নাসিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় নিহত ৬ জনের বাড়ি দিনাজপুরে

আপডেট: এপ্রিল ৩, ২০১৭, ১২:৩১ পূর্বাহ্ণ

দিনাজপুর প্রতিনিধি


মৌলভীবাজারের নাসিরপুরের জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জনের বাড়ি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে নিহতদের বিবরণ দেখে ও ঘটনার আগের দিন মোবাইলে কথা বলার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। তারা নিহতদের মরদেহ নেবেন না বলেও পুলিশকে জানিয়েছেন।
নিহতরা হলেন- লোকমান আলী (৪৫) ও তার স্ত্রী শিরিনা আক্তার (৩৫), সন্তান আমেনা খাতুন (১২), সুমাইয়া আক্তার (৯), ফাতেমা (৫) ও মরিয়ম (সাড়ে ৩ বছর)। তাদের ৬ মাস বয়সী খাদিজা নামে এক শিশুকন্যাও রয়েছে। তবে সে মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে তা জানাতে পারেনি কেউই।
পুলিশ বলছে, তারা আগে থেকেই জানতো লোকমান আলী জঙ্গি কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত। তাকে ধরতে কয়েকবার অভিযানও চালানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে ঘোড়াঘাট উপজেলার কলাবাড়ী গ্রামের আবু বকর সিদ্দিকের মেয়ে শিরিনা আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় একই উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে লোকমান আলীর। শিরিনা আক্তার স্থানীয় কলাবাড়ী দাখিল মাদরাসায় ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তারা চার বোন। বিয়ের পরে তাদের দুই সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
গত ৫/৬ বছর আগে লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও ইসলামের অপব্যাখার বিষয়টি জানতে পারে লোকমান আলীর শ্বশুর আবু বকর সিদ্দিক। তাকে ফিরিয়ে আনতে চাপও দেন। কিন্তু বিষয়টি না মানায় মেয়ে ও নাতনীদের বাড়িতে নিয়ে আসেন তিনি।পরে লোকমান জঙ্গি কর্মকা-ে সংশ্লিষ্ট হবে না জানিয়ে  স্ত্রী ও সন্তানদেরকে বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর তাদের নিয়ে লোকমান আলী ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে কাজের কথা বলে চলে যান।
শিরিনা আক্তারের বাবা আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ২৯ মার্চ রাত ১টার দিকে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। কল রিসিভ করার পর আমার বড় নাতনি মোছা. আমেনা খাতুনের কণ্ঠ ভেসে আসে, যাকে লোকমান আলী ২ মাস আগে বগুড়ায় বিয়ে দিয়েছে। ফোনে নাতনী দু-একটি কথা বলার পর মেয়ে শিরিনা আক্তারের হাতে দেয়। শিরিনা আমার সঙ্গে প্রায় ৩০ মিনিট কথা বলে।
এ সময় শিরিনা বলে- আপনারা আমাদের ক্ষমা করবেন। আমাদের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না। তখন আমি বলি, কয়েকদিন আগেই তোমার নামে আমি ১ বিঘা জমি দিয়েছি। তুমি কোথায় আছো, একটু ঠিকানা বল- আমি সেখান থেকেই নিয়ে আসবো। মেয়ে জানিয়েছিল যাওয়ার কোনো উপায় নেই।
তিনি আরও বলেন,  আমার সঙ্গে দীর্ঘ ১০/১২ বছর থেকে যোগাযোগ নেই, আমি অসুস্থ বুড়ো মানুষ আমার ছেলে-মেয়ে কেউ আমার পাশে নেই। আমি মরদেহ নিতে পারব না।
শিরিনা আক্তারের মা জোবাইদা খাতুন জানান, গত প্রায় ৪ বছর ধরে তাদের সঙ্গে মেয়ে-জামাইসহ নাতনীদের যোগাযোগ নেই। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে মেয়েকে বাধা দিয়েছে জামাই। জামাইয়ের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কারণে মেয়ে ও নাতনীদেরকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
এদিকে, একই উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে লোকমান আলীসহ স্ত্রী-সন্তানদের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন লোকমানের বাবা নুরুল ইসলাম। লোকমান আলীরা ৩ ভাই। এক ভাই প্রতিবন্ধী, এক ভাই ঢাকায় গার্মেন্টেসে থাকে আর লোকমান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িত ছিল। সে কৃষ্ণরাম এলাকার দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পাশ করেছে।
লোকমানের বোন নুরজাহান জানান, লোকমানের মরদেহ নিয়ে আসা হবে কি না সেটা তারা জানেন না। কারণ বাবা অসুস্থ আর ভাইদের মধ্যে  একজন প্রতিবন্ধী এবং একজন ঢাকায় আছে।
আরেক বোন নুর বানু জানান, মরদেহ নিয়ে আসলে কোনো সমস্যায় পড়বেন কি না এই চিন্তায় আছেন। লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তারা ৫/৬ বছর আগেই জানেন। এরপর থেকেই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। বণ্টন করে দেয়া হয়েছে তার ভাগের জমি ও সম্পত্তি। এখন তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
ঘোড়াঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ ((ওসি) ইসরাইল হোসেন জানান, আগে থেকেই লোকমানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুলিশ জানতো । তার বিরুদ্ধে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী মামলাও রয়েছে। ধরার জন্য অভিযানও চালিয়েছে পুলিশ। জঙ্গি লোকমানের বাবা ও শ্বশুর আবুবক্কর ছিদ্দিক মরদেহ নেবেন না বলে  জানিয়েছেন।
গত ৩০ মার্চ মৌলভীবাজার সদর উপজেলার নাসিরপুর গ্রামে জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন হিট ব্যাক’ অভিযান শেষে ওই আস্তানা থেকে চার শিশুসহ  সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করে  আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।  সুইসাইডাল ভেস্টের বিস্ফোরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় পুলিশ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ