নিজ দেশেই পরবাসী শহীদ বুদ্ধিজীবী মীর আব্দুল কাইয়ূম!

আপডেট: জানুয়ারি ১৯, ২০২০, ১২:৪২ পূর্বাহ্ণ

রাবি প্রতিবেদক


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) মনোবিজ্ঞান বিভাগের দুই দিনব্যাপী প্রথম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে বিভাগের ও দেশের প্রতি অবদানের জন্য দুইজনকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। কিন্তু এই সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়নি ওই বিভাগের শিক্ষক বুদ্ধিজীবী শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুমকে। এ যেন নিজ দেশেই পরবাসী হয়েছেন তিনি।
সম্মাননা স্মারকে এই বুদ্ধিজীবীকে কেন রাখা হয়নি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এবং উদযাপন কমিটির সদস্যবৃন্দরা।
আবার অনেকেই বিভাগীয় সভাপতিকে বিএনপি জামায়াতের কর্ণধার আখ্যা দিয়ে তিনি ইচ্ছে করে তাঁর নাম বাদ দিয়েছেন বলে ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ূম। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক অবাঙালি অনুচর এসে ক্যাপ্টেন তাঁকে যেতে বলেছেন বলে ডেকে নিয়ে যায়। সেই রাতেই পাকিস্তানী সেনারা একটি গুলি খরচ না করেই পদ্মার পাড়ে আরও কয়েকজনের সঙ্গে নৃশংসভাবে তাঁকে জীবন্ত কবর দেয়। বিশ^বিদ্যালয়ের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক ছিলেন মীর আবদুল কাইয়ূম। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে তাঁর ছিল প্রত্যক্ষ ভূমিকা। মুক্তবুদ্ধি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি গোপনে সাহায্য করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ওষুধ সরবরাহ করাসহ অর্থের যোগান দিতেও সাহায্য করতেন।
দেশের জন্য এতকিছু করার পরেও বিভাগের পক্ষ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী মীর আব্দুল কাইয়ূমকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়নি।
মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অধ্যাপক মোহাম্মদ রওশন আলী এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিভাগের সভাপতি ও প্রথম পুনর্মিলনী উদযাপন কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ড. এনামুল হক।
বিভাগের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের অনেকেই সম্মাননা স্বারক কেন মীর আব্দুল কাইয়ুমকে দেয়া হয়নি এ প্রশ্ন তুলে তারা প্রথম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান বর্জন করে অনুষ্ঠানে আসেননি।
তবে এ বিষয়ে বিভাগের সভাপতি উদযাপন কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক ড. এনামুল হক বলেন, ‘পুনর্মিলনী উদযাপন কমিটি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটিই বাস্তবায়িত হয়েছে। এখানে আমার নিজস্ব কোন মতামতের ভিত্তিতে হয়নি।’
তবে পুনর্মিলনী উদযাপন কমিটির সদস্য ড. নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘একাডেমিক কমিটিতে সম্মাননা স্বারক কাদের দেয়া হবে এটা নিয়ে কোন আলোচনা হয়নি। তবে দুজন ব্যক্তিকে সম্মাননা দেয় হবে এ বিষয়ে সিনিয়র শিক্ষকরা বলেছিলেন।’
তিনি দু:খ প্রকাশ করে আরো বলেন, যেহেতু এর আগে শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম স্যারকে বিভাগ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন সম্মাননা দেয়া হয়নি। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগের প্রথম পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে সম্মানানা দেয়া অবশ্যই উচিৎ ছিল।
এ বিষয়ে প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনকারী একজন শিক্ষক সুলতান-উল ইসলাম বলেন, ‘শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম অবশ্যই স্বীকৃতি বা সম্মাননা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বিভাগ এবং উদযাপন কমিটি কিসের ভিত্তিতে তাকে বাদ দিয়েছে সেটা আমি জানি না। তবে ওনাকে সম্মানিত করতে পারলে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানিত হতো বলে আমি মনে করি।’
মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুমের মেয়ে মাহবুবা কানিজ কেয়া বলেন, আমি উদযাপন কমিটির সদস্য নয় এবং জানিও না এটা কারা করেছেন। তবে আমি এ উদযাপন কমিটিকে ধিক্কার জানাই। আমার বাবার যে অবদান সেটি বুদ্ধিজীবীর পরিবার হিসাবে আমরা গর্ববোধ করি। এখন তাকে যারা অমর্যাদা করেছেন আমি মনে করি তাদের এটা মানসিক দৈন্যতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন যে শহীদকে নিয়ে আমরা সবসময় গর্ববোধ করি তাদের মধ্যে অন্যতম শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম স্যার। এখন আমরা যদি তাদের সম্মান না করতে পারি। তাহলে আমাদের চরম ব্যার্থতা এবং চরম লজ্জার বিষয়।’
এ বিষয়ে রাকসু আন্দোলন মঞ্চের আহবায়ক আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, ‘স্যারের সাথে যেটা হয়েছে সেটা কখনও মেনে নেয়ার মত নয়। হয়ত একাডেমিক দায়িত্বে বা উদযাপন কমিটিতে যারা ছিল তাদের একটা আদর্শিক দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। তাই বলে স্যারের প্রতি এমন অবমাননা করা ঠিক হয়নি।’
পুনর্মিলীতে আসা বিভাগের এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘গতকাল অনুষ্ঠানের প্রথম দিন যখন সম্মাননা স্বারক প্রদানে শহীদ কাইয়ুম স্যারের নাম উল্লেখ করা হলো না। তখন আমি খুব ব্যথিত হয়েছি। তখন আমি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষককে বলেছি তখন তারা আমাকে বলেছে এটা আমরাও জানতাম না। এগুলো সভাপতি নিজেই করেছে।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ- উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম বাংলাদেশ এবং আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গর্ব। এখন বিভাগ কিসের ভিত্তিতে সম্মাননা প্রদান করেছে আমার জানা নেই। সেজন্য আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।’
প্রসঙ্গত, শহীদ মীর আব্দুল কাইয়ুম ১৯৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫শে নভেম্বর রাজশাহী শহরের বাসা থেকে তাকে তুলে নিয়ে পদ্মার চরে অন্যদের সাথে জীবন্ত কবর দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ