নাটোরে বিলুপ্তির পথে পরিবেশ বান্ধব গরুর হালচাষ, কৃষি যন্ত্র ব্যবহারের ফলে কৃষকের কমেছে শ্রম ও খরচ

আপডেট: ডিসেম্বর ৩, ২০২১, ৯:২০ অপরাহ্ণ


নাটোর প্রতিনিধি:


খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন হালের বলদ, লাঙল-জোয়ালই ছিল কৃষকের মূল ভরসা। সারাদিন কায়িক শ্রমের বিনিময়ে মাঠে ফলতো সপ্নের ফসল। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সেদিন আর নেই। নতুন নতুন যন্ত্রপাতির ব্যবহারে দেশের কৃষিখাতে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এসব যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে কৃষকের কমেছে শ্রম ও খরচ। অপরদিকে বিলুপ্তি হতে চলেছে পরিবেশ বান্ধব গরুর হালচাষ। এক সময়ে নাটোরে ৭টি উপজেলায় প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে কৃষকদের জমি চাষে মূল ভরসাই ছিল একমাত্র গরুর হাল চাষ।

যার বাড়িতে যত বেশি ঐসব সরঞ্জাম থাকতো, এলাকা জুড়ে তার পরিচিতি থাকতো তত বেশি। এতে করে শোভা পেত তার বাড়ির গোয়ালঘর ও বৈঠকখানা। এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই বৈঠকখানাও আর নেই, নেই হালের বলদ, লাঙ্গল, জোয়াল। সবকিছুই এখন বিলুপ্তি হতে চলেছে। সময় ও অর্থের সাশ্রয় এবং এবং ঝামেলামুক্ত থাকতেই লোকজন এখন গরুর হালের পরিবর্তে মাঠে মাঠে নামিয়েছে, পাওয়ার ট্রিলারের যান্ত্রিক হালচাষ। গরুর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, কামলাদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়, গৃহস্থরা আর চায় না অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে। সময় ও অর্থ বাঁচাতে কৃষকদের প্রায় বাড়ি বাড়ি হয়েছে পাওয়ার ট্রিলার। তবে, গরু দিয়ে হালচাষের প্রথা বিলুপ্ত হতে চললেও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন, নাটোরের নলডাঙ্গার পূর্ব মাধনগর গ্রামের জব্বার সরদার (৬৫)।

এই বয়সেও তিনি জমিতে হালচাষ দিয়ে ফসল ফলাচ্ছেন। সরেজমিনে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়। তিনি বলেন, নিজের গরু লাঙ্গল দিয়ে জমিতে চাষ দিচ্ছেন ফসল করার জন্য। এছাড়া আগের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য তিনি এখনো বর্তমানে গরু দিয়ে হাল চাষ দিয়ে থাকেন প্রতিবছর।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অধ্যষিত পুঠিমারী গ্রামের কৃষক মুক্তার আলী বলেন, এখন আর গরুটানা লাঙল দিয়ে জমি চাষ হয় না। ‘এই এলাকায় কোনো চাষের গরু নাই। তবে দুএকটি গ্রামে এখনও হালের বলদ, লাঙল জমি চাষ করতে দেখা যায়, তাছারা পুরাপুরি ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে করা হয়। ফসল মাড়াইও পুরাপুরি যন্ত্রনির্ভর।’

নলডাঙ্গা উপজেলার হালতি গ্রামের কৃষক আজিজ হোসেন বলেন, শুধু তাঁদের গ্রামে কেন, নলডাঙ্গা উপজেলার কোথাও এখন আর লাঙল-গরু দিয়ে জমি চাষ হয় না। ফসল মাড়া

ইও পুরোটাই হয় যন্ত্রে। তবে দুই-একজন কেবল মহিষ দিয়ে জমি সমতল করে।
নাটোর দিঘাপতিয়া এমকে কলেজের (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ কৃষিবিদ আমজাদ হোসেন বলেন, অতীতে প্রতিটি বাড়ি বাড়ি হাল চাষের জন্য একাধিক জোড়া হালের বলদ, লাঙ্গল-জোয়াল ও মইসহ হালচাষের সরঞ্জাম ছিল কৃষকের চাষাবাদের মূল উপকরণ, সে জায়গা এখন দখল করে নিয়েছে পাওয়ার টিলার। এখন সনাতন যন্ত্রাপাতি হিসেবে লাঙল-জোয়ালকে প্রদর্শন করা হয় উন্নয়ন মেলায়। ধারণা করা হচ্ছে নতুন প্রজন্ম সচরাচর এসব যন্ত্রপাতি আর দেখেবে না দেখতে হলে যেতে হবে যাদুঘর কিংবা কোন প্রদর্শনী স্টলে।

এভাবে ক্রমাগতভাবে বদলে যাচ্ছে কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিকাজের চিরাচরিত চিত্র। বদলে যাচ্ছে চাষাবাদের পদ্ধতি। মান্ধাতা আমলের হাল-গরু আর লাঙল-জোয়ালের জায়গায় চলে এসেছে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। দেশে এখন এমন কোনো অঞ্চল খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে কৃষিকাজে কোনো না কোনো যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে না। কোনো কোনো অঞ্চলে জমি চাষ থেকে শুরু করে রোপণ, সার প্রয়োগ, ফসল কাটা, মাড়াই ও বস্তাবন্দী পর্যন্ত সব কাজে ব্যবহূত হচ্ছে আধুনিক যন্ত্রপাতি।

এ ব্যাপারে এমকে কলেজের অর্থনৈতিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহ মো. আব্দুল লতিফ বলেন, স্বাধীনতার পর সরকারি উদ্যোগে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তখন শ্রমশক্তি ও পশুশক্তি উদ্বৃত্ত থাকায় কৃষক এতে আগ্রহী হননি। এখন কৃষিকাজে শ্রমশক্তির অভাব দেখা দেওয়ায় মজুরি অনেক বেড়ে গেছে। পশুশক্তির অভাব দেখা দিয়েছে। পশু লালন-পালনের ব্যয় এবং সমস্যা অনেক বেড়েছে। এ অবস্থায় যান্ত্রিকীকরণ জরুরি হয়ে উঠেছে।

বর্তমান প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার যেমন কৃষি খাতে ভর্তুকিসহ কৃষকের প্রতি এগিয়ে এসেছে, তেমনি কৃষকও তা সানন্দে গ্রহণ করছেন। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ও অন্যান্য সেবা খাতের প্রসার ঘটতে থাকায় কৃষিকাজে শ্রমশক্তির ঘাটতি দেখা দিতে থাকে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাংসের জোগান অব্যাহত রাখতে অভাব দেখা দেয় পশুশক্তির। এর ফলে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির ক্ষেত্র তৈরি হয়। এভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে থাকায় কৃষিকাজে সময়, শ্রম ও ফসলের অপচয় কমে আসছে।

নাটোর অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাহমুদুল ফারুক জানান, দিন দিন ফসলের জমি কমে যাচ্ছে অপরদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খাদ্যের চাহিদা এবং কৃষি জমির ব্যবহারও বাড়ছে। আর সে কারণেই অধিক জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে কৃষিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাড়াতে হবে। যেমন কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কমানো যায়। যন্ত্রটি ব্যবহার করলে সময় বাঁচায় ৭০-৮২ শতাংশ এবং ৭৫ শতাংশ কম শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে এক একর জমির ধান বা গম কাটতে খরচ হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা। সেখানে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার ব্যবহারে লাগে মাত্র ৪০০ টাকা। এটি অল্প কাদার মধ্যেও ব্যবহার করা যায়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ