নিরস্ত্র দুই মুক্তিযোদ্ধা

আপডেট: আগস্ট ২৬, ২০১৭, ১:২৮ পূর্বাহ্ণ

এস.এম.আব্দুর রউফ


তোমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পটভূমি নিয়ে গবেষণা কর-বুঝবে ভাল। তোমরা ত’ জান, দীর্ঘ ৯ মাস আমাদের দেশে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য চলে মুক্তিযুদ্ধ। আর এ ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন -এসে পড়ে পবিত্র মাহে রমজান। মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়েই-আত্মশুদ্ধির দিনগুলি এক এক করে নিল বিদায়। এল ধনী দরিদ্রের মিলনের দিন, বাদশা ফকিরের সম অধিকার আদায়ের দিন-পবিত্র ঈদুল ফিতর।
১৯৭১ সাল। মুক্তিযুদ্ধ চলছে। আমি ও আমার বাবা বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েছি। সোজা পথ ধরে শুরু করেছি-পথ হাঁটা। ঈদের দিন। যাব ঈদগাহে। বয়স আমার তখন প্রায় ৭-৮ ছুঁই ছুঁই।
যুদ্ধের সময়। এদিকে ওদিকে গোলাগুলি চলছে। জানি না কখন কী হয়। ভয়ে ভয়ে, বাবা ও আমি পথ চলছি-ঈদগাহের পথে! বাবা ও আমার চোখে তখন-স্বাধীনতার স্বপ্ন জ্বল জ্বল করে জ্বলছিল!
পাঠক! ঈদের দিন। ঈদগাহে যাবার পথে-যে দুর্ঘটনার কবলে আমার বাবা ও আমি পড়েছিলাম, সে গল্পের সত্যটুকু প্রকাশ করতে-আজ বড় কৌতূহল জাগল। তাই লিখতে বসেছি। বাড়ির অনতিদূরেই বড় রাস্তা। পতœীতলা হয়ে চলে গেছে ধামইরহাট। মাঝপথে সামান্য একটু বাঁক। সে বাঁকেই, রাস্তা সংলগ্ন একটি স্থান ‘মরাপুকুর’। যেখানে পাক সেনারা নির্মাণ করেছিল যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য তাদের ক্যাম্প। ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য পতœীতলা থেকে তারাও ট্যাক্সি করে ক’জন যাচ্ছিল ‘মরাপুকুর’ ক্যাম্প অভিমুখে।
আমি ও আমার বাবা যখন রাস্তা অতিক্রম করবো, ঠিক সে মুহূর্তে একটি পাক সেনাদের ট্যাক্সি ধুলা উড়িয়ে, ভোঁ-ভোঁ শব্দে এসে হাজির। গায়ে ছিল আমাদের পাঞ্জাবি ও মাথায় ছিল টুপি। আমাদের দু’জনকে দেখেই তারা ট্যাক্সি দাঁড় করাল। হাত ইশারায় কাছে ডাকল। আমার বাবা ও আমি ভয়ে আঁৎকে উঠলাম। গা শির শির করে উঠল! র্থ র্থ করে লাগলাম কাঁপতে! বুকের ভিতরটা উঠল ধক্ ধক্ করে! কিন্তু কী করবো? উপাই কী? পিছনে দৌঁড়ে পালাতে পারলাম না-যদি গুলি করে আমাদের হত্যা করে ওরা! বলার কেউ নেই। বিচার করবে-এমন বিচারকই বা দেশে তখন কোথায়? দেশে তখন ছিল না নির্ভরযোগ্য কোনো আদালত।
উভয়ে, তাদের নিকটে গেলাম-ভয়ে ভয়ে! উর্দু ভাষায় পাক সেনাদের একজন কী যেন কী আমার বাবাকে বলল। আমি অর্থ বুঝলাম না। বাবাও ভাল বুঝেছেন কিনা জানি না-প্রশ্নও করিনি। এক পর্যায়ে, পাক সেনারা বাবা ও আমাকে তুলে নিল তাদের ট্যাক্সিতে। ভয়ে, মনে মনে আল্লাহ্ ও রসুলের নাম ঘন ঘন লাগলাম জপতে। মৃত্যুভয়ে মুখ থেকে হলো উচ্চারিত : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ্।’
মাটির রাস্তা। ধূলি উড়ছিল। ট্যাক্সি চলতে লাগল দ্রুত। ভয়ে আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠল! না জানি, কখন কী ঘটে! ভয়ংকর শব্দে, রাস্তায়-যদি কোন তেজস্ক্রিয় বোমা বিস্ফোরিত হয়, নির্ঘাত আমরা মারা পড়ব। মুহূর্তেই চলন্ত ট্যাক্সি হয়ে যাবে ছিন্নভিন্ন-টুকরো টুকরো। আমরাও জ্বলে উঠবো, ঝল্সে যাবে আমাদেরও সমস্ত শরীর-বিস্ফোরিত বোমার ওই লেলিহান অগ্নি শিখায়!
দেখতে দেখতে গত হলো বেশ কয়েক মিনিট। ভয়ে ভয়ে পার হয়ে গেলাম পথটুকু! সময় তখন হবে প্রায় সকাল ১০-১১টা। ট্যাক্সি থেকে পাক সেনারা নামলেন। আমরাও নামলাম। ঈদের দিন কিন্তু মনে নেই আনন্দ-নেই এক বিন্দু পরিমাণও খুশির ঢল! পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম পাক সেনাদের ক্যাম্পে। দেখলাম: সারি সারি কামান এখানে ওখানে নানাভাবে তাক্ করে সাজানো। অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে সব পাক সেনারা প্রস্তুত। এত কিছু দেখে, ভয়ে আমার প্রাণ যায় যায়! বাবা আমাকে সাহস দিয়ে বললেন:“ভয় করো না, আল্লাহ্ আমাদের রক্ষা করবেন। দোয়া পড়।”
পাক সেনাদের ট্যাক্সি চড়ে যখন পথ অতিক্রম করছিলাম একবার মনে হলো-এ সুযোগে ব্যাটাদের খতম করি। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল, বড় অসহায়, আমরা এখানে নিরস্ত্র দুই মুক্তিযোদ্ধা। নেই অস্ত্র, নেই গোলাবারুদ-শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করি কী দিয়ে? হয়ত, বাবা ও আমার নিকট ছিল না কোনো কামান কিংবা রাইফেল, যুদ্ধ করার মতো তেমন কোন গোলাবারুদ। কিন্তু বুকভরা তখনও ছিল তেজদীপ্ত সাহস, প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ছিল-অফুরন্ত আশা।
ক্যাম্পে ঈদের নামায আদায়ের জন্য পাক সেনারাও তৈরি হতে লাগল। গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি দিয়ে নামাযের জন্য তারাও সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াল। বাবা ও আমি দাঁড়ালাম তাদের সাথে এক সারিতে। নামায শেষ হলো। মহান আল্লাহ্ পাকের দরবারে-করা হলো মোনাজাত। উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু মন থেকে তখনও, দূর করতে পারিনি দুশ্চিন্তা-মৃত্যুভয়!
একসময়, মনে হতে লাগল, হয়ত পাক সেনারা আমাদের গুলি করে হত্যা করে ফেলবে। গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বেলে-পুড়িয়ে মারবে। কিন্তু না, আল্লাহ্র অশেষ কুদরতে নামায শেষে, কোলাকুলির পর একজন পাক সেনা বাবা ও আমাকে বাড়ি ফেরার দিল নির্দেশ। উভয়ে পাক সেনাদের হাত থেকে রক্ষা পেলাম। আনন্দে ভরে উঠল বাবার বুক! আমারও খুশিতে ছল্ ছল্ করে উঠল চোখ, উছলে উঠল মন! কোনদিকে না তাকিয়ে, কাউকে আর কোন কথা না বলে, দ্রুতপদে-সোজা বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম পথ। হাঁটছি, এক ফাঁকে বাবা বললেন: “হয়ত, একদিন না একদিন কেটে যাবে যুদ্ধের এ ভয়াবহ দুর্দিন, জেগে উঠবে-এ দেশের মানুষের চির কাক্সিক্ষত ঐ-স্বাধীনতা সূর্য।” বাবা ও আমার ভুল করেও, সেদিন-পিছনে তাকিয়ে দেখার হয়নি এতটুকু সাহস। কেননা, পিছন থেকে যদি পাক সৈন্যরা আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে, আর-ঝাঁঝ্রা করে ফেলে বুকের পাঁজর-হৃৎপি-!
মৃত্যুভয়ে, মনে পড়তে লাগল: এখনি, যদি – পৌঁছে যেতাম বাড়ি! আর, নিমিষেই-শেষ হতো পথ!
লেখক: সহকারি অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ধামইরহাট, এম.এম. ডিগ্রি কলেজ, নওগাঁ।