নিখাদ কাব্যের অনন্য কারিগর কবি আমিনুল ইসলাম

আপডেট: নভেম্বর ১২, ২০২১, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

এস এম তিতুমীর:


মনোজাগতিক উপলব্ধির অপরূপ বয়ান, অন্তরের আরাধ্য চেতনা আর কাব্যের চিত্রময়তা যে মানসপটে বর্ণিল, যার বর্ণ বিভায় উদ্ভাসিত আমাদের মনের কথা, তার প্রতিটি পঙ্ক্তি আলোকিত করে কাব্যসাহিত্য। কাব্যের রঙ বিচিত্র। যা দৃষ্টিগোচর হয় আবার যা হয় না তার বর্ণনা কাব্যে ফুটে। কবি তার স্বপ্ন চেতানায় যে ছবি আঁকেন তার সাথে যা চারপাশে দেখেন তার প্রতীকিয়তা কবিকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে। কবির মানসিক প্রেক্ষাপট আছে আবার আছে অদেখা কাল্পনিক জগৎ। যার সাথে মিশে আছে মিলন-বিরহ প্রেম-ভালোবাসা দ্রোহ দ্বন্দ্ব সংঘাত সংগ্রাম প্রতিবাদ। যার কোননা কোন অধ্যায় জুড়ে আছে মানুষ আর মানুষের চেতনা। একজন কবি যা দেখেন তারই কাব্যিক রূপ দিতে পারেন। সে-ই রূপ কতটা আকর্ষণীয় বা অন্যকে কতটা আকৃষ্ট করতে পারবে তা নির্ভর করে সেই রচনা শৈলীর নিপুণতার ওপর। যে কাব্য মানুষের কথা বলে, বলে অন্তরের কথা, যা পড়লে মনে হয় এ-তো আমার নিজের কথা। সেই কাব্য রচনা করেন কবি। কবির কাব্যিক সত্তা কবিকে আলাদা করে অন্যদের থেকে। নব্বইয়ের দশকে বাংলা কাব্যাঙ্গণে প্রকৃতি-প্রাণরসের উদ্ভাসন নিয়ে যিনি হাজির হয়েছেন তিনি কবি আমিনুল ইসলাম। একজন কবি যেমন সমাজসচেতন তেমনি প্রকৃতি সচেতন। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যখন কপোতাক্ষ নদকে ভুলতে পারেননি, দেখেছেন দণগ্ধ ¯্রােতরূপে তে¤িœ কবি আমিনুল ইসলাম মহানন্দা নদীকে ভুলকে পারেননি। দেখেছেন প্রাণরস রূপে, লিখেছেন- ‘তুমি কি সেই আর্শীবাদ গাঢ় প্রাণরসে? / সর্পিলী যদিও শরীর, অমৃত আনন্দ / বাতাসে বাজালে বাঁশি তরঙ্গ নূপুর হয়ে অন্তর প্রকাশে!’ এ প্রকাশ কবিকে তার উৎসে নিয়ে এসেছে। অথবা স্বপ্নের হালখাতায় তুলে দেন-‘ তোমার মুখখানি আর নতুন চরের উপমা নয়, তোমার নামটি এখন ঘুমহীন রাতের হাতে নিরাশার তসবিহদানা।’এমন ন্যারেটিভ ফিচার কবির সৃষ্টিকে উজ্জ্বল করেছে। দিয়েছে আর্ট-ইমাজিন স্বাদ। আরো চমকপ্রদ বহু পঙ্ক্তি তিনি সৃষ্টি করেছেন । কবি আমিনুল ইসলাম একজন শব্দসচেতন, সমাজসচেতন এবং পরিমিতিবোধের কবি। তিনি ১৯৬৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর চাঁপইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার টিকলীচর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নব্বই দশকে কবি হিসেবে তিনি কাব্যজগতে আসেন। কবিতা ছড়া প্রবন্ধ ও সংগীত বিষয়ক নিবন্ধ তাঁর রচনার বিষয়। তিনি বর্তমান সময়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল আলোচিত কবি ও প্রাবন্ধিক। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘তন্ত্র থেকে দূরে’ ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’ ‘শেষ হেমন্তের জোছনা’ ‘কুয়াশার বর্ণমালা’ ‘পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি’ ‘স্বপ্নের হালখাতা’ ‘প্রেমসমগ্র’ ‘জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ার’ ‘শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ’ কবিতা সমগ্র (২০১৩), জোছনার রাত বেদনার বেহালা (২০১৪), আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট (২০১৫) আর ছড়া গ্রন্থগুলো হলো দাদুর বাড়ী(২০০৮) ফাগুন এলো শহরে (২০১২) রেলের গাড়ি লিচুর দেশ (২০১৫) প্রবন্ধগ্রন্থ-বিশ^ায়ন বাংলা কবিতা ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১০) প্রভৃতি। তিনি অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন, রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ সাংগঠনিক সম্মাননা (২০০৪) বগুড়া লেখকচক্র স্বীকৃতি পুরস্কার (২০১০) শিশু কবি রকি সাহিত্য পুরস্কার (২০১১) নজরুল সংগীত শিল্পী পরিষদ সম্মাননা (২০১৩) গাঙচিল সাহিত্য পুরস্কার (২০১৫) এবং মানুষ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৭) দাগ সাহিত্য পুরস্কার (২০১৮)
আর এ বছর কবি পেলেন কবিকুঞ্জ পদক ২০২১। বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা অনন্য কবি-প্রতিভা কবি আমিনুল ইসলাম। কবি কাব্যসাহিত্যে মননে ও প্রকরণে, চিত্রকল্প ও রূপকে, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা আর বাক্যবিন্যাস ও নান্দনিক অভিব্যক্তিতে তুলে এনেছেন নিজস্ব স্বতন্ত্রতা। প্রেমের কবিতাতেও তিনি হয়েছেন আনুপম আত্মিক, ঘটিয়েছেন ঐতিহ্যলগ্নতার চমৎকার সন্নিবেশ। তাতে প্রেমের কবিতা হয়েছে গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী। আমিনুল ইসলামের ‘তুমি হলে
সন্ধ্যাবতী সকলি কবুল’ কবিতাটি বিষয়বৈভব ও শব্দচয়নে পূর্বসূরীদের দৃষ্টান্তে শিল্পোত্তীর্ণ। ‘স্বপ্ন দেখি- দ্বিধার শহর থেকে ফিরে আসছো তুমি আর, তোমার জন্য কফির মগ নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি দুয়ারে।’ স্বপ্ন দেখার এই পথ নিরন্তর, অনন্ত। কবি আমিনুল ইসলাম স্বপ্ন দেখন, দেখান। নিজস্ব অভিজ্ঞার নিগূঢ় প্রতিক্রিয়া যার পরতে পরতে লেগে আছে মন্দ্রিত মননের কারিগরি। যা কাব্য-যাত্রায় কবিতার অবয়বে একে একে উন্মোচন করেন কবি আমিনুল ইসলাম। জীবনের জীবন্ত ছবি তিনি এঁকেছেন কবিতায়, তাতে যন্ত্রণাদগ্ধ মানুষের সম্যক আর্তি আর ভিন্ন আড়ালের অনুরক্ত আয়োজনকে কবি আয়ত্ত করেছেন নিজের মত। মাটি-মানুষ-প্রেম ও প্রকৃতির আভিজ্ঞান কবিতার মূল সুর হলেও ‘আত্ম কথা’ ও ‘সমকালীন জীবন চিত্র’ সবগুলো আপন আধার পূর্ণ করে চলেছে। কবি তার মূর্ত চেতনার অনন্ত আনন্দকে হৃদয়ে ধরে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এ চলার আনন্দটুকু মিশে থাক কাাব্যর পথে পথে। শুদ্ধ সান্নিধ্য, সরল সমারহ, নিখাদ দর্শন যখন বিমূর্ততার বৃত্তে একাকার হয়ে আলিঙ্গন করে ধ্রুবতার মহাকাশ তখন কবিতার পরম পরশ কবিকে আপন করে নেয়। কবি থাকে কাব্য ভুবনে। কবি আমিনুল ইসলামের কাব্য নিখাদ, নির্মেদ ও পরিশীলিত। মন ছুঁয়ে যাবার অপরিমেয় রসদ-রস নির্ভাবনায় ঝরে পড়ে কাব্য পাতায়। কবি তাঁকে ভালোবাসেন, ভালোবাসান, আমাদের একজন হয়ে। কবির কাব্য যাত্রা বিরতিহীন। যার অনন্ত আলোয় চোখ মেলবে আগামী, আগামী থেকে আগামী।