নির্বাচনে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা চান ইসির মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা

আপডেট: জুলাই ২৭, ২০১৭, ১২:৫৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা চেয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। এছাড়া তারা নির্বাচনের সময় প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আনতে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’ (আরপিও) সংশোধনেরও প্রস্তাব করেছেন। একইসঙ্গে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া, আমলাদের অবসরের পর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিধিনিষেধ পাঁচ বছর পুনঃনির্ধারণ, সংসদ নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করা, প্রার্থীদের জামানতের টাকা বাড়ানোসহ গুচ্ছপ্রস্তাব করেছেন এই কর্মকর্তারা। সারাদেশ থেকে আসা এসব প্রস্তাব একীভূত করে ইসি সচিবালয়ের আইন সংস্কার সংক্রান্ত কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আরপিও, নির্বাচন পরিচালনা বিধি, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনবিধি, আচরণবিধিসহ সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি আইন সংস্কারের কাজে হাত দিয়েছে ইসি। এ বিষয়ে মাঠ কর্মকর্তাদের অভিমত নেওয়া হয়েছে। তারা আইন সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন। আরপিওর ৪৪-ই (১)(ডি) এর (ই) উপদফা যুক্ত করে এতে কমিশন বা ক্ষেত্রমতে রিটার্নিং কর্মকর্তা নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে কর্মকর্তাদের সরাসরি সাময়িক অপসারণের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আরপিওর অনুচ্ছেদ-২-এ ইলেক্ট্রোরাল ম্যাজিস্ট্রেট নাম দিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। এ অনুচ্ছেদে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। এর পক্ষে তাদের মত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ যুক্ত হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ইসির নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান হবে। এছাড়া স্বশিক্ষিত-এর নতুন সংজ্ঞায়নের প্রস্তাব করে এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে হলফনামায় সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও সার্টিফিকেটের সত্যায়িত কপি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অনেক প্রার্থী স্বশিক্ষিত উল্লেখ করে কোনও সনদের কপি দেন না। বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
অনুচ্ছেদ ৭-এ ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, কোন কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হবে, তা এখন আইনে উল্লেখ নেই। সরকারি কর্মকর্তা বা ইসির কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের জন্য বিষয়টি আইনে যুক্ত করা প্রয়োজন। ১২ অনুচ্ছেদে সরকারি আমলাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ, অবসর বা পদতাগের পর তিন বছরের মধ্যে ভোটে অংশ নেওয়ার যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা বাড়িয়ে পাঁচ বছর করার প্রস্তাব রয়েছে। ইসি কর্মকর্তাদের মতে, এতে রাজনৈতিক সরকারের অধীনে চাকরিরত আমলাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ থেকে মুক্ত রাখা যাবে। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক তালিকা দেওয়ার যে বিধান রয়েছে, তা বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এর পক্ষে কর্মকর্তাদের যুক্তি, যারা স্বাক্ষর দেন, তাদের অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন; ভয়ে সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বিষয়টি অস্বীকার করেন। আবার অনেক ভোটার অর্থ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন।
আরপিওর ১৩ অনুচ্ছেদে প্রার্থীদের জামানত ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৪ অনুচ্ছেদে মনোনয়ন দাখিল থেকে ভোট পর্যন্ত কেউ অসত্য তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রিটার্নিং অফিসারকে দেয়ার সুপারিশ এসেছে। ২৭ অনুচ্ছেদে পোস্টাল ব্যালটের বিধান বাতিলের সুপারিশ করেছেন মাঠের কর্মকর্তারা। তাদের যুক্তি, এ বিধানটির কার্যকারিতা নেই বললেই চলে। ৩৮ অনুচ্ছেদে সমভোট প্রাপ্তদের মধ্যে বিজয়ী ঘোষণার জন্য লটারি প্রথা বাতিল করে পুনঃভোট আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, ওই বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বর্তমানে কাস্টিং ভোটের এক অষ্টমাংশ না পেলে জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। তা বাড়িয়ে এক পঞ্চমাংশ করার প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের ব্যয় তদারকিতে রিটার্নিং অফিসারের অধীনে একটি মনিটরিং কমিটি করা এবং অডিটে অপরাধ প্রমাণিত হলে পদ শূন্য ঘোষণার বিধান রাখার কথাও মাঠ কর্মকর্তারা বলেছেন। রাজনৈতিক দল নির্ধারিত সময়ে ব্যয়-বিবরণী দিতে ব্যর্থ হলে জরিমানা ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
আরপিওতে নির্বাচনকালীন যানবাহন সংগ্রহের সুবিধার্থে হুকুম দখলের ক্ষমতা বাড়ানো, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তিন মাস আগে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার নেতৃত্বে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার প্যানেল তৈরি, মনোনয়নপত্র জমার শেষ তারিখের কমপক্ষে একদিন পর বাছাইয়ের জন্য একাধিক তারিখ রাখা, টিআইএন সনদ দাখিলে ১২ ডিজিট ব্যবহার, মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকলেও বৈধ ঘোষিত বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারের ক্ষমতা বাড়ানো, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণার বিষয়টি স্পষ্ট করা, ভোটের দিন বিভিন্ন ঘটনায় কেন্দ্রের ভোট বন্ধ করতে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার ক্ষমতার পাশাপাশি ভোটের আগে রাতে ব্যালট ছিনতাইয় হলে কেন্দ্রের ভোট বাতিলের ক্ষমতা রিটার্নিং অফিসারকে দেওয়ার মতো বিষয়ে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে সংযোজন-বিয়োজন করার প্রস্তাব দিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
ইসির কর্মকর্তারা জানান, আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি এ পর্যন্ত একটি বৈঠক করেছে। কমিটির পরবর্তী বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশরে বিদায়ী সচিব মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আইন সংস্কারে কিছু প্রস্তাব এসেছে। আইন ও বিধি সংস্কার কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এসব সুপারিশের কোনগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে বা কোনগুলো বাদ পড়বে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। আমাদের নিজস্ব কর্মকর্তাদের এই সুপারিশ ছাড়াও সংলাপে নিশ্চয় আইন সংস্কারে কিছূ প্রস্তাব আসবে। সব বিষয় বিবেচনা করে তারা আরপিও সংশোধনীর খসড়া প্রণয়ন করা হবে।’
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ