নারী নির্যাতনে ভিন্ন মাত্রা

আপডেট: অক্টোবর ৯, ২০১৬, ১১:৪০ অপরাহ্ণ

শাহিনুল ইসলাম আশিক
নির্যাতনের মাত্রা ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। আগে নির্যাতনের ধরন ছিল মারধর। ক্রমান্বয়ে যোগ হয় অ্যাসিড নিক্ষেপ। বর্তমানে নির্যাতনের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে ধারলো অস্ত্রদিয়ে কুপিয়ে হত্যা। শুধু তাই নয়, আবার কখনো অপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ছাড়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।
গত ২৭ মে গত শুক্রবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার মহিপুর এসএএম দ্বিমুখি উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির চার ছাত্রী কণিকা, তারিন, মরিয়ম ও তানজিমা মহিপুর মোড়ে প্রাইভেট পড়ে বাড়ি যাচ্ছিলেন। পথে মহিপুর ডিগ্রি কলেজের পিছনের বখাটে আব্দুল মালেক ৪ ছাত্রীকে হাসুয়া দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর যখম করে। তাদের উদ্ধার করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করলে কর্তব্যরত চিকিৎসক কণিকা রানী ঘোষকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। অপর তিন ছাত্রীকে গুরুতর আহত অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
একই দিনে রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ছাত্রীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় দুই পক্ষের মাধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটেছে।
যৌন হয়রানির অভিযুক্ত সাকিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। সে মাদার বখ্শ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর অভিযোগ, ‘সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোডে সাইকেল চালাচ্ছিলাম। এমন সময় সাকিবসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে উদ্দেশ্য করে কটুক্তি করে। এসময় আরো কিছু বাজে শব্দ ব্যবহার করে তারা। এছাড়াও তারা শারীরিকভাবে লঞ্ছিত করে।’
রাবি শিক্ষার্থীরা জানান, রাত নয়টার দিকে ভুক্তভোগী ছাত্রীর কয়েকজন বন্ধু যৌন হয়রানির বিষয়টি মীমাংসার জন্য নবাব আব্দুল লতিফ হলে আসেন। সাকিব তাদের নওয়াব আব্দুল লতিফ হলে বল্লে ছাত্রীর বন্ধু এরশাদ, রাশেদ, রিওনসহ কয়েকজন সেখানে যান। কিন্তু সেখানে কথাকাটাকটির এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়।
তার একদিন আগে গত দুই সেপ্টেম্বর শনিবার বিকাল ৫টার দিকে টাকার লোভ দেখিয়ে ছয় বছরের এক স্কুলছাত্রকে নগরীর মির্জাপুর এলাকার ফাতেমা ছাত্রাবাসে ডেকে নিয়ে যৌন নির্যাতন করেছে মোজাফ্ফর হোসেন নামের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) সাবেক এক শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় এলাকাবাসী তাকে পিটিয়ে পুলিশে দেয়। নগরীর মতিহার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবির বলেন, শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মোজাফ্ফর নামের একজনকে পুলিশ আটক করেছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তার একদিন আগে শুক্রবার নওগাঁর মহাদেবপুরে গৃহবধুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে গ্রাম্য শালীসে এক যুবকের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নির্যাতিত গৃহবধুসহ পরিবারকে ১৫ দিনের মধ্যে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। ঘটনাটি ঘটেছে গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাত ৯ টায় উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নের বাগাচারা আদর্শগ্রামে। ঘটনাটি মিমাংসার নামে ধামাচাপা দিতে আদর্শগ্রামের সভাপতি আয়েজ উদ্দীন গত ৩০ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাত ৯ টায় সেখানে এক শালিস বৈঠক ডাকে।
শালীসে স্থানীয় মাতব্বরগণ ধর্ষণ চেষ্টাকারী তুহিনের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করাসহ নির্যাতিত গৃহবধুসহ পরিবারকে ১৫ দিনের মধ্যে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেন। এ ব্যাপারে মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) সাবের রেজা আহম্মেদ জানান ঘটনাটি তিনি শুনেছেন এবং তার কাছে এখনো কেউ অভিযোগ বা মামলা করতে আসেনি। নির্যাতিত পরিবার মামলা করতে চাইলে অবশ্যই মামলা নেয়া হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ঘটনার গত মঙ্গলবার বাঘায় ধর্ষক হান্নান মোল্লাকে গ্রেফতার ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধমে বিচার দাবি করে মানববন্ধন করেছে গড়গড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এর গত ৩ সেপ্টেম্বর আবদুল হান্নান মোল্লা বেড়ানোর কথা বলে ওই বিদ্যলয়ের সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীকে (১৩) উপজেলার মিলিকবাঘা গ্রামের বানেরা বেগম নামে এক নারীর বাড়িতে ৫ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। ৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টায় সেখান থেকে কৌশলে পালিয়ে একজন ভ্যান চালকের সহায়তায় থানায় যায় স্কুলছাত্রী। খবর পেয়ে তার মা ও ভাইসহ অন্য অবিভাবকরা থানায় গিয়ে ধর্ষক হান্নানসহ দুই জনকে আসামি করে রাতেই মামলা করেন। পুলিশ এ মামলার আসামি বানেরা বেগমকে এইদিন গ্রেফতার করলেও ধর্ষক হান্নানকে গ্রেফতার করতে পারে নি। ধর্ষক হান্নান উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের ওসমান মোল্লার ছেলে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হীরেন্দ্রনাথ বলেন, মেডিকেল রিপোর্ট এখনো পায়নি। তবে ধর্ষককে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
একই দিনে গোদাগাড়ীতে এক শিক্ষকের সঙ্গে অপর এক ছাত্রীর আপত্তিকর ভিডিও ফাঁসের অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
উপজেলার বালিয়াঘাট্ট্রা গ্রামের আশরাফুল হকের ছেলে মো. ময়েন (৩৫) উপজেলার গুল গোফুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকতা করেন। একই বিদ্যালয় ও কলেজের এক ছাত্রীকে গত এসএসসি পরীক্ষার আগে প্রাইভেট পড়ানোর সময় তার সাথে প্রেমের সর্ম্পক গড়ে তোলেন শিক্ষক ময়েন। গত এসএসসি‘র ব্যবহারিক পরীক্ষায় শারীরিক সমস্যার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না বলে ওই পরীক্ষার্থী ছাত্রী বিষয়টি শিক্ষক ময়েনকে জানায়। পরে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ২৫ নম্বরই দেয়া হয়েছে বলে ওই ছাত্রীকে বাসা ডেকে নেন ময়েন। এরপর তার সাথে শারীরিক সর্ম্পক করেন। এটি ক্যামেরায় ধারণ করেন অভিযুক্ত শিক্ষক। সম্প্রতি ওই শিক্ষক তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ উইন্ডোজ দিতে স্থানীয় একটি দোকানে দেন। সেখান থেকে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।  তার একদিন আগে শনিবার তানোরের পৌর এলাকার গোকুল গ্রামে ৫০ হাজার টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীর দুই কানের লতি ছিঁড়ে ফেলেছেন স্বামী। এঘটনায় সোমবার বিকালে থানায় স্ত্রী ফরিদা বেগম (৩০) বাদী হয়ে তাঁর স্বামী  রাজুসহ (৪০) তিন জনকে অভিযুক্ত করে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
এদিকে, গত রোববার দুপুরে গোদাগাড়ীতে অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া এক স্কুলছাত্রীর জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিয়ে দেয়া হয়। মেয়েটির মা বিলকিশ বেগম সোমবার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) জাহিদ নেওয়াজের কাছে লিখিত এ অভিযোগ করেন।
অভিযোগ তিনি বলেন, পৌরসভার শ্রীমন্তপুর মহল্লার মৃত পিয়ারুল ইসলামের অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ে মৌসুমি খাতুন কনিকাকে (১৫) বিয়ের প্রস্তাব দিত পার্শ্ববর্তী মাদারপুর মহল্লার মৃত কালুর বখাটে ছেলে তুহিন (১৭)। পরে শহিদুল ইসলাম (৩৫) ও আবদুর রহিম (৩৬) কৌশলে গ্রামের রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান। এরপর তারা সেখানে জোরপূর্বক বখাটে তুহিনের সাথে তার বিয়ে দিয়ে দেন।