নিউজিল্যান্ডের ‘অভিশাপ’ সুপার ওভার

আপডেট: জানুয়ারি ৩০, ২০২০, ১২:৫৯ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


আরেকবার সুপার ওভারে হারলো নিউজিল্যান্ড-সংগৃহীত

পিনপতন নীরবতায় চোখ বেয়ে অঝরে নামেনি জলধারা। কালো জার্সি পরা মানুষগুলোর চোখের কোণের জলবিন্দু টিভি ক্যামেরার জুমে জ্বলজ্বল করতে দেখা গিয়েছিল শুধু। লর্ডসের গ্যালারির একাংশে সেদিন ছিল শুধু বোবা কান্না। বুকের ভেতরের দলা পাকানো যন্ত্রণা ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছিল, বাইরে থেকে তা দেখার সাধ্যি কোথায়?
কিন্তু অনুভব করা যাচ্ছিল স্পষ্ট। স্বপ্নের বিশ্বকাপ হাতছোঁয়া দূরত্ব থেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়ায় তখন নিউজিল্যান্ডের ড্রেসিংরুম শোকে পাথর। মুহূর্তের বাতাসে লন্ডন থেকে তাসমান পাড়ের দ্বীপ দেশটিতে ছড়িয়ে পড়েছে হাহাকার হয়ে। অভিশপ্ত সুপার ওভার ২২ গজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটা নিমেষে হারিয়ে দিল চোখের সামনে থেকে। শেল হয়ে বেঁধা লর্ডসের ফাইনাল এখনও দুঃস্বপ্ন হয়ে হানা দেয় কিউইদের ঘুমের মাঝে। ভুলতে চাইলেও তো ভোলা যাচ্ছে না, ভুলতে দিচ্ছে না সেই সুপার ওভার। ইংল্যান্ডের কাছে সুপার ওভারে বিশ্বকাপ হারানো নিউজিল্যান্ড আরেকবার নির্মমতার শিকার ৬ বলের লটারিতে!
এবার ‘ঘাতক’ ভারত। গতকাল (বুধবার) হ্যামিল্টনে সুপার ওভারে ভারতের কাছে শুধু ম্যাচই তো হারেনি, পাঁচ ম্যাচের সিরিজটাই খুইয়ে বসেছে। বাকি দুটি ম্যাচ জিতলেও ব্যবধান থেকে যাবে ৩-২। অতীতের দায় শোধের উপলক্ষ তৈরি হলেও আরেকবার সঙ্গী হয়েছে যন্ত্রণা। তাজা হয়ে উঠেছে বিশ্বকাপ ফাইনালের দুঃসহ স্মৃতি। সুপার ওভার কিউইদের জন্য হয়ে উঠেছে অভিশাপ। তা নয়তো কী! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি সুপার ওভার খেলা দল তারা। টি-টোয়েন্টিতে ছয়বার আর লর্ডসের বিশ্বকাপ ফাইনাল মিলিয়ে সাতবার ফল নির্ধারণী ১ ওভারের লড়াইয়ে নেমেছে নিউজিল্যান্ড। যেখানে সাফল্য মাত্র একবার!
ক্রিকেটে সুপার ওভার প্রথা চালুর পর সেটির প্রথম পরীক্ষার সামনে পড়ে নিউজিল্যান্ডই, সঙ্গে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। একযুগ আগে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অকল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি দিয়ে প্রথমবার সুপার ওভার দেখে ক্রিকেট বিশ্ব। ক্রিস গেইলের তাণ্ডবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সহজেই জিতে নিয়েছিল ১ ওভারের লড়াই। সুপার ওভারের সেই ধাক্কা অবশ্য কাটিয়ে উঠেছিল কিউইরা বছর দুয়েক পর, যখন ক্রাইস্টচার্চের টি-টোয়েন্টিতে তাসমান সাগরের প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৯ রান করেও জিতেছিল তারা। সেই শেষ। এরপর ২০১২ সালে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে শুরু ‘অভিশপ্ত’ সুপার ওভারের যাত্রা, যার সর্বশেষ সংস্করণ ভারতের বিপক্ষে হ্যামিল্টনের ম্যাচ।
অথচ ম্যাচটি সুপার ওভার পর্যন্ত যাওয়ারই কথা ছিল না। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের অসাধারণ ইনিংসে ২০ ওভারেই নিষ্পত্তি হয়ে যাচ্ছিল ফল। কিন্তু ৩ বল আগে ৪৮ বলে ৯৫ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে উইলিয়ামসন প্যাভিলিয়নে ফিরলে ম্যাচে জাগে টান টান উত্তেজনা। শেষ ৩ বলে জিততে দরকার তখন মাত্র ২ রান। মোহাম্মদ শামির দুর্দান্ত বোলিংয়ে নিশ্চিত হারতে যাওয়া ম্যাচটি ‘টাই’য়ে টেনে নেয় ভারত।
এরপর সেই সুপার ওভার। যেখানে নিউজিল্যান্ড হতাশায় ডুবেছে আরেকবার। হ্যামিল্টনের ম্যাচটি আরও ভালোভাবে জানান দিয়ে গেল ‘সুপার ওভার কিউইদের জন্য নয়’— অন্য কেউ নন, উইলিয়ামসন নিজেই বলেছেন কথাটা। ভবিষ্যতের জন্য ‘চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েও কিউই অধিনায়ক পুড়ছেন লজ্জায়, ‘সত্যি বলতে আমরা আগেই জিততে চেয়েছিলাম, সুপার ওভারে যেতেই চাইনি। কিন্তু সেটি করতে না পারাটা আমাদের জন্য ভীষণ লজ্জার।’
তা তো বটেই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত হওয়া ১৪টি সুপার ওভার ম্যাচের ৭টিতেই জুড়ে নিউজিল্যান্ডের নাম। যার সবশেষ পাঁচটিতে সঙ্গী হার। পুরোনো ক্ষতে নতুন করে আঘাত লেগেই চলেছে ‘ব্ল্যাক ক্যাপদের’। যেখানে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটে আছে ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে তো বটেই, ওয়ানডে ক্রিকেটই প্রথমবার সুপার ওভার দেখে লর্ডসের ফাইনাল দিয়ে।
মার্টিন গাপটিলের দৌড় ও জস বাটলারের স্টাম্প ভেঙে দেওয়ার দৃশ্য ক্রিকেট ইতিহাসে অমর ছবি হয়ে থাকবে। ওই রানআউটেই প্রথমবার বিশ্ব জয়ের উল্লাসে মাতে ইংল্যান্ড। ইংলিশদের সমান ১৫ রান করেও নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ হাতছাড়া হয় বাউন্ডারির হিসাবে পিছিয়ে থাকায়। কী বলবেন কিউইরা? ভারতের কাছে হারের পর উত্তরটা কিন্তু দিয়ে দিয়েছেন উইলিয়ামসন— ‘সুপার ওভার কিউইদের জন্য নয়’!

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ