নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: জানুয়ারি ১৫, ২০২০, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

এইচএম এরশাদ সাহেবের শাসনামলে রাজনৈতিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। এ দেশের গণতন্ত্রীমনা জনগণ তাঁকে একদিনের জন্য শান্তিতে থাকতে দেয়নি। মিটিং, মিছিল, হরতাল, ধর্মঘট, ভাঙচুর ইত্যাদি ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো দু’ভাগে ভাগ হয়ে ১৫ দলীয় এবং ৭ দলীয় জোট গঠন করে। ১৫ দলীয় জোটে ছিল আওয়ামী লীগ, বাকশাল, জাসদ, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, একতা পার্টি, ও গণ আজাদী লীগ ইত্যাদি। ৭ দলীয় জোটে ছিল, জাতীয়তাবাদী দল, ইউপিপি, জাতীয় লীগ, কমিউনিটি লীগ ইত্যাদি। ১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে ১৫ দলীয়ও ৭ দলীয় জোট সচিবালয়ের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করে। শ্লোগান মুখর জনতার উপর পুলিশ ও বিডিআর এর সদস্যরা গুলি ছুড়লে ক্ষিপ্ত জনতা সচিবালয়ের দেয়াল ভেঙ্গে ফেলে। পুলিশের গুলিতে ডজনখানেক মানুষ নিহত হয় বলে জানা যায। নিজের অবস্থানকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করনোর নিমিত্তে সামরিক শাসক প্রায় ৪ বছর পর অর্থাৎ ১৯৮৬ সালে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এই নির্বাচনের অংশগ্রহণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধী জোটে ভাঙ্গনের সুর বেজে ওঠে। ১৫ দলের জোট ভেঙ্গে যায়। ১৫ দলের মধ্যে ৮ দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু ৭ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। নির্বাচন হয়ে গেলে ভোট গণনা চলছে। রেডিও টিভিতে ফল ঘোষণা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা এগিয়ে। হঠাৎ করেই নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ বন্ধ হয়ে গেলো। ব্যাপার কী? পরে জাতীয় পার্টিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দেখিয়ে ফলাফল ঘোষণা করা হলো। বিরোধী দল এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই ফলাফলকে, ‘মিডিয়াকে ক্যুর’ নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। ভোটার উপস্থিতিও দেখানো হয়েছিলো রেকর্ড পরিমাণ, যা কোনোক্রমেই সম্ভব ছিল না। এই নির্বাচনের ব্যাপারে রাশিয়ার লৌহমানব বলে খ্যাত জোসেফ স্ট্যালিন মন্তব্য করেছিলেন, “নির্বাচনের ক্ষেত্রে যারা ভোট দেয়, তারা কিছু না, যারা ভোট গণনা করে, তারাই আসল”। তাঁর বক্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য।
দুঃখজনক হলেও সত্য এই নির্বাচনের ব্যাপার নির্বাচন কমিশন কিছু করেনি বা বলে নি, কিংবা কোনো কিছু করার বা বলার সৎ সাহস ছিল না। তা হলে কি ধরে নেয়া যায় যে, যার হাতে অস্ত্র নেই, তার কোনো ক্ষমতাই নেই”। দুর্ভাগ্য এই অনিয়মের ব্যাপারে, নির্বাচন কমিশন টু শব্দটিও করেনি। তদন্ত করা সেতো অনেক দূরের কথা। এই আন্দোলন, জ্বালাও, ঘেরাও, হরতাল ইত্যাদির পরেও সামরিক সরকার দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় টিকে ছিল। তবে একটা কথা আছে, জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস, যা এদেশের সংগ্রামী জনগণ এরশাদ সরকারের ভুল ভাঙ্গিয়ে দিয়ে তা প্রমাণ করেছিলো। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর বিরোধীদলগুলো নির্বাচনপন্থী ও নির্বাচন বিরোধী এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আন্দোলনও চলতে থাকে। বিরোধী দল বিশেষ করে কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠন রেলপথ, রাজপথ অবরোধ করে। ৮ দলীয় যে জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা ও ৭ দলীয় জোটের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ২৮ অক্টোবর প্রথমবারের মতো একত্রে বৈঠকে বসেন ্এবং বিবৃতি দেন।
১৯৮৮ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কেন যেন বন্ধ করে দেয়া হয়। ৩ মার্চ আবারও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নানা অনিয়ম অভিযোগের জন্য এই নির্বাচনও জনগণের গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এই নির্বাচনে আসম আবুদর রবকে বিরোধী দলীয় নেতা বানানো হয়, আর উপনেতা হয়েছিলেন আমার অগ্রজপ্রতিম অতি পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের এহসান আলী খান (সদ্যপ্রয়াত)। এহসান ভাই মানুষ হিসেবে বেশ ভালই ছিলেন। স্কুল থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার হৃদ্যতা ছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে এদেশের ছাত্রজনতার পাশাপাশি দেশের সর্বস্তরের শিল্পী সমাজ, সম্মিলিত সাংস্কৃুতিক জোট, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। প্রচণ্ড বিরোধিতা ও আন্দোলনের মুখে ৬ ডিসেম্বর, ১৯৯০ সুপ্রিম কোর্টেও প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি বিদায় নেন। প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচন তাঁর নিরপেক্ষতা, একনিষ্ঠ তৎপরতা, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার জন্যই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা দেশে বিদেশে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়। ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭৫ টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। প্রার্থীর সংখ্যাছিল প্রায় ২৭৮৭ জন এবং ৫৫.৪৫ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। জাতীয় সংসদের এই নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ১৪০ আসন, শেখ হাসিনারর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ৮৮ টি আসন, ক্ষমতাচ্যুত এরশাদের জাতীয় পার্টি ৩৫ টি আসন এবং জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১৮ টি আসন লাভে সমর্থ হয়। ১৯৯১ সালের ৩ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন। বিরোধী দলের নেত্রী হিসাবে জাতীয় সংসদে আসন গ্রহণ করেন শেখ হাসিনা ওয়াজেদ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তৎকালীন স্পিকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পান খুলনার শেখ রাজ্জাক আলী (প্রয়াত)। বাংলাদেশে এই প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও নারী বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবেও তাঁরা গৌরবের অধিকারী হন। আমাদের আশা ছিল দুই নেত্রীর উপস্থিতি সংসদকে প্রাণবন্ত করে তুলবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে দীর্ঘ পনেরো বছর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ফিরে আসে সংসদীয় গণতন্ত্র যা সরকারি ও বিরোধীদল এক মত হয়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতিতে দেশকে ফিরিয়ে আনেন। দিন যায়, মাস যায় বিরোধী দলের পালে নতুন করে হাওয়া লাগতে থাকে। এবার গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্যু” হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবর্তন এবং সংবিধান সংশোধন করে তা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা। ভবিষ্যতে যত জাতীয় নির্বাচন হবে সবগুলোই হবে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, এর কোনো ব্যত্যয় হতে পারবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নটা উঠে আসার কিছু কারণ ছিল। ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। ঢাকায় আওয়ামী লীগ স¤র্থিত প্রার্থী মো. হানিফ বেশকিছু ওয়ার্ড কমিশনারসহ বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মীর্জা আব্বাসকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরী বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী নাসিরউদ্দিন চৌধুরীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের এই দুটি বড় শহরে মেয়রের দুটো পদ হাতছাড়া হয়ে যাবার পর বিএনপি বেকাদায় পড়ে যায় এবং তাঁদের জনপ্রিয়তা কমে গেছে বলে শঙ্কিত হয়ে ওঠে। এরই মধ্যে মাগুরার একটি আসনে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিএনপি নেতারা বিশেষ করে মাগুরার বিএনপি নেতা মেজর জেনারেল (অব.) মাজিদুল হক এ সুযোগ গ্রহণ করতে তিল মাত্র দ্বিধাবোধ করেন নি। এই আসনে তাঁদের জয়লাভ করতেই হবে। এটি তাঁদের Prestige issue হয়ে দাঁড়ায়। জানা যায়, একজন ব্যবসায়ী রাজনীতিককে বিএনপি জোট এই উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মনোনয়ন দেয় এবং তিনি নির্বাচনে জয়লাভও করেন। এই নির্বাচনে বেশকিছু অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে এবং মিডিয়াতে তা প্রকাশিত হয়। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাৎক্ষণিকভাবে মাগুরা যাত্রা করেন এবং তিনি সেখানে সরেজমিনে সবকিছু দেখেন, শুনেন, পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাঁর মন্তব্য ঢাকা ফিরে গিয়ে দেবেন বলে ঘোষণা দেন। যতদূর মনে পড়ে তিনি ঢাকায় ফিরে এসে কোনো মন্তব্য, বক্তব্য কিছুই দেননি এবং নির্বাচন বাতিলও করেন নি।