নিজ সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কায় চিকিৎসকরা || প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধে ভোগান্তিতে রোগী-স্বজন

আপডেট: মার্চ ২২, ২০২০, ১২:৪৮ পূর্বাহ্ণ

তারেক মাহমুদ


দেশে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ায় বাতিল করা হয়েছে স্বাস্থ্যখাতের সংশ্লিষ্ট সবার ছুটি। আর নিজেদের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন চিকিৎসকরা। গত আড়াই মাসেও নিশ্চিত করা যায়নি চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা। অন্যদিকে চিকিৎসকদের দাবির প্রেক্ষিতে হাসাপাতালে চিকিৎসা সুরক্ষার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রাজশাহী স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।
এদিকে গতকাল থেকে নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে শষ্কায় থাকায় রাজশাহীতে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করেছেন সিংহভাগ চিকিৎসক। জানা যায়, রাজশাহীর নাম করা প্রাইভেট চিকিৎসা কেন্দ্র পপুলারে মোট চিকিৎসক ৫০ জন কিন্তু গতকাল শনিবার চেম্বারে বসেনি ৩০ জন চিকিৎসক। নগরীর বাকি বে-সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে এমন অবস্থা ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী-স্বজনরা পড়েছেন ভোগান্তিতে।
অন্যদিকে রামেক হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও ওয়ার্ডে চিকিৎসা চললেও নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কায় আছেন চিকিৎসকরা।
গতকাল শনিবার নগরীর লক্ষ¥ীপুর এলাকা ঘরে দেখা যায়, বে-সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগী-স্বজনরা চিকিৎসক না পেয়ে হতাশ হয়ে চলে যাচ্ছেন। কুষ্টিয়া থেকে অসুস্থ বাবাকে দেখাতে এসেছিলেন কাজী মোজাফফর। তিনি জানান, আজ চিকিৎসক বসবে না তাই কিছু করার নেই- বাসায় ফিরে যাচ্ছি।
মিজান নামের আরেক রোগীর স্বজন জানান, অসুস্থ খালাকে নিয়ে এসে জানলাম আজ চিকিৎসক বসবে না। কিছু করার নেইÑ অনেক চেষ্টা করলাম, কোনো উপায় না পেয়ে ফিরে যাচ্ছি।
জানা যায়, রামেক হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে চিকিৎসক নার্স মিলে প্রায় ৩০ জন জনবল থাকে। কিন্তু গতকাল থেকে মাত্র পাঁচটি মাস্ক, কয়েকটি গ্লাভস আর পাতলা কাপড় দেয়া হয়েছে যা চিকিৎসা সেবা দেয়া কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। মাস্কগুলো ওয়ান টাইম ফলে সকলের জন্য নেই সুরক্ষা ব্যবস্থা। আর প্রাইভেট প্র্যাকটিসে প্রচুর লোক সমাগমের ফলে সেখানেও নিরাপত্তা নেই। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়একটুু দূরে দূরে থেকে সকলকে চলাফেরা করতে হবে। কিন্তু হাসপাতালসহ প্রাইভেট প্র্যাকটিসে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটছে। যা কোনোভাবেই নিরাপদ নয় বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
অন্যদিকে সুরক্ষার সকল বিষয় নিশ্চিত হলেই প্র্যাইভেট প্যাকটিসে যাবেন চিকিৎসকরা। আর যারা চেম্বারে রোগী দেখছেন- পরিস্থিতি এমন হলে সকলের মত- তারাও প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ করে দেবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রামেক হাসপাতালের কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক জানান, চিকিৎসকেরা সম্মুখে লড়বেন এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে। তাদের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নেই ন্যূনতম কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা। বহুল আলোচিত হাত ধোয়ার স্যানিটাইজার আর মাস্ক দিয়েই চলছে এখনো এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ার প্রস্তুতি। ফলে সাধারণ সর্দি কাশি জ্বর নিয়ে হাসপাতালে গেলে আতঙ্কিত হচ্ছে খোদ চিকিৎসকরাই।
রামেক হাসপাতেলের লিভার বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা.মো. হারুন আর-রশীদ বলেন, আমরা যেহেতু সার্বক্ষণিক রোগীদের সাথে থাকছি তাই সব থেকে বেশি ঝুঁকিতে তো আছি আমরাই। তবু জীবন বাজি রেখে সেবা দিয়ে যাচ্ছে হাসপাতালের চিকিৎসকরা।
মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মাহাবুবুর রহমান বাদশা জানান, সব জায়গাতেই গণজামায়েত নিষিদ্ধ। কিন্তু হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও বড় বড় বে-সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে হাজার হাজার মানুষের ঢল। এই বিষয়ে কিছু নিয়ম মেনে চিকিৎসা দিতে হবে। চিকিৎসারত রোগী আর সাথে একজন থাকলে হয়! কিন্তু বেশি মানুষ এখানে আসলেই সমস্যা। একজন চিকিৎসক যদি করোনায় আক্রান্ত হয় তবে প্রতিদিন শত শত মানুষ আক্রান্ত হবে এটা কিন্তু ভাবতে হবে। পরিস্থিতি এখানো বড় নয়। কিন্তু বড় যেন না হয় তার উদ্যোগ এখনই নিতে হবে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী জানান, সরকারিভাবে চিকিৎসকদের সকল সুরক্ষায় এখনো তেমন করে নিশ্চিত হওয়া যায় নি। শুধু মাস্ক, গ্লাভস আর সাবানের মাঝেই সুরক্ষায় আছে চিকিৎসকরা। তিনি জানান, ঢাকাতে কয়েকজন চিকিৎসক এখন ‘হোম কোয়ারেন্টাইন’-এ আছেÑ যদি চিকিৎসকরা করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে রোগীদের চিকিৎসা দিবে কে? এমনিতেই চিকিৎসক সংকট! রোগীর সাথে যদি চিকিৎসকরা আক্রান্ত হয় তবে সমস্যা আরো প্রকট হবে। চিকিৎসকরা যদি রোগী না দেখে তবে তাঁরা কোথায় যাবে!
এদিকে রাজশাহী বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. গোপেন্দ্রনাথ আচার্য্য জানান, আমি রামেক হাসপাতালে পরিচালক ও চিকিৎসকদের সাথে কথা বলেছি। সংক্রমণ ব্যাধির জন্য হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিটে ৩০ টি বেড রেডি আছেÑ যার সাথে অরো কিছু বেড যুক্ত করা হবে। প্রয়োজনে আরো বেড লাগলে ব্যবস্থা করা হবে। আমাদের কিটসের ব্যাপারে কথা হয়েছে। কিটস আনার ব্যাপারে চেষ্টা চলছে। প্যাথোলজি বিভাগের সাথেও কথা হয়েছে, তারাও বিষয়টি দেখছে। আর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও পবার হেলথ কমপ্লেকসসহ বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও স্টেডিয়াম প্রস্তুত আছে।
বে-সরকারি স্বাস্থ্য কেদ্রেগুলোতেও আমাদের কথা হয়েছে। তারা আমাদের সাথে সহোযোগিতা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে। বর্তমানে ‘হোম কোয়ারেন্টইনে রাজশাহী বিভাগে আছে ২২৫ জন। জেলাতে আছে ২২ জন। এ পর্যন্ত ১ হাজার সাতশো ২৪ জনকে ‘হোম কোয়ারেন্টইনে রাখা হয়েছে। আজ পর্যন্ত ৮০ জনকে ১৪ দিন করে রাখার পরে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ