নারীর পশ্চাদপদতা

আপডেট: জানুয়ারি ৫, ২০১৭, ১২:০৪ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


অসীম ও অনন্ত সম্ভাবনা নিয়ে যে নারী একদিন পৃথিবীর আলো দেখে খুব ব্যতিক্রম ক্ষেত্র ছাড়া জন্মলগ্ন থেকেই সে বেড়ে ওঠে একটা বোঝ হিসেবে। সাদরে তাকে গ্রহণ করে খুব কম সংখ্যক মানুষ। প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য অবহেলা, অযতœ ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মধ্যে বেড়ে ওঠে সে। তার জীবনচক্রের এক একটি পর্যায় পার হয় এক একজন পুরুষের অধীনে অনেকটাই তাদের ইচ্ছার দাসরূপে। স্বাধীনতা নামক সোনার হরিণটি অধরা থেকে যায় বেশির ভাগ নারীর জীবনে।
অবুঝ অবস্থা থেকেই সে বড় হয় নানা নিষেধের বেড়াজালের ভেতরে। প্রতিনিয়ত তাকে শুনতে হয় এটা করো না, ওটা করো না, মেয়েদের এটা করতে নেই, ওটা করতে নেই, এখানে যেওনা, ওখানে যেওনা, এর সাথে কথা বলো, ওর সাথে কথা বলো না, এভাবে কথা বলো না, ওভাবে কাজ করো না ইত্যাদি ইত্যাদি। নানা নিষেধাজ্ঞার ভেতরে বড় হতে হতে মেয়েদের অনেক সুকুমার বৃত্তির অকাল মৃত্যু ঘটে।
তাদের মেধা, মনন ও সৃষ্টিশীলতা পদে পদে বিঘিœত হয়। শুধু তাই নয়, ছেলে ও মেয়ের ভেতরে যে বৈষম্য সব সুযোগ সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে সেটাও মেয়েদের হীনমন্যতায় ভোগায়। এ বৈষম্য পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত- কোথাও সেটা দৃশ্যমান, কোথাও বা প্রচ্ছন্ন।
একা পথচলা তার জন্য নিরাপদ নয়Ñ কারণ বখাটেদের উৎপাত। কারো কু-প্রস্তাবকে বা প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হলে তাকে হামলার শিকার হতে হয়, এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়। সমাজ বখাটেদের শাস্তির পরিবর্তে মেয়েটির প্রতি আঙ্গুল তোলে, তাকে দোষারোপ করে। ব্যতিক্রম খুব কমই লক্ষ্য করা যায়। এসব বখাটেরা অর্থের জোরে আইনের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে বেরিয়ে যায়। সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে যার মূল শিকার হয় নিষ্পাপ মেয়েরা।
অনেক মেয়ে এ কারণে মেধা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাজীবন থেকে অকালে ঝরে পড়ে কিংবা বাল্যবিয়ের শিকার হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটা দেশের মানবসম্পদ, অর্থনীতি তথা উজ্জ্বল সোনালী ভবিষ্যত।
শিক্ষক জাতির বিবেক। মানুষ গড়ার কারিগর। মেয়েরা তাদের কাছেও নিরাপদ নয়। পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই ছাত্রীর সাথে প্রতারণা কিংবা অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার খবর প্রকাশিত হয়। অনেক সত্যি ঘটনা লোকলজ্জার ভয়ে প্রকাশিত হয় না। নারী/মেয়েরা নির্যাতিত হচ্ছে অথচ তার কোন প্রতিকার নেই। যে মেয়েরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয় তাদের মানসিক অবস্থার কথা, তাদের পরিবারের কথা, তাদের দুর্দশার কথায় অনেক সময়ই আইনশৃংখলা বাহিনী কর্ণপাত করে না। এমনকি তারা অভিযোগও গ্রহণ করে না।
শুধুমাত্র লেখাপড়াই নয়, অন্য যে কোন শিক্ষার ক্ষেত্রেও কোমলমতি মেয়েরা শিক্ষকের অশোভন আচরণের ফলে সে শিক্ষা থেকে বিরত থাকে। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় মেয়ের প্রতিভা বিকশিত হয় না- তারা শিক্ষা বিমুখ হয়ে ওঠে। অনেকে নিজেদের সামলে নিতে পারলেও কারো কারো পক্ষে সেটা  সম্ভব হয় না। এসব জ্ঞানপাপীরা অনেক সময়ই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। বিশেষ মহল আবার তাদের মাথায় করে রাখে। বাইরে তারা এমন লেবাস নিয়ে চলে যে কেউ অভিযোগ করলেও অনেকেই তা আমলে নেবে না। ফলশ্রুতিতে মেয়েরা পিছিয়ে পড়ে শিল্প ও সংস্কৃতির অংগন থেকে। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে – সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এটাই স্বাভাবিক ও বাস্তব চিত্র।
অনেক বাধা বিপত্তি পেরিয়েও অনেক মেয়ে শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। সেখানেও তাদের মুখোমুখি হতে হয় বৈরী পরিবেশের। সহকর্মীদের অনেকেই সৎ ও কৃতিত্বপূর্ণ আচরণ করলেও অনেকেই থাকে ছিদ্রান্বেষী। যাদের কাজ হলো অন্যের দোষত্রুটি বিশেষ করে মেয়েদের নানাভাবে হেয় করা। সেখানেও সংগ্রাম করে মেয়েদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে টিকে থাকতে হয়। মেয়েদের অনিচ্ছাকৃত ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে বড় করে দেখানোর অথবা আদৌ কোন ত্রুটি না থাকলেও তাদের সম্পর্কে ঢালাওভাবে নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়।
এরপরে আসে সংসার জীবন। অনেক প্রতিভা অকালে ঝরে গেছে কিংবা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও খুড়িয়ে খুড়িয়ে কোন রকমে টিকে থাকতে হয় অনেক মেয়েকে। সমাজে বহু পুরুষ আছে যার অনেক অর্জন এবং সাফল্যের পেছনে মূলচালিকা শক্তি নারী। অর্থ-বিত্ত, সংসারের কাজ, সমাজিকতা নিজের পেশা, সন্তান লালনসহ যাবতীয় দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেও অনেক মেয়েই স্বামীনামক দানবটির মনের নাগাল পায় না। খুব সাধারণ একটা অবস্থান থেকে স্ত্রীর সার্বিক সহযোগিতার যখন সমাজ, সংস্কৃতি কিংবা কর্মজীবনে একটা শক্ত অবস্থানে যায়, স্বোচ্ছাচারী জীবন যাপন করে এবং সেখানে যতদিন স্ত্রী টু শব্দ না করে ততদিন দায়িত্বজ্ঞানহীন এসব অবিবেক পুরুষেরা নিশ্চুপ থাকে কিছুটা। কিন্তু স্ত্রী প্রতিবাদী হয়ে ওঠে কিংবা তার স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে কথা বলে তখনই বাধাবিপত্তি। তখনই কাছের কাউকে অকৃতজ্ঞের মতো নির্দ্বিধায় জানিয়ে দেয়, স্ত্রী তাকে নির্যাতন করছে, অথবা সে মানসিক রোগী। সুতরাং তার সাথে থাকা সম্ভব নয়। এ বেহিসেবি মানুষটির বিবেক যদি স্বাভাবিকভাবে কাজ করে তাহলে তার অশেষ কৃতজ্ঞ থাকা উচিৎ- স্ত্রী নামক মানুষটির প্রতি। কারণ আজ তার অবস্থান যেখানেই থাকুক না কেন যেখানে আছে- তার স্ত্রী নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সার্বিক সহযোগিতা। এ সহজ সত্যকে যারা অস্বীকার তারা আর যাই হোক কোন উদার, সংস্কৃতিমনা ও বিবেকবান মানুষ হতে পারে না। তার স্ত্রী তার জীবনের যে মূল্যবান সময়, মেধা ও শ্রম নিজের উন্নয়নের কাজে ব্যয় করতে পারত সে সময় সে ব্যয় করছে স্বামীর সেবা, সন্তান লালন-পালন, সমাজিকতা ও আতিথেয়তায়। একজন পুরুষ কি করে ভুলে যায়, একজন নারী পুরুষের সমান সুযোগ পেলে সর্বক্ষেত্রে তাদের ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সংসার, সন্তান ও দায়িত্বের শৃংখল তাকে নিজের সম্পর্কে ভাববার কিছুমাত্র সুযোগও দেয় না। ফলে নারী পশ্চাদপদ।
অনেকেই বলবেন নারীর অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান। হ্যাঁ, একথা সত্যি নারীর অংশগ্রহণ অনেকক্ষেত্রেই বেড়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন বেড়েছে। কিন্তু যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এমনকি পরিবারেও সে অনেকটা অবহেলিত। যারা নানা ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছেন তাদের সংখ্যা হাতে গোনা। বৃহত্তর  নারীগোষ্ঠীর সকলকে দৃশ্যমান ও অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত করতে হলে নারী সচেতনতার সাথে সাথে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও অধিপত্যবাদ কমিয়ে মানবিক হতে হবে। সরকার ও নানা বেসরকারি সংস্থাকে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। শুধু তাই নয়, তাদের কাজের তদারকি ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীকে মানুষের মর্যাদা দিয়ে তার ভেতরের মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। তার কাজের নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মক্ষেত্রে শিশুদের দেখাশোনার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে মায়েরা নিশ্চিত মনে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। নারীকে নারী হিসেবে না দেখে তাদের যোগ্য সম্মান দিতে, প্রত্যেকটি সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আস্থাশীল হতে হবে। নারীদের কাজের মূল্যায়ন করতে হবে সর্বক্ষেত্রে। তাদের চলার পথ নিরাপদ করতে হবে, পুরুষদের স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ করতে হবে। নারীর প্রতি বিশ্বস্ত আচরণ করতে এবং নমনীয় থাকতে হবে। তাদের সব সময় মনে রাখা উচিৎ একজন নারীর অবদান সংসার, সমাজ তথা রাষ্ট্রে পুরুষের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে অনেক বেশিই। তাদের মনোভাব পরিবর্তন করা জরুরি। বিয়ে করে বা ভোগ করে একটা মেয়েকে যখন ইচ্ছা ত্যাগ করে বা তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে অন্য মেয়ের সাথে নতুন সম্পর্কে জাড়িয়ে পড়ার নোংরা খেলাটা বন্ধ করতে হবে। কেউ এ ধরনের কাজ করলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
নারীর পশ্চাদপদতার জন্য যেমন দায়ী পরিবার, সমাজÑ তেমনি দায়ী নারী পুরুষের অধিপত্য ও স্বেচ্ছাচার। সুতরাং, এটা বন্ধে প্রথমত মেয়েদের সচেতন হতে হবে, দ্বিতীয়তঃ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের পরিবর্তন করতে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে সার্বিকভাবে। তবেই জেগে উঠবে নারী, দেশ এগিয়ে যাবে সাফল্যের পথে কল্যাণের পথে।