নির্বাচন কমিশন ও ঐকমত্য ।। বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে

আপডেট: ডিসেম্বর ১১, ২০১৬, ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বিএনপি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে নেই। তবে একটু ঘুরিয়ে দাবির পক্ষে সোচ্চার হচ্ছে। বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ রাজধানীতে শুক্রবার এক আলোচনা সভায় বলেছেন, নির্বাচন কমিশন যত শক্তিশালীই হোক না কেন, প্রশাসন দলীয় সরকারের অধীনে থাকলে তারা ‘অসহায়’ হয়ে যায়। আর এ কারণেই বিএনপি নির্বাচনের সময় নির্দলীয় একটি সহায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে আসছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তিনি আরো বলেছেন, “আমরা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করার জন্য, নিরপেক্ষ করার জন্য এবং শক্তিশালী করার জন্য কিছু প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা খুশি যে সরকারও বলেছেন, রাষ্ট্রপতি যেটা বলবেন, তারা সেটা মেনে নেবেন।”
জাতীয় রাজনীতির অতীত অত্যন্ত নির্দয়, নৃশংস ও একপেশে। এটিকে সেইভাবে যার মত যেমন করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু অতীতের বিষয়গুলি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো ধরনের অনুতাপ কিংবা ভুল স্বীকার করে নি। সরকারে থাকলে তারা একরকম বিরোধী দলে গেলে অন্যরকম। ফলে গণতন্ত্রের গন্তব্য পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। রাজনীতিতে শঠতা, ষড়যন্ত্র, হত্যা গুম খুন, আস্থাহীনতা, বিশ্বাসহীনতা, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা- এসবই বাস্তবতা। এর মধ্যেই বিএনপি ও কথিত নাগরিক প্রতিনিধিদের ঐকমত্যের নির্বাচন কমিশন কীভাবে সম্ভবÑ আদৌ এর বাস্তবতা কতটুকু তা একটি ভাববার বিষয়।
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের ১১তম নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের উন্নয়নের জন্য, স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচন কমিশন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক হওয়াই বাঞ্ছনীয়। এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দলগুলো কখনই আন্তরিকতা দেখাতে পারে নি।
এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে পৌঁছানো জরুরি। এ কথা আমরা সকলেই বলছি। এটার যথার্থতাও আছে নিশ্চয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে একটু মনোযোগ দিলেই বুঝতে অসুবিধে নেই যে, ঐকমত্যের জায়গাটি এখনো যোজনব্যাপি দূরে।  আমাদের এই বিরাজমান সংস্কৃতিতে সেটা সম্ভব কি? এটা খুবই বিবেচ্য বিষয়।
নিকট ভবিষ্যতে এটা যে সম্ভব নয় তা বোধকরি সকলেরই স্বীকার্য ব্যাপার। জাতীয় রাজনীতিতে ভয়ঙ্কররূপে আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কট বিদ্যমান। এই সঙ্কট মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্নে যেমন তেমনি নিজেদের সুরক্ষার প্রশ্নেও। এটি শুধু রাজনৈতিক দলের ব্যাপার নয়Ñ দেশের মানুষও একইভাবে বিভক্ত। এখানে নৈতিক অবস্থানের চেয়ে দলীয় অবস্থানকে দৃঢ় অবস্থায় দেখতে চায় দেশের মানুষও। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর যে ভাবে দেশকে পিছনের দিকে চালিত করা হয়েছে বছরের পর বছর ধরে, সংবিধানকে কাটাছাড়া করে জাতীয় নেতাদের হত্যার বৈধতা দেয়া হয়েছে, খুনিদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষতা দিয়ে পুরষ্কৃত করা হয়েছে, দেশকে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার আদলে ‘মিনি পাকিস্তান’ বানানোর প্রয়াস চালানো হয়েছেÑ সেই হোতাদের সাথে ঐকমত্য হওয়াটা মোটেও সাধারণ ব্যাপার নয়। যারা বিষয়টিকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করছেন, গণতন্ত্র নাই বা গণতন্ত্র গেল বলে বেজায় চিৎকার করছে তারা কিন্তু বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থানের ব্যাপারে খুবই নিরব থেকেছেন। এই কথিত গণতন্ত্রীদেরও দেশের মানুষ বিশ্বাস করে না। তাদেরকেও মতলববাজ হিসেবেই মানুষ জানে।
ঐকমত্য তখনই সম্ভব যে মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে আস্থা ও বিশ্বাসের কারণগুলোর মিমাংসা করা হবে এবং সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর বাইরে দাঁড়িয়ে ভালো কথা ভালো লাগে বটে কিন্তু বাস্তসম্মত নয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ