নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: জানুয়ারি ১৬, ২০২০, ১২:৫৬ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

এরপরই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে বিরোধী জোট বক্তব্য দেন যে, এই সরকারের অধীনে কোনো নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। তারপরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি উঠে আসে এবং ১৯৯৪ সালে থেকেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের সকল বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক বা ‘কেয়ারটেকার’ সরকারের দাবিতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ‘এই মুহুর্তে দরকার কেয়ারটেকার সরকার’ পোস্টারে দেশের সর্বত্র ছেয়ে যায়। দেয়ালে দেয়ালে তা লিখাও হয়েছিল। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এই দাবি মানতে প্রথম দিকে অসম্মতি জানান। ফলে দেশ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়। দেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা বিবেচনা করে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এই ‘কেয়ারটেকার’ সরকারের পদ্ধতি মেনে নিতে বাধ্য হন। সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হলো এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সংসদের ষষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কেন যেন অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে, যদিও তাঁরাই এই ‘কেয়ারটেকার’ সরকারের উদ্যোক্তা ছিলেন। ফলে যা হবার তাই হলো। এক তরফা নির্বাচন হয়ে গেলো এবং বিএনপি সাংসদরা ৪ মার্চ, ১৯৯৬ শপথ গ্রহণ করেন। সংসদ বসলো এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন বিল সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে পাস হয়ে যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্ত হলো। এরপরই ২৫ মার্চ, ১৯৯৬ তারিখে সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন সেটিও নির্ধারিত হয়েছিলো। ইমিডিয়েট পাস্ট অর্থাৎ সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন বলে সিদ্ধান্ত হয়। এর অবশ্য যৌক্তিকতা ছিল। বিচারপতিদের প্রতি এদেশের মানুষের আস্থা এখনও আছে। তাছাড়াও বিচারপতিদের ভাবমূর্তি পৃথিবীব্যাপি সমুজ্জ্বল।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন, সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি হাবিবুর রহমান। তাঁর সঙ্গে ৯ জন উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁরই নেতৃত্বে বাংলাদেশের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, যোগ্যতা, সততা, নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতার জন্যই বোধকরি এই নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছিল। এই নির্বাচনের ফলাফল দেখা যায়, সংসদের ৩০০ টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ১৪৬ টি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১১৬ টি, জাতীয় পার্টি ৩২ টি ও জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশ মাত্র ৩ টি আসন লাভ করে। ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৫ শতাংশ। এই নির্বাচনে রেকর্ড পরিমাণ সর্বোচ্চ ৮১ টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। স্পিকারের দায়িত্ব পান জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরি এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদ। বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন, বেগম খালেদা জিয়া। চিরাচরিত নিয়মে সংসদে বিরোধী দলের নেগেটিভ ভূমিকার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে এবং তাঁরা নানা অজুহাতে সংসদে যোগদান থেকে বিরত থাকেন। দু/একদিন যোগদান করলেও ‘ওয়াক আউট’ করে বের হয়ে আসেন।
ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে এলো এবং অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলতে লাগলো। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসাবে এবার প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পেলেন বিচারপতি মো. লতিফুর রহমান। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ১৫ জন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বদলি করলেন। তাছাড়াও নির্ব্চানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এই ধরনের সিদ্ধান্ত মনে প্রাণে সমর্থন করেনি। সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় অষ্টম জাতীয় সংসদের নির্বাচন ২০০১ সালের ১ অক্টোবর, বেশ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। এই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ১৯৫ টি আসনে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ৫৮ টি, জামায়াতে ইসলাম ১৭টি, ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪ টি আসনে জয়লাভ করে। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ভোট সংখ্যা দিয়ে হিসাব করলে দেখা যায়, বিএনপি পেযেছিল ৪০.৯৭ শতাংশ ভোট, আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪০.১৩ শতাংশ ভোট। ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪ টি আসন পেলেও তারা পেয়েছিলেন ৭.২৫ শতাংশ ভোট, আর জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশ ১৭ টি আসন পেলেও তারা পেয়েছিলেন মাত্র ৪.২৮ শতাংশ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী ৭টি আসন পেলেও তাঁরা পেয়েছিলো ৪.০৬ শতাংশ ভোট।
যা হোক, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। মহামান্য প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হলেন ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং পরে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়াজদ্দিন আহমদ এবং স্পিকার পদে নিয়োগ পেলেন ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। বিরোধী দলের নেত্রী হলেন আবারও শেখ হাসিনা। এবারও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা সংসদ বর্জন করেছেন। ধর্মঘট, হরতাল হয়েছে, কিন্তু কোনো বড় ইস্যু নিয়ে তাঁরা মাঠে নামেনি বা আন্দোলনে যায়নি।