নাটোরে অস্থির চালের বাজার || ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭, ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ

নাটোর অফিস


খাদ্যে উদ্বৃত্ত উত্তরের জেলা নাটোর। জেলায় সাতটি উপজেলায় এক হাজার ৫৭১টি চালকল রয়েছে। এর মধ্যে অটোরাইস মিল রয়েছে ছয়টি। প্রতিবছর এ জেলা থেকে প্রায় ৮/১০ লাখ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়ে থাকে। এর মধ্যে সিংড়া উপজেলাতেই আড়াইলাখ মেট্রিক টন দানাদার (চাল, গম, ভুট্টা) উৎপাদন হয়। কৃষি প্রধান জেলা হওয়ার সত্ত্বেও চালের দাম দিন দিন বেড়েই চলছে।
চালের দাম বৃদ্ধিতে সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন জেলা চালকল মালিকরা। আগামীতে চালের দাম আরও বাড়বে পাবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেন, সরকার প্রথম অবস্থায় চালের শুল্ক কমিয়ে দিলে বাজারে চালের দাম বাড়তো না। অপরদিকে মজুদদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সহসা বাজারে চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
নাটোরের মাদ্রাসা বাজার, নীচা বাজার, স্টেশন চালের বাজার ঘুরে জানা গেছে, ঈদের পর পাইকারি ও খুচরা বাজারে সব ধরনের চালের দাম ফের বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিকেজি নাজিরশাইল পূর্বে ছিল ৫২-৫৪ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৬০-৬২ টাকা, বিআর-২৮ চাল ৪২-৪৪ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫২-৫৩ টাকা, জিরাশাইল ৫০-৫২ টাকা থেকে বর্তমানে ৫৩-৫৭ টাকা, পারিজা ৪০-৪২ টাকা থেকে বর্তমানে ৪২-৫০ টাকা, গুটিস্বর্ণা ৩৫-৩৬ টাকা থেকে বর্তমানে ৪৫-৪৭ টাকা, এলসি ৪০-৪২ টাকা থেকে বর্তমানে ৫০-৫২ টাকা বিক্রি হচ্ছে। গত ১৫ দিনে প্রতিকেজি চালের দাম ৫-৮ টাকা এবং ৫০ কেজি ওজনের বস্তপ্রতি ৪শ-৫শ টাকা দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার চাল আমদানিকে উৎসাহিত করার জন্য ২৮ শতাংশ শুল্ক থেকে কমিয়ে দুই শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এছাড়া বাকিতে ঋণপত্র খোলার সুযোগ দেয়া হলেও সরকারিভাবে আমদানির প্রভাব চালের বাজারে পড়ছে না। এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও গত দেড় মাসের ব্যবধানে নাটোরে প্রতি কেজিতে গড় ৬-৮ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যবিত্ত ও নি¤্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষদের।
নাটোর দিবারাত্রী চাল কলের মালিক ও নাটোর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম রমজান বলছেন, বিগত ইরি-বোরো মৌসুমে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা এবং রোগ বালাইয়ের কারণে সারাদেশে প্রতিবিঘা জমিতে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। পরবর্তীতে কৃষকরা বুক ভার আশা নিয়ে আমনের আবাদ শুরু করলে পর পর দুইবার বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে দেশে ধানের সঙ্কট সৃষ্টি হয়। এতে বেশিরভাগই চালকল এখন বন্ধ হয়ে পড়েছে ধানের অভাবে। আমার মিরটাও অনেক দিন যাবৎ আছে।
নাটোর তালতলা হাফরাস্তার রিকশাচালক সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি নাটোর শহরের ভাড়া বাসায় থাকেন। সারাদিন রিকশা চালিয়ে ২৫০-৩০০ টাকা আয় করেন। বাজারে চালের দাম বেড়েছে। আগে যে দামে চাল কিনেছি সেই হিসাবে টাকা এনে এখন আর চাল কিন্তে পারছি না। এছাড়া কাঁচা বাজারে সবজির দামও অস্থির। প্রতিদিন চাল ও তরকারি কিনতেই টাকা শেষ হয়ে যায়। মাছ বাজারে যাওয়াই যায় না। মাস শেষে টানাপোড়েনে পড়তে হয়। চালের বাজার মনিটরিংসহ দাম কমানোর জন্য সরকারে সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
নাটোর শহরের তেবাড়িয়া উত্তরপাড়ার দিনমজুর পিরোজা বেগম বলেন, ১৫ দিন আগে যে চাল ২২শ বস্তা ছিল সেই চাল এখন ২৬শ টাকা বস্তা। দিন আনা দিন খাওয়া আমাদের মতো মানুষদের মরা ছাড়া আর কোন উপায় নাই। এছাড়া বেশ কিছু দিন থেকে ওএমএস বন্ধ আছে। সেখান থেকে স্বল্প দামে চাল ও আটা কিনতে পারতাম। ওএমএস চালু করলে আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষদের সুবিধা হতো।
নাটোর জেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আলেম চৌধুরী বলেন, সরকার সঠিক সময়ে চালের শুল্ক কমিয়ে চাল আমদানিকে উৎসাহিত করলে এখন চালের সঙ্কট তৈরি হতো না। তিনি বলেন, সারাদেশের চালকল মালিকদের নিয়ে বৈঠকে এ প্রস্তাব দিলেও সরকার তখন মানে নি। বর্তমানে ২৮ শতাংশ শুল্ক থেকে কমিয়ে দুই শতাংশে নিয়ে আসছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য সরকার দেশে শুল্ক প্রত্যাহর করলেও প্রতিবেশী দেশ ভারত চালের দাম বৃদ্ধি করে। চালের আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চালের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সমস্যা থেকে উত্তোরনের জন্য যারা অধিক লাভের আশায় মজুদ গড়ে তুলেছেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে চালের বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। আলেম চৌধুরী আরো বলেন, খাদ্য মন্ত্রণালয় দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যাস্ত হলে চাল নিয়ে চালবাজী বন্ধ হয়ে যেত।
নাটোরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, অবৈধভাবে চাল ও ধান মজুদ করে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বাজারে বেশি দামে চাল বিক্রি করছে এক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অবৈধ মজুদদারদের বিরুদ্ধে একটি তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাঠে নামা হয়েছে। চাল মজুদ এবং মূল্য তালিকাসহ বেশ কিছু অপরাধরে অভিযোগে শনিবার দুপুর র্পযন্ত নাটোর অটোরাইস মিল মালিককে ৩০ হাজার, রশিদ অটোমিল মালিককে ৫০ হাজার, বনপাড়ার গাজী অটোরাইস মিল মালিককে ৫০ হাজার টাকা জরমিানা আদায় করা হয়েছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, নাটোর খাদ্য উৎপাদন উদ্বৃত্ত জেলা। বন্যার কারণে এ জেলায় ফসলের ক্ষতি হয়। বর্তমানে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করেছি। ইতোমধ্যেই মজুদ গড়ে তোলার জন্য চারটি অটোরাইস মিল মালিককে জরিমানা করা হয়েছে। আশা করছি শিগগিরই চালের দাম বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে আসবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ