বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী

নারী শিক্ষার পথিকৃৎ -বেগম রোকেয়া

আপডেট: December 12, 2019, 1:15 am

শুভ্রা রানী চন্দা


১৮৮০ সালের ৯ই ডিসেম্বর রংপুর জেলার পায়রাবন্দে এক জমিদার পরিবারে জন্ম হয় বেগম রোকেয়ার। অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাননি তিনি। কিন্তু বড় ভাই ইব্রাহীম সাহেবের সহায়তায় এবং নিজের ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় তিনি শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন নারীর অবরুদ্ধ অবস্থার কথা, সমাজে, সংসার তথা সর্বত্রই নারীর অমর্যদার কথা। তিনি এ সত্যও অনুধাবন করেছিলেন যে, শিক্ষা ছাড়া নারীমুক্তি সম্ভব নয়। সমাজের অন্ধকারাচ্ছন্ন কারাগৃহ থেকে নারীকে আলোর পথ দেখানোর জন্য শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্যই সমাজের নানা প্রতিকূলতাকে সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করে তিনি নারী মুক্তি ও নারী শিক্ষার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে গেছেন। নারীর অগ্রযাত্রার পথপ্রশস্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর এ সত্যটি উপলব্ধি করেছিলেন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে বাদ দিয়ে এ দেশের উন্নতি অসম্ভব। তাই তিনি নারীর সমঅধিকারের বিষয়টিকে বাংলাদেশের সংবিধানে নিশ্চিত করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তিনি নারী পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন। তিনিই যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশের বহুমুখি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেন। সময়ের পথপরিক্রমার নারী আজ অনেকটাই মুক্ত ও স্বাবলম্বী। বেগম রোকেয়া নারী জাতিকে উন্নয়নের পথের যে দিশা দেখিয়েছিলেন, যে আলোকবর্তিতা তিনি জ্বালিয়েছিলেন বর্তমান সরকার তার সাথে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করায় নারী আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অর্জনেও তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হচ্ছেন।
নারী একদিকে যেমন সংসার, সমাজের নানা নিষেধের শ্ঙ্খৃলে আবদ্ধ, তেমনি শৃঙ্খলিত মনের দাসত্বে।
অলঙ্কার নারীর অতিপ্রিয়। এগুলো কি দাসত্বের নিদর্শন নয়? অলঙ্কার সৌন্দর্যের প্রতীক বলে নারীকে অলঙ্কারে মুড়ে রাখা হতো, এখনও হয়। কিন্তু অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির মতে, অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন। কারাগারে বন্দিরা পরে লোহার বেড়ি। আর সে পরে সোনা রূপার তৈরি বেড়ি অর্থাৎ মল। কুকুরকে গলায় যে গলাবন্ধ পরানো হয়- তারই অনুকরণে তৈরি হয় মেয়েদের জড়োয়া চিক। ঘোড়া, হাতি প্রভৃতি পশু লৌহ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকে। সেরূপ নারীরা স্বশৃঙ্খলে কন্ঠ শোভিত করে মনে করে, হার পরা নোলক সধবার নিদর্শন। বেগম রোকেয়ার মতে, ‘আপনাদের ঐ বহুমূল্য অলঙ্কারগুলি দাসত্বের নিদর্শন ব্যতীত আর কি হইতে পারে? আবার মজা দেখুন যাঁহার শরীরে দাসত্বের নিদর্শন যত অধিক, তিনি সমাজে ততোধিক মান্যা গন্যা।”
এ অলঙ্কারের জন্য মেয়েদের কত আগ্রহ। আর মনে হয় জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য সব নির্ভর করে এ অলঙ্কারের ওপর। তিনি বলেন, ‘মাদক দ্রব্য যতই সর্বনাশ হইক না কেন, মাতাল তাহা ছাড়িতে চাহেনা। সেইরূপ আমরা অঙ্গে দাসত্বের নিদর্শন ধারণ করিয়াও আপন গৌরবান্বিতা মনে করি-গর্বে স্ফীতা হই।”
বেগম রোকেয়া এমন একটা সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেখানে পুরুষেরা যত ইচ্ছা অধ্যয়ন করতে পারতো- মেয়েদের ক্ষেত্রে সেটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অশিক্ষিত স্ত্রীকে শত দোষ সমাজ অম্লান বদনে ক্ষমা করিয়া থাকে, কি সামান্য শিক্ষাপ্রাপ্তা মহিলা দোষ না করিলেও সমাজ কোন কল্পিত দোষ শতগুন বাড়াইয়া সে বেচারীর ঐ শিক্ষার ঘাড়ে চাপাইয়া দেয় এবং শতকণ্ঠে সমস্বরে বলিয়া থাকে স্ত্রী শিক্ষাকে নমস্কার”। অনেকের মতে শিক্ষা কেবল চাকরি লাভের পথ। মহিলাদের চাকরি গ্রহণ অসম্ভব। সুতরাং এই সকল লোকের চক্ষে স্ত্রীশিক্ষা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক।
‘শিক্ষা কোন সম্প্রদায় বা জাতি বিশেষের ‘অন্ধ-অনুকরণ’ নয়। ঈশ্বর যে স্বাভাবিক জ্ঞান ব ক্ষমতা দিয়েছেন, সেই ক্ষমতাকে অনুশীলন দ্বারা বৃদ্ধি করাই শিক্ষা।”
স্রষ্টা আমাদের সবাইকে হাত, পা, চোখ, কান,মন ও চিন্তা শক্তি দিয়েছেন। অনুশীলন দ্বারা আমরা যদি এগুলোর সদ্ব্যবহার করি, তাহলেই হবে প্রকৃত শিক্ষা। আমরা যদি আমাদের নিজেদের সাহায্য না করি তাহলে কেউ আমাদের সাহায্য করতে পারবে না। ঈশ্বর তাকেই সাহায্য করেন যে নিজে নিজেকে সাহায্য করেন। ‘Gok helps those who help themselves’ তাই আমরা যদি আমাদের কথা না ভাবি, তাহলে অন্য কেউ আমাদের জন্য ভাববে না। আর যদি ভাবেও তাহলে আমাদের ষোল আনা উপকার হবে না।
স্ত্রী জাতি জন্ম থেকেই অবরুদ্ধ থাকায় তাদের বুদ্ধি বৃত্তির বিকাশ হয় নি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে। তাদের অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই স্বাধীনতা হারিয়েছে। তাই বেগম রোকেয়া বলেছেন-
“অতএব জাগ, জাগ গো ভাগিনি।”
জেগে ওঠা অত সহজ নয়? সমাজ মহা গোলযোগ বাধাবে। কিন্তু এ সমাজের মঙ্গলের জন্যই নারী জাতিকে জেগে উঠতে হবে। সব অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচার মোকাবেলা করতে হবে। পারস্য সমাজে যে নারী জাগরণ হয়েছিল তখন ধবল কেশ বুদ্ধিমানগণ বলেছিলেন, পৃথিবীর ধ্বংসকাল উপস্থিত হইল।”
পৃথিবী কিন্তু চলমান-এখনও পৃথিবী ধ্বংস হয়নি। সুতরাং, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে হবে। নারীকেও পুরুষের সমকক্ষ হয়ে গড়ে উঠতে হবে-তবেই বিশ্বের কল্যাণ সাধিত হবে। এজন্য প্রয়োজন নারী শিক্ষা এবং স্বাধীন জীবিকা নির্বাহ করা। পুরুষ যদি পারে, তাহলে নারী কেন পারবে না? সবাইকে জজ, ব্যারিস্টার হতে হবে এমন কথা নেই। যে যে কাজ করতে পারে সে সেই কাজ করবে- তাতে সমাজ এগিয়ে যাবে। যদি নারীরা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চা করে তাহলে কেন তারা পুরুষের সমকক্ষ হতে পারবে না? সমাজে কন্যাকে দায় মনে করা হয়। তারা কেন দায় হবে? তাদের সুশিক্ষিত করে সমাজে ছেড়ে দেওয়া হোক ঠিকই তারা উপার্জন করে অন্তত, নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে পারবে।
কেউ যদি মেয়েদের হীনবল, কমবুদ্ধির মনে করে তাহলে সে দোষ মেয়েদের নয়। কারণ সংসারে সমাজে তাদের ছেলেদের সমান সুযোগ দেওয়া হয়নি কিংবা হয় না। চর্চার অভাবে মেয়েরা একটু দুর্বল। কিন্তু সুযোগ পেলে তারাও যে তাদের যোগ্যতার স্বীকৃতি পেতে পারে-একথা এখন সর্বজন বিদিত।
তর্কের খাতিরে তর্ক করা নয়- একথা সত্যি কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রকে যদি উন্নতি করতে হয় তাহলে নারী-পুরুষের সহাবস্থান জরুরি। কোনো মানুষের দুই পা যদি একত্রে বেঁধে দেওয়া হয়, তাহলে সে কষ্ট করেও বেশি দূর যেতে পারবে না। এজন্য দরকার তার দু’টো পায়েরই সদ্ব্যবহার করা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের উদ্দেশ্য সংসার, সমাজ তথা রাষ্ট্রের কল্যাণ নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে নারী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে পুরুষের পাশাপাশি। নারী-পুরুষের প্রতিযোগী নয়- সহযোগী, এ মত সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সুযোগ পেলে নারীরাও তাঁদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন। বেগম রোকেয়ার ভাষ্য অনুযায়ী
“আমরা অকর্ম্মণ্য পুতুল জীবন বহন করিবার জন্য সৃষ্ট হই নাই।”
আমরা নারী-পুরুষ পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশ ও দশের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবো। কারো দয়ার দানে নয়, নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখবো আমরা বিশ্ব দরকারে।