। ইউরোপিয়ানদের শিক্ষা ব্যবস্থা চমৎকার। স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অন্যান্য অনেক কাজ শেখানো হয় যাতে করে তাকে কোনো কাজের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষি হতে না হয়। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে তাদের কাঠের কাজ শেখানো হয়। সেলাই শেখানো হয়, বাগানে কাজ করতে শেখানো হয়- বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলের ছাত্রদের ৭ দিন ছুটি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সমুদ্রে কিভাবে মাছ শিকার করতে হয় সেটা শেখাতে। এগুলো ছাড়াও রয়েছে গান-বাজনা শেখা কিংবা খেলা-ধূলা করার যথেষ্ট সুযোগ। স্কুল থেকে ২/৩ কিলোমিটারের ভেতরে যাদের বাড়ি তারা নিজেরা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে। যাদের বাড়ি দূরে তাদের জন্য রয়েছে বাসের ব্যবস্থা। সে বাসও একটা নির্দিষ্ট সীমারেখায় দাঁড়ালে বোঝা যাবে এটি স্কুল বাস।
ওদের সময়ানুবর্তিতা অবিশ্বাস্য। কেউ পাঁচ মিনিট আগে গন্তব্য পৌঁছাবে তো এক মিনিট পরে পৌঁছায় না। যানবাহনও চলে কাঁটায় কাঁটায়। কোনো কাজ যে সময়ে শুরু হবার কথা ঠিক সে সময়েই শুরু হবে তাতে কে এলো না এলো সেটি কোনো বিষয় নয়। প্রকৃতপক্ষে কেউ কখনো অসময়ে যায় না। যে যত ব্যস্তই থাকুক না কেন সময় সময়ই।
কারো সাথে দেখা হলে চেনা কিংবা অচেনা হাসিমুখে বলবে ‘হাই’। কেউ জোরে কথা বলে না। কোথাও কোনো শব্দ নেই। এমনকি বাজারে পর্যন্ত সবাই নিচু স্বরে কথা বলে। কোনো যানজট নেই, নেই কোনো গাড়ির হর্নের শব্দ। রাস্তা পেরোনোর নির্দিষ্ট জায়গা আছে। যাত্রী পার না হওয়া পর্যন্ত গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে রেলস্টেশনে টিকিট দেখার কোনো লোক নেই। লাইনে দাঁড়িয়ে অটোমটেড মেশিনে নির্দিষ্ট সংখ্যা টিপে টাকা দিলেই টিকিট পেয়ে যাবেন আপনি। অদ্ভূত এক নিয়ম আছে ওদের। আপনি টিকিট কাটার আড়াই ঘণ্টার ভেতরে যতবার ইচ্ছে যাওয়া আসা করতে পারবেন এক টিকিটে-এটি অবশ্য দেখেছি ট্রেনের ক্ষেত্রে। বাসের খবরটি সঠিক জানি না। এক একটা রুটের গাড়ি একটা নির্দিষ্ট লেন দিয়ে চলে। কারো কাছে একবার জেনে নিতে পারলে পথচলা খুব সহজ। বাসে ওঠলে ড্রাইভারই টিকিট বিক্রি করে তাকে বাসের ভেতরে ঢোকাচ্ছে। সবই ডিজিটালাইজড হওয়ায় সময় লাগে খুব কম। কারো সাহায্য চাইলে হাসিমুখে সাহায্য করে। কেউ মন খারাপ করে থাকে না।
আমাদের মাথা পিছু আয় ২ হাজার ডলার। ওদের মাথাপিছু আয় ৭৩ হাজার ডলারেরও বেশ। ওদেশেও বেকার আছে। কিন্তু তাদের ভাতা দেওয়া হয়। ওখানে যে যে কাজই করুক না কেন তাকে বেতন এমনভাবে দেওয়া হয় যাতে তারা ভালোভাবে চলতে পারে। অযথা বিনা কাজে তারা সময় কাটায় না। সবাই প্রয়োজনীয় সব কাজে পারদর্শী। কেউ মিথ্যা কথা বলে না। কেউ অসৎ কাজ করে না। ওদেশে দু’জন ভিক্ষুকের সাক্ষাত মেলে। তারা ও দেশের অধিবাসী নয়। পোলান্ড কিংবা পাশের অন্যান্য দেশ থেকে তারা এসেছে। তাদেরও গাড়ি আছে। ওসব দেশ থেকে এসে গাড়ি পার্ক করে রেখে তারা শহরের কোনো রাস্তায় নির্দিষ্ট স্থানে বসে। কেউ পাশ থেকে গেলে তার কাছে সাহায্য চায়। কিছু দিন ভিক্ষা করে অর্থ সংগ্রহ করে তারা ফিরে যায় নিজ দেশে।
আড়ম্বরহীন তাদের জীবন। কে কী খেলো, কী করলো, কী পোশাক পরলো এ নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। তাদের প্রধান খাবার গোল আলু সেদ্ধ এবং মাছ। ওদের খাবার চার ভাগে ভাগ করা থাকে। প্রথমে হালকা কোনো খাবার, সাথে ড্রিংকস। কিছুক্ষণ পরে প্রধান খাবার আলু সেদ্ধ, মাছ, পরে আইসক্রিম, পুডিং এবং সবশেষে চা, কফি আমরা অবশ্য তিন বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়েছি। রাতের খাবার দু’ বাড়িতে ওরা ভাত রেখেছিল। কোনো রান্নায় ওরা মরিচ খায় না। ক্যাপসিকাম কিংবা গোল মরিচ ব্যবহার করে কোথাও কোথাও। সকালে ওরা যতটা পারে খায়, দুপুরের খাবার সামান্য। রাতে দুপুরের চেয়ে একটু বেশি খায়। সব কিছুতেই তাদের পরিমিতিবোধ লক্ষ্যনীয়।
মেয়েদের তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। যে কোনো আয়োজনে তারা মেয়েদের অগ্রাধিকার দেয়। মেয়েরা যথেষ্ট স্বাধীন। রাস্তা ঘাটে একটা মেয়ে একা চলাচল করতে পারে নির্বিঘ্নে। কেউ তাকে বিরক্ত করবে না। কাউকে তারা বিপদে ফেলে না। বরং কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করে সবাই।
ওখানে কেউ কেউ (ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে) সিগারেট খায়। কেউ কেউ খেতে খেতে রাস্তা চলে অথবা কেউ কোথাও দাঁড়িয়ে সিগারেট খায়। কিন্তু যে যেভাবেই খাক না কেন অবশিষ্টাংশ যেখানে সেখানে ফেলে না। রাস্তার পাশে রাখা ময়লার পাত্রে ফেলে।
ওখানে রিসাইক্লিং কেন্দ্র আছে যেখানে মানুষের ব্যবহার্য পুরনো জিনিস কিংবা ভাঙ্গা চোরা বাতিল জিনিস, গাছের পাতা কিংবা বর্জ্য থেকে নানা জিনিস তৈরি হয় যা মানুষের কাজে লাগে। শুধু তাই নয়, এসব কেন্দ্রে অনেক জিনিস বিক্রি হয় নামমাত্র দামে। মানুষের ব্যবহার্য্য ফেলে দেয়া অনেক জিনিস পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে কিংবা মেরামত করে রেখে দেওয়া হয়। প্রয়োজন মত মানুষ ওখান থেকে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে। আসবাবপত্র থেকে শুরু ইলেকট্রনিক জিনিসও পাওয়া যায় ওখানে। যাদের সামর্থ্য একটু কম তাদের জন্য অনেক উপকারী এ কেন্দ্রগুলো। ইউরোপিয়ারা সভ্য ও সৌন্দর্য্য প্রিয়। শিল্পের প্রতি রয়েছে তাদের বিশেষ অনুরাগ। প্রত্যেকটি বাড়ি চমৎকার করে সাজানো। এদের বেডরুমগুলো থাকে সাধারণতঃ দোতলা বা তিনতলায়। দেয়াল জুড়ে থাকে নানা রকম পেইন্টিং। ওরা খুব অতিথি পরায়ণ। মানুষকে ওরা সম্মান করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেচা কেনার সাথে নিয়োজিত মেয়েরা। ওখানে কিছু কেনার সুবিধা হলো সব জিনিসই থাকে ডিসপ্লে করা। ফলে পণ্য দেখানোর জন্য বাড়তি লোকের প্রয়োজন হয় না। দাম জিজ্ঞাসা করারও দরকার হয় না। কারণ প্রত্যেকটি জিনিসের দামও দেওয়া থাকে পণ্যের গায়ে।
রেলস্টেশনে অর্থের বিনিময়ে জিসিনপত্র রাখার ব্যবস্থা আছে যেখানে আপনি ৭ দিন পর্যন্ত জিনিসপত্র রেখে নিশ্চিন্তে ঘুরতে বা আপনার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিতে পারেন। কিন্তু সমস্যা একটাই। কোনো লোক নেই সেখানে। আপনাকে কারো নিকট থেকে জেনে নিতে হবে জিনিসপত্র রাখার নিয়মাবলী। অবশ্যই আপনার কাছে ক্রেডিট কার্ড থাকতে হবে। অনেকক্ষেত্রেই নগদে লেনদেন হয় না।
হোটেলগুলোতে থাকবেন তার সেবা লক্ষণীয় মানের। কোথাও কোনো অভিযোগ করার সুযোগ পাবেন না আপনি। যদি বাংলাদেশি টাকায় কোনো জিনিসের দাম তুলনা করেন তাহলে জিনিসপত্রের দাম অনেক বেশি। ওদের মাথাপিছু আয় বেশি ফলে ওদের দেশের তুলনায় জিনিসপত্রের দাম বেশি নয়। কোথাও গাড়ির হর্ন নেই। কাউকে ওভারটেক করার নেশা নেই। ট্রাফিক পুলিশ নেই কিন্তু সিগন্যাল আমান্য করে না কেউ। সব ভালোর দেশে ক’দিন কাটিয়ে আমাদের দেশের জন্য খারাপ লাগে। কবে আমরা সভ্য হবো, শান্তিপ্রিয় হবো?