নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: জানুয়ারি ১৭, ২০২০, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

যাঁরা সরকারে থাকেন, তাঁরা বুঝতে পারেন না সময় কত দ্রুতগতিতে চলে যেতে থাকে। দেখতে দেখতে সংসদের দিন ফুরিয়ে এলো। তাঁদের সরকারের প্রশাসনের শেষদিন ছিল ২৮ অক্টোবর, ২০০৬ সাল। ফলে ৯০ দিনের মধ্যেই অর্থাৎ ২০০৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচনের কাজ সম্পন্ন করতেই হবে। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, গোল বাধলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদে নিয়োগ নিয়ে। সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি ছিলেন কেএম হাসান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার কথা তাঁরাই। কিন্তু না, এর মধ্যে একটা ঘটনা ঘটে যায়, যা আওয়ামী লীগের দৃষ্টি এড়ায়নি। হঠাৎ করেই বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরভ মনে করলেন, বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার জন্যই অবসর গ্রহণের বয়স বাড়িয়ে ৬৭ বছর করা হয়েছে, যাতে করে সামনে দু’বছরের মধ্যে আর কোনো বিচারপতি অবসরগ্রহণ না করেন। তা ছাড়াও কেএম হাসান নাকি এককালে বিএনপি সদস্য ছিলেন। কাজেই ১৪ দলীয় জোটের সাফ কথা তাঁরা কেএম হাসানকে তাত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কোনোক্রমেই গ্রহণ করবেন না। যদিও এটা ছিল বিচারপতি কেএম হাসানের সাংবিধানিক অধিকার। ফলে ইচ্ছা করলে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি এই বিতর্কের মধ্যে যেতে চাননি। তাঁর জন্য দেশের ক্ষয়ক্ষতি হোক, সেটাও তাঁর কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। এই সব কারণে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। এর থেকে বোঝা যায়, তিনি একজন বড় মাপের ও উদার মনের মানুষ এবং দেশপ্রেমিকও বটে। তিনি তো আপাতত বাঁচলেন, কিন্তু তার পরই সৃষ্টি হলো নানা জটিলতা ও সাংবিধানিক সঙ্কট।
এখন কে হবে প্রধান উপদেষ্টা এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মধ্যে নাম চলে আসে বিচারপতি মইনুর রেজা চৌধুরী (অকালে প্রয়াত), বিচারপতি মো. হামিদুল হক, বিচারপতি এমএ আজিজ, বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী প্রমুখের। কিন্তু না এতেও সুরাহা হলো না। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের ব্যাপারে কোনো জোটই ঐকমত্যে পৌঁছতে সমর্থ হলো না। মহামান্য রাষ্ট্রপতির তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমান চৌধুরীর ভাষ্য মতে, “বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুইয়া ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠকে কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত না হওয়ায় জলিল সাহেব রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করলেন সংবিধানের অংশ অনুযায়ী তিনি নিজে প্রধান উপদেষ্টা পদগ্রহণ করলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি সর্বশেষ বলে বসলেন”। আপনারা যদি কোনো ক্রমেই প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগের ব্যাপারে, ঐকমত্যে পৌছিতে না পারেন, তা হলে জাতীয় স্বাথে”। could offer myself।”
রাষ্টপতি প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করতে সম্মত হলে ১৪ দলীয় জোট এ ব্যাপারে তাঁদের অসম্মতি জানায়। এখন উপায় কী? ২৯ অক্টোবর, ২০০৬ তারিখে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কোনো ব্যক্তিকে শপথ নিতেই হবে, কেননা ২৮ অক্টোবরের পর বেগম খালেদা জিয়ার সরকার একদিনের জন্যও ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ অক্টোবর, ২০০৬ বিকেলে বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিজেই প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ৪ দলীয় জোটের সিনিয়র নেতারা উপস্থিত থাকলেও ১৪ দলীয় জোটের কোনো সদস্যকে দেখা যায়নি। অবশ্য দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে ১৪ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে বলা হলো, রাষ্ট্রপতির কাজ দেখে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁদের জোট নির্বাচনে যাবে কি না?
এর পর ১৪ দলীয় জোট রাষ্ট্রপতির কাছে ২০ দফা দাবি পেশ করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্ভুলভাবে ভোটার তালিকা হাল নাগাদ এবং প্রশাসনকে দলীয়প্রভাব মুক্ত করা। চার দিনের মধ্যে এই সব দাবি পূরণ করতে না পারলে, আবার নতুন আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। ২০০৬ সালের ৩১ অক্টোবর, দশজন উপদেষ্টাকে নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। ২০০৬ সালের ৪ নভেম্বর তারিখে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের ব্যাপারে চার দলীয় জোট বিরোধিতা করে ঘোষণা করলো যে, নির্বাচন কমিশনে হস্তক্ষেপ করা বরদাস্ত করা যাবে না। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনারের পদ সাংবিধানিক। নিজে পদত্যাগ না করলে এ পদ থেকে কাউকে অপসারণ করা যায় না। এর মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এমএ আজিজ সাহেব ঘোষণা দিলেন, তাঁর অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। একদিকে ১৪ দলীয় জোট প্রধান নির্বাচন কমিশনের অপসারণ চায়, অন্যদিকে চার দলীয় জোট জিদ ধরলেন তাঁকে অপসারণ করা হলে চারদলীয় জোট আন্দোলনে যাবে। এইভাবে বিভিন্ন দিক থেকে দেশ হয়ে উঠলো আন্দোলন মুখর এবং অনিশ্চয়তা ও অরাজকতার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। উপদেষ্টা পরিষদও যেন তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছিলেন না। প্রশাসনে সম্ভবত চেইন অব কমান্ডের সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, ২০০১ সালের নির্বাচনে ব্যাপারে ১৪ দলীয় জোট যে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলো, সেখান থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাদের জয়ের ব্যাপারে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং জোটের মধ্যে শঙ্কার সৃষ্টি হয়। আমার মতে তাদের এই চিন্তা ভাবনা ছিল অমূলক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ক্ষমতা বদলের ক্ষেত্রে সব সময়ই সহায়ক হয়েছে। যে, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের” কথা আমরা বলছি, সেটি নিরপেক্ষ, নির্দলীয় সরকারের অধীনেই সহজেই তৈরি হয় এবং ভোটার তালিকাও সুষ্ঠুভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করতে পারলে “কেয়ারটেকার” সরকারের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু না, আমার মতে নির্বাচন কমিশন যতই স্বাধীন ও শক্তিশালী হোক না কেন, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প হতে পারে না। এ ব্যাপারে আামদের প্রত্যেকেরই কম-বেশি কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা আছে। আইনের ম্যারপ্যাচে নির্বাচন কমিশনও বন্দি এবং তাঁদের কাজেরও নানাবিধ সীমাবদ্ধতা আছে। জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের আনাচে কানাচে, গ্রামেগঞ্জে সব খানেই। সেখানে থাকেন প্রিসাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, পোলিং এজেন্ট, ্আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সদস্যরা, ভোটারেরা ও অন্যান্য দলীয় কর্মীরা। ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ করা হয়। ভোট শেষে কে কত ভোট পেলো তা গণনা আরম্ভ হয়। কেন্দ্র ভিত্তিক ফলাফলও প্রকাশিত হয়ে যায়, কেননা বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিদের সামনেই ভোট গণনা করা হয়। এইভাবে ভোটের ফলাফল ইউনিয়ন থেকে চলে যায় উপজেলায়, সেখান থেকে জেলায়। ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকায় অবস্থিত নির্বাচন কমিশন অফিসে। নির্বাচন কমিশন অফিসে সেগুলো চেক করা হয় এবং সমন্বয় করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হয। কাজেই নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী বা স্বাধীন হোক না কেন তাদের করার কিছুই থাকে না। যা কিছু ঘটনা বা অঘটন ঘটুক না কেন, তা ঘটে ভোট কেন্দ্রে। ভোট কেন্দ্রে একবার ভোট দেয়া হয়ে গেলে, সেখানে কারও কোনো কিছু করার থাকে না। তবে হ্যাঁ অতীতে আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখেছি, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এমন কাজও তাঁরা যথাযথভাবে করেন নি বা করতে পারেন নি।