নাগরিকের ক্ষোভ প্রশমনে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১, ১২:২৯ পূর্বাহ্ণ

মো. তৌহিদুজ্জামান:


বিশাল এক রাজ প্রাসাদ। প্রাসাদের বাইরে ঝুলছে বড় আকারের এক ঘণ্টা। একজন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আসল। সে ঘণ্টাতে একটি আঘাত করল। অমনি বাদশাহের লোক এসে তার নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করে নিল। এই লিপিবব্ধ করা মানেই তার একটি অভিযোগ আছে এবং সে অভিযোগটির নিষ্পিত্তি হবে একটি নির্দিষ্ট দিনে। এটা হচ্ছে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসন পদ্ধতির একটি নমুনা।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসন কালের তুলনায় এখন জনসংখ্যা বেড়েছে বহু গুন। এসময় সরকারি সেবার সংখ্য্য যেমন বেড়েছে তেমনি জটিল হয়েছে সেবা প্রদান পদ্ধতি। বর্তমান বাস্তবতায় সরকার প্রতিশ্রুত সেবার বিষয়ে ঐভাবে অভিযোগ জানানোর সুযোগ এখন আর নেই। তবে নাগরিকের অভিযোগ গ্রহন ও তার নিষ্পত্তির ব্যবস্থানায় বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে সুফল লাভ করেছে। যার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারও প্রশাসনিক সংস্কারের অংশ হিসেবে ‘অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা’ নামে নাগরিকের ক্ষোভ বা অসন্তোষ প্রশমনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।
নানা কারণে নাগরিক সংক্ষুব্ধ হয়ে থাকে। বিশেষকরে সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সেবা প্রদানে বিলম্ব বা কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন না করা, সেবার মান নিয়ে অসন্তুষ্টি, অনুচিৎ পদক্ষেপ গ্রহন, কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়া, পাবলিক সুযোগ সুবিধার ঘাটতি, পদ্ধতিগত ত্রুটি, গণকর্মচারীর অশোভোন আচরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতির দূর্বলতা ইত্যাদির কারণে নাগরিক সংক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগের করে থাকেন। নাগরিকের সেই সংক্ষুব্ধতা বা অসন্তোষ প্রশমনের একটি প্লাটফর্ম হচ্ছে অভিযোগ প্রতিকার ব্যববস্থা।
অভিযোগ প্রতিকার ব্যববস্থাপনার পটভূমি জানতে ফিরতে হবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ২১ (২) অনুচ্ছেদে। যেখানে বলা হয়েছে যে, সকল সময়ে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। সেবার মান বৃদ্ধির জন্য প্রয়োাজন জনসেবা প্রদানকারী দপ্তরসমূহের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা। এক্ষেত্রে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে। জনগণের নিকট সরকারি দপ্তরসমূহের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, সেবার মানোন্নয়ন এবং সুশাসন সংহতকরণের মাধ্যমে ভোগান্তিবিহীন জনসেবা নিশ্চিতকরণই অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার মুখ্য উদ্দেশ্য ।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, ২০০০-এর প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয়ভাবে অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছিল। এ সুপারিশের আলোকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেটে কেন্দ্রীয়ভাবে জনসাধারণের অভিযোগ গ্রহন কেন্দ্র চালু করে। প্রাপ্ত অভিযোগসমূহ প্রতিকারের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ হতে ২০০৭ সালে একটি পরিপত্র জারি করা হয়, যার আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহের অভিযোগ নিষ্পিত্তি কর্মকর্তার নিকট অভিযোগসমূহ প্রেরণ করা হচ্ছে। সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০১৪-এর অষ্টম অধ্যায়ের ২৬২ (১) ও (২) সংখ্যক নির্দেশে নাগরিকগণের মতামত গ্রহণ এবং স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে অভিযোগসমূহের প্রতিকার প্রদান এবং সংরক্ষণের কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণের অনুশাসন দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত অভিযোগসমূহের সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনার স্বার্থে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক ২০১৫ সাল হতে অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু করা হয়। এটা প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি, কম সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে ও ভোগান্তি ছাড়া সেবা প্রদান এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে স্বপ্রণোদিতভাবে সেবা প্রদানে এগিয়ে আসার মনোবৃত্তির বিকাশ।
অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থায় সরকারি দপ্তর অথবা আইনের আওতায় নিবন্ধিত সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রতিশ্রুত সেবা বা পণ্য বা সেবাপদ্ধতি সম্পর্কে সেবাপ্রত্যাশীদের অসন্তুষ্টি অথবা প্রদেয় বা প্রদত্ত সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত বিধি-বহির্ভূত কাজ অথবা সেবাপ্রত্যাশীদের বৈধ অধিকার প্রদানে অস্বীকৃতির বিষয়ে ইলেকট্রনিক বা প্রচলিত পদ্ধতিতে (নির্ধারিত ফরমে) দায়েরকৃত দরখাস্ত অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। এটাই হচ্ছে নাগরিক অভযোগ। এর বাইরে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলে প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অভিযোগ করতে পারবেন। আবার কোন প্রতিষ্ঠান অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্য সেবা না পেলে দাপ্তরিক অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে।
সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা তাঁদের মনোনীত প্রতিনিধি অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক মনোনীত প্রতিনিধি এবং ব্যক্তির ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয় (বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী অথবা সন্তান) প্রতিনিধি হিসেবে অভিযোগ দাখিল করতে পারবেন। ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান না করলে অভিযোগকারীকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে গণ্য করা হবে। অজ্ঞাতনামা হিসেবে অভিযোগ দায়ের করলে অভিযোগটির ওপর কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে কিনা, সে বিষয়ে অভিযোগের ধরন ও গুরুত্ব অনুযায়ী অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এক্ষেত্রে অভিযোগ চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা সম্ভব নাও হতে পারে।
সকল সরকারি দপ্তরে সেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ এবং তা প্রতিকারের জন্য একজন অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা (অনিক) নিযুক্ত করা হয়েছে। জেলা, বিভাগীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের দপ্তর এবং অধিদপ্তর, সংস্থা ও অন্যান্য দপ্তরের অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা হবেন দপ্তর প্রধান অথবা তাঁর মনোনীত একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। জেলা পর্যায়ের দপ্তরের অনিক আওতাধীন ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের দপ্তরসমূহের অনিক হিসেবে গণ্য হবেন। মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা হবেন একজন যুগ্মসচিব ।
অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট (www.grs.gov.bd)-এর মাধ্যমে অভিযোগ দাখিল করা যাবে। এ ছাড়া ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে (ইমেইল, ই-ফাইল অথবা কল সেন্টারের মাধ্যমে) অথবা প্রচলিত পদ্ধতিতে (সংশ্লিষ্ট দপ্তরে উপস্থিত হয়ে অথবা ডাকযোগে) অভিযোগ দাখিল করা যাবে। অভিযোগ দাখিলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফরম (সংযোজনী ‘ক-১’) ব্যবহার করতে হবে। কোনো আদালতে বিচারাধীন, তথ্য অধিকার-সংক্রান্ত এবং আদেশ প্রাপ্তির পর সংশ্লিষ্ট আইন বা বিধির আওতায় রিভিউ বা আপিলের সুযোগ রয়েছে এমন ক্ষেত্রে অভিযোগ দাখিল করা যাবে না । সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতিতে বর্ণিত সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানের নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বে অভিযোগ দাখিল করা যাবে না। তবে নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই সেবার আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে থাকলে অভিযোগ দাখিল করা যাবে।
সাধারণভাবে অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস তবে তদন্তের প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হবে। অভিযোগ কয়েক ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে থাকে। যেমন প্রদত্ত সেবা প্রদানের নির্দেশনা প্রতিপালন করে, তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সন্তোষজনক মনে হলে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেবা প্রদান করা সম্ভব নয় মর্মে মতামত প্রদান করলে এবং তা যদি সন্তোষজনক হয় তবে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করা হলে অভিযোগটি নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গন্য হবে। প্রতিটি অভিযোগ নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে অথবা ডাকযোগে বা বাহকের মাধ্যমে ৭(সাত) কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগকারীকে অভিযোগের ফলাফল সম্পর্কে অবহিত করা হবে ।
অনিক কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে অভিযোগ নিষ্পত্তি না হলে অথবা অনিক কর্তৃক গৃহীত ব্যবস্থায় সংক্ষুব্ধ হলে অথবা উক্ত কর্মকর্তার নিকট অভিযোগ দাখিলের সুযোগ না থাকলে বা অভিযোগ দাখিলের পর প্রতিকার পেতে ব্যর্থ হলে অভিযোগকারী সংশ্লিষ্ট আপিল কর্মকর্তার নিকট অনলাইনে (www.grs.gov.bd) অথবা প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্ধারিত ফরমে (সংযোজনী ‘ক-২’) আপিল দাখিল করতে পারবেন। মন্ত্রণালয়/বিভাগের সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট আওতাধীন দপ্তর/সংস্থার আপিল কর্মকর্তা হিসাবে মন্ত্রণালয়/বিভাগের অনিক দায়িত্ব পালন করবেন। মন্ত্রণালয়/বিভাগ ব্যতীত অন্যান্য সকল দপ্তরের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পরবর্তী ঊর্ধ্বতন দপ্তরের অনিক আপিল কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। মন্ত্রণালয়/বিভাগের আপিল কর্মকর্তা হবেন একজন অতিরিক্ত সচিব অথবা ক্ষেত্র বিশেষে অনিকের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সচিব। আপিল নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ সময়সীমা আপিল দাখিলের তারিখ থেকে অনধিক ২০ কার্যদিবস। আপিল কর্মকর্তা অনিকের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারেন, সেবা প্রদানকারীকে যথাযথভাবে সেবা প্রদানের নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন, অনিকের সিদ্ধান্ত যথাযথ না হলে তিনি উপযুক্ত নির্দেশনা দিতে পারেন, অভিযুক্ত কর্মকর্তা/কর্মচারির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশ করতে পারেন।
যেকোনো দপ্তরের আপিল কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে অনলাইনে (www.grs.gov.bd) অথবা প্রচলিত পদ্ধতিতে (সংযোজনী ‘খ-৪’-এ নির্ধারিত ফরমে) অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলে আপিল করা যাবে। অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল কর্তৃক অভিযোগ/আপিল নিষ্পত্তির সর্বোচ্চ সময়সীমা অনধিক ৬০ কার্যদিবস।
অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার ওয়েবসাইটে (www.grs.gov.bd) ‘অভিযোগের অবস্থা জানুন’ বাটনে ক্লিক করে প্রাপ্ত ট্র্যাকিং নম্বর ব্যবহারের মাধ্যমে অভিযোগ নিষ্পত্তির সর্বশেষ অবস্থা জানা যাবে। এছাড়া ব্যবহারকারী হিসেবে লগইন করে অভিযোগের তালিকা থেকে অভিযোগ নিষ্পত্তির সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারবেন।
কোনো অভিযোগকারী অভ্যাসগতভাবে অসত্য এবং কাউকে হয়রানি করার জন্য কিংবা অন্য কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে অভিযোগ দাখিল করেন মর্মে প্রমাণিত হলে অনিক-এর সুপারিশের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আপিল কর্মকর্তা উক্ত অভিযোগকারীকে কালো তালিকাভুক্ত করতে পারবেন। এরূপ কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তির নিকট থেকে পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত কোনো অভিযোগ কর্তৃপক্ষ বিনা পদক্ষেপে খারিজ করতে পারবেন।
অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা নিঃসন্ধেয়ে সরকারের একটি মহৎ উদ্যোগ। এর ফলপ্রসুতা নির্ভর করছে বিষয়টির প্রচার এবং প্রয়োগের উপর। আপপ্রয়োগ নয়, অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের অসন্তোষ প্রশমন করুন এবং সরকারি সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করুন।
লেখক: উপপ্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রাজশাহী