নাটোরে অজ্ঞাত রোগে একই পরিবারের তিনজন প্রতিবন্ধী

আপডেট: এপ্রিল ১২, ২০১৭, ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ

নাটোর অফিস


নাটোর সদর উপজেলার লালমনিপুর গ্রামের দিনমজুর মফিজ উদ্দিন। স্ত্রী আর দুই ছেলে সন্তান নিয়ে একটুকরো সুখের সংসার ছিল তার। অভাব থাকলেও সুখের কমতি ছিল না মফিজ উদ্দিনের কুড়েঘরে। হঠাৎ সুখের সংসারে নেমে আসে কালবৈশাখী ঝড়।
আট বছর আগে মফিজের বউ জোৎস্না বেগম হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে গুরুতর অসুস্থতায় মানসিক ও শারীরিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন তিনি। কিছুদিন পরে একে একে তাদের দুই ছেলে জহুরুল ইসলাম ও রকিবুল ইসলাম একইভাবে অসুস্থ হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সেই থেকে দারিদ্রতা আর সীমাহীন যন্ত্রণা মাথায় নিয়ে জীবনযাপন করছেন মফিজ উদ্দিন। বাড়িভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই পরিবারটির। টাকার অভাবে চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তিনি।
সরোজমিনে মফিজ উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, কুড়েঘরের বাইরে অসহায় হয়ে পড়ে আছেন মফিজ উদ্দিনের স্ত্রী আর দুই সন্তান। উঠে বসার মতো শক্তিও নেই তাদের। ধরে বসালেই কেবল বসতে পারে তারা। জোৎস্না বেগম তো আগেই কথা বলার শক্তি হারিয়েছেন। সাংবাদিকদের দেখেই হাউমাউ করে কেঁদে মফিজ উদ্দিন বলতে থাকেন, আমি অসহায়, আমার কোন সম্পদ নাই। নিজে যা ইনকাম করি তা দিয়ে তিনটা প্রতিবন্ধী মানুষের আহার জোগাড়ের চেষ্টা করি। কোনদিন তিনবেলা সবার মুখের আহার জোটাতে পারি, কোনদিন তাও পারি না। বউ আর দুই ছেলেকে চিকিৎসা করার সাধ্য আমার নাই। চোখের সামনে বউ আর ছেলে দুটো ধুকে ধুকে মরছে। আর সহ্য করতে পারছি না। দেশে এতো মানুষ, কেউ যদি গরিবের দুঃখটা বুঝতো। তাহলে হয়তো সবাই সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতো।
কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে মফিজ উদ্দিনের বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম শোনালেন তার কষ্টের কথা। ছোটবেলা থেকেই অন্যের বাড়িতে কাজ করে এসএসসি পাস করেন তিনি। হঠাৎ তার মা ও ছোট ভাইয়ের মতো তারও মাথা ঘুরতে ঘুরতে শরীর ভারী হয়ে আসতে থাকে। কিছুদিন পরে উঠে দাঁড়ানোর শক্তি হারিয়ে যায়। দরিদ্র হওয়ার কারণে সঠিক চিকিৎসা করাতে না পারায় কিছুদিনের মধ্যে তার দৃষ্টিশক্তিও হারিয়ে যায়। জহুরুল জানায়, ‘আমরা সুস্থ হয়ে আর দশটা মানুষের মতো স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চাই। এক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানদের সাহায্য চাই।’
আছিয়া খাতুন নামে তাদের এক প্রতিবেশী জানান, এক সময় সুন্দর চলছিল তাদের সংসার। অন্যের বাড়িতে কাজ করেলেও তেমন অভাব হতো না খাওয়া পরার। হঠাৎ করে মা আর ছেলে দুটো অসুস্থ হয়ে গেল। এখন তারা খুবই অসহায়। আরেক প্রতিবেশী সাবিনা খাতুন বলেন, তিনজনে হাটতে তো পারেই না, ধরে না তুললে চলতেও পারে না। খাওয়াতে হয় মুখে তুলে। সত্যিই তারা খুবই অসহায়।
আজিজুল ইসলাম নামের আরেক প্রতিবেশী বলেন, মফিজ ভাইয়ের যে কি কষ্ট, আর এই মানুষ সহ্য করে কি করে তা ভাবা যায় না। বাড়ির চারজনের তিনজন মানুষই প্রতিবন্ধী। তিনজনের মধ্যে দুইজন প্রতিবন্ধী ভাতা পায়। কিন্তু ভাতার সামান্য টাকা দিয়ে তারা চলতে পারে না। চিকিৎসা করার মতো কোন অর্থ তাদের নেই। তাই বসে বসে মৃত্যুর দিন গুণছে। সবাই যদি সম্মিলিতভাবে মফিজ উদ্দিনের পাশে দাঁড়াতো, তাহলে অসহায় পরিবারটা বেঁচে যেত।
এ বিষয়ে নাটোর সদর হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আরএমও ডা. আবুল কালাম আজাদ জানালেন, প্রাথমিকভাবে এটি জেনেটিক্যালি সমস্যা বলে মনে হচ্ছে। তবে নিশ্চিত হবার জন্য উচ্চতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। আমরা আমাদের সাধ্যমতো চিকিৎসা করার চেষ্টা করবো। বিষয়টি ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করা হবে।