নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: জানুয়ারি ১৩, ২০২০, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
এর পরের নির্বাচন ছিল জাতীয় পরিষদের, ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদার্থবিজ্ঞান বিভাগে এম.এস.সি. ক্লাসের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। এই ভোট উপলক্ষে আমাদের এক সপ্তাহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস সমূহ বন্ধ ঘোষণা করা হয়। আমরা সব নিজ নিজ এলাকায় চলে যাই এবং মুসলিম লীগ বিরোধী প্রচারণা চলতে থাকে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য ছিল হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট গঠন। এই যুক্তফ্রন্ট গঠনের পেছনে ছিল বায়ান্নর একুশের চেতনা এবং ছাত্র সমাজের ঐক্য। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিরোধী বিভিন্ন রজানৈতিক দলগুলোকে কেবল ঐক্যবদ্ধ হতেই শেখায়নি বরং ১৯৫৪-এর সাধারণ নির্বাচনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। যার ফলে এই নির্বাচনে ২৩৭ টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৮টি আসনে জয়ী হয়। এই নির্বাচনে বিজয়ের ক্ষেত্রে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
এই নির্বাচনে আমিও একজন ভোটার ছিলাম। সেই ভোটার তালিকায় আমার নাম ছিল এলতাস মন্ডল। ভোট দিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করলাম তা নিম্নরূপ: ‘আমার বৃদ্ধাঙ্গুলের নখে পাকা কালির দাগ দেয়ার পর আমার হাতে একটি ব্যালট পেপার ধরিয়ে দেয়া হলো। আমি ভোটদানের কক্ষে গিয়ে দেখলাম বেশ কয়েকটা বাক্স আছে। একটা বাক্স নৌকার ছবিতে মোড়ানো, দ্বিতীয়টি হারিকেনের ছবির, তৃতীয়টি সাইকেলের ছবি দিয়ে মোড়ানো ইত্যাদি। তখন যুক্তফ্রন্টের প্রতীক ছিল নৌকা, মুসলিম লীগের প্রতীক ছিল হারিকেন, অন্য একটি প্রতীক ছিল সাইকেল। আমি ব্যালট পেপারটি নিয়ে নৌকা মার্কা বাক্সে ফেলে দিলাম। ভোট দেয়া শেষ। আমি সেখানে যতক্ষণ ছিলাম, দেখি প্রায় সকলেই সেই নৌকা মার্কা বাক্সেই ব্যালট পেপার ফেলছে। আর যায় কোথায়, একটি একটি করে নৌকা মার্কা বাক্সে ব্যালট পেপার ভর্তি হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোকে সরিয়ে নিয়ে নতুন বাক্স দেয়া হচ্ছে। ফলাফল সম্পর্কে জানার কিছু বাকী থাকলো না এবং ভোট গণনা করার কোনো প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। বিপুল ভোটে পাস করেছিলেন যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী জনাব তহুর আহমদ চৌধুরী। এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ছাত্রসমাজ এবং তরুণ সমাজ। পাকিস্তান সৃষ্টির মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ ও আধিপত্যবাদ মনোভাবে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে মুসলিম লীগ সরকারকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলো।
১৯৫৪ সালের ভোটের ব্যাপারে বিশিষ্ট জনের মন্তব্য ছিলো, ‘এবার যুক্তফ্রন্ট থেকে একটা কলাগাছকে মনোনয়ন দিলেও সে গাছও পাস করে যেতো। কেননা ভোটাররা তো প্রার্থীকে কোনো দিন দেখেনি, এমনকি তার নামও শুনেনি। ভোট দিতে হবে নৌকা মার্কা বাক্সে, তারা তাই করেছে। কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, এভাবে, ওই শালাকে কী ভোট দিচ্ছি ভাই, খালি হক সাহেব” অর্থাৎ যেহেতু শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুক হক তাকে ভোট দিতে বলেছেন, তারা সেই কাজটি করেছে। এর বেশি কিছু না।
যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হলেও তাঁরা যথাযথভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন নি কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপের ফলে। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় এতো যোগ্য রাজনীতিবিদ থাকতে হঠাৎ করে মেজর জেনারেল ইসকান্দর মীর্জাকে পূর্ব বাংলার গভর্নর নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এখানেই তার শেষ নয়, ১৯৫৮ সালের ৬ অক্টোবর তৎকালীন সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ করেন এবং তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্র্তীকালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। এর কয়েকদিনের মধ্যে মাওলানা আবদ্দুল হামিদ খান ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে গ্রেপ্তার করা হয়। ক্ষমতায় আসীন হয়েই তিনি চিন্তা ভাবনা করতে লাগলেন কিভাবে দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকা যায়। সংবিধান সংশোধন করে তিনি প্রবর্তন করলেন মৌলিক গণতন্ত্র বা Basic Democracy এবং ১৯৬২ সালের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী তিনি ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে পরোক্ষ ভোটে ৬৩ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সম্মিলিত বিরোধী দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন মিস ফাতিমা জিন্নাহ। পরোক্ষ ভোট অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরোক্ষ ভোট কী? এ সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৪০ হাজার এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৪০ হাজার মোট ৮০ হাজার ভোটার নিয়ে তৈরি করলেন ইলেকটোরাল কলেজ। এদের ভোটেই সবকিছু নির্ধারিত হতো। ইলেক্টোরাল কলেজের সদস্য বা ভোটার হতেন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ এবং পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড কমিশনারদের নিয়ে। এই সীমিত সংখ্যক ভোটারদের তিনি যে কোনোভাবে খুশি রেখেছিলেন কিংবা কিনে নিয়েছিলেন। মৌলিক গণতন্ত্র প্রথার এখানেই রহস্য। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৬৯ এর দুর্বার আন্দোলনের মুখে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন এবং তিনি ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ, তৎকালীন সেনা প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে অবসরে চলে যান। ১৯৭০ সালে মানুষ ভোটের ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী ছিলেন। তার মূল কারণ ছিল আইয়ুব খান প্রবর্তিত মৌলিক গণতন্ত্রে সাধারণ মানুষের সরাসরি ভোটাধিকার ছিল না। জেনারেল ইয়াহিয় খান দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচণ্ড চাপে সরাসরি ভোটে এমএন.এ.ও এমপিএ, নির্বাচন ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনগণের অধিকার কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন।
উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ভোটার সংখ্যার উপস্থিতি ছিল আশাতীত। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃতৃত্বে আওয়ামী লীগের ছয় দফা এবং ছাত্রদের এগার দফার ভিত্তিতে জনগণের বিপুল ভোটাধিক্যে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে দুটি আসন বাদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাকি সব কয়টি আসন দখল করে এবং প্রাদেশিক পরিষদেও ৩১০ টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ২৯৮ টি আসনে বিপুল সংখ্যাধিক্য ভোটে জয় লাভ করে। এখানে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুর এই আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ ভোটে বিজয়ই স্বাধীনতা যুদ্ধের চালিকা হিসাবে কাজ করেছিলো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ আবারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত হয় এবং দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আমার অংশগ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ভোটার তালিকায় আমার নাম ছিল ঢাকা শহরে আর আমি তখন রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের উপাধ্যক্ষর পদে নিয়োজিত ছিলাম। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আমার ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেও, আমার স্ত্রী ও আমি দু’জন ভিন্ন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছিলাম। এরই নাম গণতন্ত্র। আমার ভোট আমিই দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের পর আমি রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়েছিলাম। আমার ফুফাতো বোনের বাসায় বেড়াতে গেলাম, যা আমাদের বাসা থেকে মাত্র ২ কি.মি. দূরে। আমার বোনের ভাসুরেরা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসে বললো, ‘ভাই এবার ভোট ভালই হলো। বাপজান ভোট দিতে যাইতে পারেনি। হামি ফের বাপজান পুছ করনু, বাপযান কাকে ভোট দিবো। বাপযান ফের আমাকে কহিলো পাঁচ জনা যাকে দেয়, তোমারাও তাকে ভোট দিও ব্যাটা। সভাই দেখনু যে নৌকায় ভোট দিছে, হামরা ফের তাতেই দিনু’Ñ আমার দেশের বেশর ভাগ ভোট এভাবেই দেয়া হয়। ভোটদান সম্পর্কে জেনারেল আইয়ুব খান মন্তব্য করেছিলেন, “বাঙালিদের আবার ভোট কিসের? ওরা তো সব ভেড়ার পাল। বড় ভেড়া যেদিকে যাবে, সব ভেড়া সে দিকেই যাবে। প্রার্থীবাছায়ের বুদ্ধি বা যোগ্যতা কোনোটাই তাদের নেই।”
(চলবে)