নাটোরে ১৯ কোটি টাকার ব্রিজ নির্মাণে আত্মসাতের অভিযোগ || সংযোগ সড়ক তৈরি না করায় দুর্ভোগ বেড়েছে দ্বিগুণ

আপডেট: মার্চ ২২, ২০১৭, ১২:৩৩ পূর্বাহ্ণ

নাটোর অফিস



নাটোরে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকায় নির্মিত ব্রিজগুলো কাজে আসছে না জনসাধারণের। গত এক বছর ধরে ব্রিজগুলোর সংযোগ সড়ক (অ্যাপ্রোচ রোড) তৈরি না করায় দুর্ভোগ কমার বদলে বেড়ে গেছে দ্বিগুণ পরিমাণে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নির্মিত এসব ব্রিজের সংযোগ সড়ক না করেই টাকা তুলে নিয়েছেন বেশিরভাগ ঠিকাদার। আর ঠিকাদারদের এসব অনৈতিক কাজে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে খোদ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, যেখানে সেখানে অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ নির্মাণ, নদীর গতিপথ বন্ধ এবং সংকুচিত করে নির্মাণ করা হয়েছে ব্রিজগুলো। আর নির্মাণের নামে আত্মসাত করা হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এসব ব্রিজ সাধারণের চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে সাধারণ মানুষের মাঝে। অপরদিকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩৩ কোটি টাকায় বিভিন্ন নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে আরো ১০৯টি ব্রিজ।
এদিকে, গত রোববার জেলা সমন্বয় কমিটির এক সভায় সকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে অসমাপ্ত ব্রিজের তালিকা করে আগামী সাতদিনের মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ শাখা থেকে জানা যায়, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরের গ্রামীণ  রাস্তায় সেতু-কালভার্ট নির্মাণের জন্য নাটোর জেলাকে ৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয় দুর্যোগ ব্যবস্থপনা অধিদফতর।
স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেন, ১৭ কোটি টাকার বেশিরভাগ ব্রিজ আজও জনসাধারণের চলাচলের জন্য উপযোগী করা হয় নি। বরং যেসব স্থানে ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে, সেসব এলাকার মানুষরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নাটোর সদর উপজেলার তেলকুপি জলার ওপর সেতু নির্মাণ করে নাটোর সদর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ। ৪০ ফুট দৈর্ঘ্যর ব্রিজটি নির্মাণে ব্যায় ধরা হয় ৩২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। আর নির্মাণের জন্য কাজটি পায় ছাত্রলীগের এক নেতা। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছর শেষ হয়ে গেলেও আজও পুর্নাঙ্গভাবে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয় নি। অথচ নির্মাণের পুরো টাকা পকেটে ভরেছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ব্রিজটি দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক না থাকায় যাতায়াত করতে পারছে না এলাকার জনসাধারণ। ফলে নতুন অবস্থায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে রয়েছে ব্রিজটি।
অপরদিকে, কিছু দূরেই ছাতনি দিয়ার দক্ষিণপাড়া মসজিদের নিকট ৪০ ফুট দৈর্ঘের অপর একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। ওই ব্রিজটিরও নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২লাখ ৫২ হাজার টাকা। মসজিদের মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য ব্রিজটি নির্মাণ করা হলেও আজও তৈরি করা হয় নি সংযোগ সড়ক। ফলে বাধ্য হয়ে বাশের সাঁকো তৈরি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্রিজটি দিয়ে পারাপার হচ্ছে মুসল্লিরা। তবে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও কাজ না করেই ব্রিজ নির্মাণের পুরো টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু দুর্ভোগ শেষ হয় নি সাধারণ মুসল্লিদের।
স্থানীয় বাসিন্দা দুলাল সরকার বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হয় নি। জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবের পরিবর্তে দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজগুলো নির্মাণ করা হলেও জনসাধারণের কোন কাজে আসছে না। অবিলম্বে ব্রিজগুলোর সংযোগ সড়ক করে চলাচলের জোর দাবি জানাচ্ছি।
সদর উপজেলার ছাতনী দিয়ার গ্রামের বাসিন্দা মহসিন মন্ডল বলেন, গত এক বছর ধরে শুধু ব্রিজ নির্মাণ করে ফেলে রাখা হয়েছে। কিন্তু কোন সংযোগ সড়কের জন্য মাটি ফেলা হয় নি। তাছাড়া যাতায়াতের কোন সড়ক নেই, অথচ নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণ করে ফেলে রাখা হয়েছে। এখন  যাতায়াতের জন্য খুব সমস্যা হচ্ছে।
সদর উপজেলার ছাতনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আমার ইউনিয়নের দুইটি ব্রিজের সংযোগ সড়ক না হওয়ার কারণে জনগণকে দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। অথচ নির্মাণের একবছর পার হলেও আজ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয় নি। আর ব্রিজ নির্মাণের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে সংযোগ সড়ক করে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েও কোন কাজে আসে নি।
এদিকে, সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করার অভিযোগের পাশাপাশি ব্রিজ নির্মানে নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে। নি¤œমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ব্রিজ নির্মাণের পরপরই গত বছরের মে মাসে সদর উপজেলার হরিশপুর ইউনিয়নের জলারকান্দি এলাকার একটি নির্মাণাধীন ব্রিজ ভেঙে পড়ে। এরপর থেকে স্থানীয় এলাকাবাসীরা ওই ব্রিজের নাম দিয়েছে ভাঙা ব্রিজ।
স্থানীয় জলারকান্দি এলাকাবাসী আবু বক্কর বলেন, নদী পারপারের জন্য মূলত ব্রিজ নির্মাণ করা হয় জলারকান্দি এলাকায়। কিন্তু ঠিকাদার নি¤œমানের সামগ্রী দিয়ে ব্রিজটি নির্মাণ করার কারণে গত বছরের মে মাসে ভেঙে পড়ে। পরে পুনরায় ঠিকাদার ব্রিজটি নির্মাণ করলেও আজ পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে নি। যার কারণে দুর্ভোগ রয়েই গেছে। আর পুনরায় ব্রিজ ভেঙে পড়ার ভয়ে এখন পর্যন্ত ঢালাই কাজে ব্যবহার করা সাটারিং খুলে নি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান।
আরেক বাসিন্দা উজ্জল কুমার বলেন, ব্রিজটি নির্মাণে যে ধরণের সামগ্রী ব্যবহার করার কথা ছিল, তার নূন্যতম করে নি। যার কারণে ব্রিজটি ভেঙে পড়ে। এখনও যে কোন সময় ব্রিজটি পুনরায় ভেঙে পড়তে পারে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সদরে প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ৯টি এবং নলডাঙ্গা উপজেলায় প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ৬টি ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। অধিকাংশ ব্রিজের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। তবে তথ্য প্রমাণ তুলে ধরলে পিআইও আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, গত অর্থবছরের দুইটি ব্রিজের কাজ এখনও চলমান রয়েছে, তারপর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ শেষ করার জন্য বারবার চিঠি দেয়া হয়েছে। তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় সিংড়ার পিআইও অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকায় ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করেছে বলে যুক্তি তুলে ধরেন।  তাছাড়া দুই একটি কাজে অনিয়ম হতে পারে সবগুলো কাজে অনিয়ম হয় নি বলেও স্বীকার করে তিনি।
তিনি আরো বলেন, বরাদ্দকৃত মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ টাকা জামানত রয়েছে। কাজ পুরোপুরিভাবে শেষ না হলে জামানাতের টাকা বাজেয়াপ্রাপ্ত হবে ঠিকাদারের।
নাটোরের জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুনের কাছে তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করলে তিনি সবকিছু শুনে বলেন, সরকারি টাকা যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আগামী দিনে সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করে সকল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের পরিত্যক্ত ব্রিজগুলো সচল করার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত টাকা পরিশোধের কোন নিয়ম নেই। যদি কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের টাকা দিয়ে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া কেন এতোদিন ধরে ব্রিজগুলোর কাজ শেষ হয় নি, সে ব্যাপারে ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ইউএনওদের নির্দেশ দেয়া হবে।
এদিকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের যেসব ব্রিজ নির্মাণ করা হচ্ছে তার বেশিরভাগ ব্রিজ নদীর পথ বন্ধ করে। এছাড়া নদীকে সঙ্কুচিত করে ফেলা হচ্ছে ব্রিজ নির্মাণের মাধ্যমে। যার কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা।
দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি নাটোর শাখার সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, সরকারি টাকা ইচ্ছামতো লুটপাট করা হচ্ছে। কোন জবাবদিহিতা না থাকায় সরকারি কর্মকর্তারা ইচ্ছামতো আত্মসাত করছে। সরেজমিনে ব্রিজগুলোর অবস্থা দেখে কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ উচিত সংশ্লিষ্ট ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের।
তিনি আরো বলেন, আমাদের নদীমাতৃক দেশ। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে ব্রিজ নির্মাণের কারণে নদীগুলো গতিপথ হারিয়ে ফেলছে। নদীর ওপর স্থাপনা নির্মাণে আইনগত বাধা এবং পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেয়ার নিয়ম থাকলেও খোদ সরকারি অফিসগুলো সেগুলো মানছে না।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শাহিনা খাতুন বলেন, নদীর গতিপথ বন্ধ করে কোন স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। নদীকে সচল রেখে সকল স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে।