নারী নিরাপত্তা

আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০২০, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

শুভ্ররাণী চন্দ


মানুষের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত হয় তাহলে সে স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে এবং কাজ করতে পারে। কিন্তু নানাভাবে অনিরাপত্তা, মানুষের স্বাধীনতা হরণ করছে প্রতিনিয়ত। মানুষ আজ নিজ ঘরেও নিরাপদ নয়। অনিশ্চয়তা, অনিরাপত্তা আজ নিয়ন্ত্রণহীন। বাইরের নানা ঝুঁকি নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম কারণ। এসব ঝুঁকির বেশিরভাগই মনুষ্যসৃষ্ট। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই নানাভাবে কোনো না কোনো ঝুঁকির শিকার হচ্ছে। এসব ঝুঁকির পেছনে রয়েছে মনুষ্যত্বের অবক্ষয়। সামাজিক অবক্ষয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। মানুষের মানবিকতা আজ বিপণ্ন। মানবিকতার স্থানে ঠাঁই পেয়েছে পশুত্ব। পশুশক্তির উত্থানের পেছনে রয়েছে আকাশ সভ্যতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে ভালো জিনিষের প্রতি মানুষের আসক্তি বাড়ছে না। সে কারণে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন অনেক আলগা হয়ে গেছে। মানুষ তুচ্ছ কারণে অন্যের উপর চড়াও হচ্ছে, পাশবিক ও অন্যায় আচরণ করছে। সহিংসতা এখন ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র।
একথা এখন সহজেই অনুমেয় মানুষ কোথাও নিরাপদ নয় আজ। তবে এ নিরাপত্তা বেশি করে ভাবাচ্ছে নারীসমাজকে। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের কারণ মেয়েরা নিগৃহীত কিংবা নির্যাতিত হচ্ছে প্রায় সর্বত্র। নিজ পরিবারেও মেয়েদের যোগ্য সম্মান দেওয়া হয় না অনেক ক্ষেত্রে। শিশুকাল থেকে অনেক মেয়ে অবহেলা ও অনাদরে বড় হয়। সে হীনমন্যতায় ভোগে। তার মেধার বিকাশ বিঘ্নিত হয়। অনেক পরিবারেরই মূল উদ্দেশ্য থাকে একটা উপযুক্ত বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়া। অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিয়ের মত ঘটনাও ঘটে। একটা মেয়ে শিক্ষা-দীক্ষার কতটুকু পারদর্শী হলো সেটা অনেকক্ষেত্রেই গৌন থেকে যায়। একটা মেয়েও যে মানুষ, তারও যে একটা নিজস্ব পরিচয় থাকা উচিৎ-এটা অনেকেই ভাবেন না। ফলে মেয়েরা বেঁচে থাকে বাবা, ভাই স্বামীর পরিচয়ে- এ পরিচয়গুলো হেলাফেলার নয় নিশ্চয়ই। তবে যদি মেয়েরা প্রথমতঃ নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে সেটি হবে নিশ্চয়ই গৌরবের। এ পরিচয় তৈরি করতে হলে নারীর নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি। মেয়েরা সমাজ সংসারে, কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হয় কারণে অকারণে। প্রতিকার মেলে না অনেকক্ষেত্রেই। কখনো নারী প্রতিবাদ করতে পারে না পুরুষের কর্তৃত্বের কাছে, আধিপত্যবাদের কাছে। সমাজ কোনো অরাজকতা যদি তৈরি হয় নারী-পুরুষের কারণে তাহলে সবাই নির্দ্বিধায় দোষারোপ করে নারীকে।
ক্ষমতাসীন সরকার নারীবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে বদ্ধপরিকর। অনেক প্রকল্প তারা হাতে নিয়ে সব প্রকল্প যে সাফল্যের সাথে কাজ করতে পারবে তা নয়। নানা আইন প্রণীত হয়েছে, নারী অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য। আইন করে সহিংসতা বন্ধ করা অনেকক্ষেত্রেই হয়ত সম্ভব নয়। একটা নিরাপদ নারীবান্ধব সমাজ তৈরির সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষের মানবিকতার উন্মেষ। নারীকে নারী হিসেবে না দেখে যদি শুধু মানুষ হিসেবে দেখতে শেখে সবাই- তাহলে বৈষম্য কমে যাবে অনেক। তা না হলে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়তেই থাকবে।
এত আইন-কানুন থাকা সত্ত্বেও দুর্বৃত্তরা ভয় পায় না। পত্র-পত্রিকায় এখনও প্রতিদিন নারী নিগ্রহের নানা খবর প্রকাশিত হয়। এক এক ঘটনার নারকীয়তা পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দেয়। পত্র-পত্রিকায় বিবৃতি আসে। নিরাপত্তা কর্মীদের আশ্বাস থাকে অপরাধীকে ধরে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবার, মানবন্ধন হয়। প্রতিবাদ সভা, মিটিং হয়, উত্তাল হয়ে উঠে দেশ-তারপরেই সব শেষ। যদি বা অপরাধী ধরা পড়ে কখনও আইনের ফাঁক- ফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায় অপরাধী, আবার অপরাধ সংঘটিত করে। পারও পেয়ে যায়। এরা অনেকক্ষেত্রেই হয় বড়লোকের বখাটে ছেলে। কন্যা সন্তান নিগৃহীত হয় অনেক ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়ের দ্বারা- সেটি আরো ভয়ংকর। এ বিষয়গুলো মেয়েরা না পারে প্রকাশ করতে, না পারে মেনে নিতে। এমন ঘটনার শিকার মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। ছন্দপতন হয় তার জীবনের। ফলে অনেক মেধাবী কন্যা সন্তানের জীবন নষ্ট হয়ে যায়, হারিয়ে যায় তার স্বাভাবিক জীবন।
অতিসম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক মেধাবী ছাত্র-পাশবিকতার শিকার হয় এক মধ্য বয়সী লম্পটের। ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের মত ব্যস্ত সড়কে এমন ঘটনা ঘটতে পারে- এটা ভাবা যায় না। যথারীতি প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে, শাস্তি চাওয়া হচ্ছে, মিছিল হচ্ছে, অপরাধী এখনও ধরা পড়েনি। পড়লেও মেয়েটির যে ক্ষতি হয়ে গেলো তা কি দিয়ে পূরণ হবে? এ ধরনের জঘন্য অপরাধীদের কঠিন, কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিৎ যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এ ধরনের অপরাধ করার আগে বারংবার ভাবে।
এ ধরনের অপরাধ বন্ধে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। মেয়েদের যদি কন্যা, বোন কিংবা মা ভাবা যায় তাহলে এ অরাজকতা বন্ধ হতে পারে। সেক্ষেত্রে মানসিকতা পরিবর্তন দরকার। জোর করে কিংবা আইন করে মানসিকতার পরিবর্তন সম্ভব নয়। প্রয়োজন মানবিকতার চর্চা ও তার বিস্তার। সমাজের এসব অপসংস্কৃতি বন্ধে পরিবার থেকেই চর্চা শুরু করা দরকার। কারণ পারিবারিক সুশিক্ষাই পারে মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপামর জনসাধারণের অপরিহার্য দায়িত্ব। একটা সুন্দর সমাজ, জাতি তথা দেশ গঠনে নারী পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াস খুবই জরুরি। নারীকে বাদ দিয়ে কোনো কাজই সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব নয়। সুতরাং, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সকলকে এক সাথে কাজ করতে হবে।