নাটোরে অবৈধ সোতিজালে মাছ শিকার || বেকায়দায় প্রশাসন

আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৭, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ণ

নাটোর অফিস


সিংড়ার আত্রাই নদীতে অভিযান চালিয়ে বাঁশের বেড়া উচ্ছেদ করা হয়-সোনার দেশ

নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুরে বিভিন্ন নদীর গতিপথ বন্ধ করে দিয়ে অবৈধ সোতিজাল নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে প্রশাসন। দিন-রাত অভিযান পরিচালনা করে উচ্ছেদ করলেও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আবারো নদীতে দেয়া হচ্ছে অবৈধ সোতিজাল। ফলে ঘন ঘন অভিযান নিয়ে বেকায়দায় রয়েছে প্রশাসন। নিয়মিত অভিযানের পরেও থামছেনা নদীতে বাধ দিয়ে অবৈধ সোতিজালে মাছ শিকার। তবে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সোতিজালের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী দিলেও গুরুদাসপুরে দেদারসে চলছে অবৈধ সোতিজালে মাছ শিকার। ফলে আগামী বোরো মৌসুমে চলনবিল এলাকায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সিংড়া মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, গত এক মাসে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ এর আওতায় ২৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালনা করে অর্ধকোটি টাকা মূল্যের ১০টি সোতিজাল, ২০টি বাদাই ও ৮‘শ মিটার কারেন্ট জাল এবং ২০টি বাঁশের বেড়া উচ্ছেদ করে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও থামছেনা অবৈধ সোতিজাল মালিকদের দৌরাত্ম। প্রশাসন দিনে সোতিজাল উচ্ছেদ করে ফিরলে রাতেই আবার সোতিজাল বসানো হচ্ছে।
এদিকে, সম্প্রতি ভয়াবহ বন্যায় সিংড়া উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ পানি বন্দি হয়ে পড়ে। বিলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া নদ-নদী ও খাল বিল দিয়ে অতি সহজেই যাতে পানি নেমে যেতে পারে সে জন্য আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক অবৈধভাবে বসানো সোতি ও বাদাইজালসহ বাঁশের বেড়া উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশের পরই উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় মৎস্য বিভাগের নিষিদ্ধ সোতিজাল ও বাঁশের বেড়া উচ্ছেদ অভিযানের গতি আরো বৃদ্ধি পায়। এছাড়া অভিযানে বাধা প্রদানের অভিযোগে গত ২১ আগস্ট সিংড়ার ৪ নম্বর কলম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মইনুল হক চুনুকে আটক করে কারাগারে প্রেরন করে পুলিশ। ১৫ দিন কারাভোগের পর আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পান তিনি। এসব অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্র্রেট, উপজেলা মৎস্য অধিদফতরসহ পুলিশ সদস্য এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অংশ নেন।
গত শুক্রবার উপজেলার জলারবাতা এবং কালীনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ সোতিজাল এবং বাধাইজাল জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলে প্রশাসন।
সূত্র জানায়, সিংড়া উপজেলার আত্রাই নদীর সরদানগর এলাকায় এক জায়গা অবৈধ ভাবে তিনটি সোতিজাল দেয়া হয়েছে। আর তিনটির মধ্যে একটি সোতিজালের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফারুক হোসেন ওরফে পোল্টি ফারুক। তবে ফারুক হোসেন নদীতে অবৈধ ভাবে সোতিজাল দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান জানান, বাঁশের বেড়া দিয়ে ও অবৈধ সোতিজালের ফাঁদ পেতে চলনবিল ও আত্রাই নদী থেকে অবাধে মাছ শিকার চলছে। এতে মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া, শামুকসহ নানা জলজ প্রাণী আটকা পড়ছে। ফলে জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অবিলম্বে চলনবিলে কর্মসূচি পালন করা হবে বলে জানান তিনি।
এবিষয়ে সিংড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা ওমর আলী জানান, চলনবিলের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় গত ১৮ আগস্ট থেকে মৎস্য অধিদফতর আত্রাই, গুড় ও বারনই নদী এবং চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় দিবা-রাত্রি একযোগে ২৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালনা করে আসছে। অভিযানে এ পর্যন্ত ২০টি সোতিজালের বাঁশের বেড়া অপসারণ, ১০টি সোতিজাল, ২০টি বাদাই জাল ও ৮‘শ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল আটক করে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যার আনুমানিক মূল্য অর্ধকোটি টাকা। অভিযানে মৎস্য সংরক্ষণ আইনে সোতিজাল মালিকদের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ৩ জনকে ১৫ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। বর্তামনে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আসিফ মাহমুদ জানান, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে চলনবিলের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদফতর একযোগে কাজ করছে। কিন্তু অবৈধ সোতিজাল উচ্ছেদ করে ফিরলে আবারও তারা একই স্থানে সোতিজাল দিচ্ছে। তারপরও প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, অভিযানের পরেও সোতিজাল উচ্ছেদ না হওয়ার কারণে কিছু কিছু মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। যতদিন না এটি উচ্ছেদ হচ্ছে, ততদিন অভিযান পরিচালনা করা হবে। এদিকে, জেলার গুরুদাসপুরে আত্রাই নদীর এক কিলোমিটারের মধ্যে ৫টি স্থানে অবৈধ ভাবে সোতিজাল দিয়ে মাছ শিকার করছে প্রভাবশালীরা। প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও তাতে কাজে আসছে না।
সূত্র জানায়, আত্রাই নদীর বিয়াঘাট ইউনিয়নের বিলহরিবাড়ির সাবগাড়ি বাজার সংলগ্ন নদীতে অবৈধ ভাবে সোতিজাল দিয়ে মাছ শিকার করছে স্থানীয় আবুল কালাম মেম্বার এবং আজিজুল ইসলাম। এছাড়া রমিজুল এবং মান্নানের নেতৃতে চলছে দ্বিতীয়টি, রাবার ড্যাম ব্রিজের সাথে সোতিজাল দিয়েছে শফিকুল ইসলাম নামের অপর এক ব্যক্তি। চতুর্থ স্থানে বিএনপি নেতা আকরাম হোসেন এবং পঞ্চমস্থানে সোতিজাল দিয়েছে রবি নামের এক যুবলীগ নেতা। তবে সম্প্রতি রবিকে পুলিশ গ্রেফতার করলেও জামিন নিয়ে এসে আবারো সোতিজাল দিয়ে মাছ শিকার করছে সে। এছাড়া আত্রাই নদীর কারিগরপাড়া জলায় মিন্টু হোসেন এবং হরদমা জলায় ফেরদৌস এবং এলাহি একই জলায় মুকুল এবং মমিনের নেতৃত্বে সোতিজাল দিয়ে মাছ শিকার চলছে।
এবিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা গণপতি রায় নদীতে অবৈধ সোতিজাল থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, অবৈধ সোতিজালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। তারপরও প্রভাবশালীরা পুনরায় সোতিজাল বসিয়ে মাছ শিকার করছে। তবে এবার অভিযানের পাশাপাশি কয়েকটি মালিকের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। কয়েকজন গ্রেফতারও হয়েছে।