নির্বাচন নিয়ে কথা

আপডেট: জানুয়ারি ১২, ২০২০, ১:০২ পূর্বাহ্ণ

মুহম্মদ এলতাসউদ্দিন


নির্বাচন নিয়ে লেখার আমার কোনো ইচ্ছেই ছিল না। কিন্তু কেন যেন এই শব্দটি বার বার আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে আমাকে বিব্রত করছে। কী এই নির্বাচন, কেনই বা এই নির্বাচন, এ ব্যাপারে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকলেও যাঁরা মানুষের ভোট নিয়ে নির্বাচিত হন, তাদের কাছে আমরা নস্যিসম। প্রতিদিনই পৃথিবীর কোনো না কোনো দেশে বিভিন্ন ধরনের নির্বাচন হতেই আছে। আমাদের দেশে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হয় জাতীয় নির্বাচন, সেখানে ক্ষমতা বদলের একটি সুযোগ আসে। রাজনীতিবিদেরা পাঁচ বছর ধরে জল্পনা-কল্পনা করেন, গবেষণা করেন, কিভাবে নির্বাচনে বেশি ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসা যায়। ক্ষমতার লোভটা তাঁদের মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। এরপরও আছে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন ভিত্তিক নির্বাচন, স্কুলে ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন, কলেজ গভর্নিং বডির নির্বাচন, সংসদ ভবনে নানা ইস্যুতে নির্বাচন ইত্যাদি। জাতিসংঘেও ভোটাভোটি হয়ে, বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হয়।
নির্বাচনের ইংরেজি অনুবাদ ঊষবপঃরড়হ এর’ মতো আরো দুইটি ইংরেজি শব্দ আছে যথা ঝবষবপঃরড়হ এবং ঘড়সরহধঃরড়হ. ঝবষবপঃরড়হ এরও অভিধানিক অর্থ হচ্ছে নির্বাচন বা বাছাই করা। সিলেকশনের ক্ষেত্রে ভোটাভোটির বিষয়টা কেন যেন আসে না। জনসাধারণের মতামত নিয়ে এখানে কিছু করা হয় না। এখানে বিভিন্ন পদের জন্য প্রার্থী বাছাই করা হয়, মেধা, অভিজ্ঞতা, পেশার প্রতি ঝোঁক বা অঢ়ঃরঃঁফব ইত্যাদির পরখ করে। আবার কেবলমাত্র মৌখিক পরীক্ষা নিয়েই প্রার্থী বাছাই করা হয়ে থাকে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষা যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়। অন্য একটি ইংরেজি শব্দ ঘড়সরহধঃরড়হ বা মনোনয়ন দান করা। বড় বড় কমিটিতে বা কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ব্যাপারে যে কমিটি গঠিত হয়, সেখানেও প্রয়োজন মাফিক যোগ্য ও সংশ্লিষ্ট কাজের সঙ্গে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাধারণত মনোনয়ন দেয়া হয়ে থাকে।
২০০৪ সালের স্কুলে ম্যানেজিং কমিটি কিভাবে গঠিত হবে, এ নিয়ে আমরা একটি স্টাডি করেছিলাম। সে ব্যাাপারে কিছু তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, বগুড়া, রাজশাহী আরও বেশ কয়েকটি জেলা ভ্রমণ করেছিলাম। সে সব স্থানে ইংরেজি ঊষবপঃরড়হ, ঝবষবপঃরড়হ ধহফ ঘড়সরহধঃরড়হ এই তিনটি শব্দ নিয়ে আমাদের কম ঝামেলা পোহাতে হয়নি। স্কুল ম্যানেজিং কমিটিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরির সদস্য থাকেন্, যেমন দাতা, প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষাবিদ, স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, অভিভাবক প্রমুখ। অভিভাবকদের মধ্য থেকে ম্যানেজিং কমিটি সদস্য নির্বাচনের ব্যাপারে সংবাদপত্রে অহরহ বিজ্ঞপ্তি দেখতে পাই। সেখানেও নানা সমস্যার উদ্ভব হতে দেখা যায়। এ নিয়ে মামলা মকদ্দমাও পর্যন্ত হয়ে যায়। অথচ এর সমাধান তো তাঁদেরই করতে হবে। এই ম্যানেজিং কমিটি গঠন নিয়ে আমরা মাঠপর্যায়ে বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম। নানা জনের নানা মত। কেউ বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে সব সদস্যপদ পূরণ করতে হবে।’ আবার অন্য দল মত প্রকাশ করেন, ‘এইভাবে না, তা হতে পারবে না। নির্বাচনের মাধ্যমে ভাল বা যোগ্য ব্যক্তিকে পাওয়া যাবে না। যাঁদের গায়ের জোর বেশি বা যাঁদের দলীয় সমর্থন আছেন, তারাই চলে আসবেন।’ তাঁদের কথা- ‘স্যার, ভাল মানুষের জায়গা নেই। বরং মনোনয়ন দিলে ভাল মানুষ এবং যোগ্য ব্যক্তিদের সদস্যপদে আসার সম্ভাবনা বেশি।’ বলা বাহুল্য, তাঁদের কাছ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া সম্ভব হয়নি। নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের ধারণা এ পর্যন্তই। তবুও তো গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। নেতা বা দলনেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটের মাধ্যমে যোগ্য ব্যাক্তিদের খুঁজে বের করা পদ্ধতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। একটা কথা আছে, “গধলড়ৎরঃু সঁংঃ নব মৎধহঃবফ” হিটলার অবশ্যই এই থিয়রি বিশ্বাস করতেন না।
মহানবী (স.) জীবনের শেষের দিনগুলোতে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়তেন। সাহাবীরা মহাচিন্তায় পড়ে গেলেন। মহানবী (স.)-এর কোনো কিছু হয়ে গেলে, (যা অবধারিত), তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন কে. তাঁর স্থান কার দ্বারা পূরণ করা সম্ভব হবে- এ ব্যাপারে তাঁরা অস্থির হয়ে পড়লেন। আর তো ধৈর্য ধরে না। একদিন সাহাবীরা মহানবী (সা.) কে জিজ্ঞাসা করে বসলেন, ‘মহানবী (সা.) আপনার অনুপস্থিতিতে আমাদের নেতৃত্ব দেবন কে? তাঁর সমকক্ষ কে বা হবেন?’ মহানবীর (স.) সাফ কথা, ‘তোমাদের নেতা কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত তোমরাই মিলে মিশে নেবে। আমি তো আমার উত্তরসূরি কে হবে, সে ব্যাপারে কোনো মতামত দেবোনা।’ এর চেয়ে বড় গণতান্ত্রিক মনোভাব কী হতে পারে? এরপর সাহাবীরা চিন্তা ভাবনা করতে লাগলেন কী করা যায়। হঠাৎ একদিনের কথা সাহাবীদের মনে পড়ে গেলো। কোনো একদিন মহানবী (স.) নামায পড়ার জন্য মসজিদে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু তাঁর শরীর তেমন ভাল ছিল না। তিনি নিজে ইমামতি না করে তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবী এবং মুরুব্বী হযরত আবু বকর সিদ্দিক (আ. স.) সেই জামাতে উপস্থিত ছিলেন। মহানবী (স.) তাঁকে ইঙ্গিত করলেন ইমামতি করার জন্য। এই ঘটনাটা সাহাবীদের মনে পড়ে গেলো এবং তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত হলো মহানবী (স.) এর স্থলাভিষিক্ত হবেন হযরত আবুবকর সিদ্দিক (আ. সা.)। হযরত আবুবকর (আ. স.) ছিলেন মানুষ হিসেবে খুবই ভাল এবং একজন খাঁটি মুসলমান। বয়সে প্রবীণ এবং তিনি হযরত আয়েশার পিতাও বটে। এর চেয়ে যোগ্য লোক আর কে হতে পারে। কাজেই এই যোগ্যপ্রার্থী বাছায়ের বা নির্বাচনের ব্যবস্থা তখনও ছিল।
এরপর দীর্ঘসময় অতিবাহিত হয়েছে। এই ভারত উপমহাদেশে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠী দ্বারা শাসিত হয়েছে। এর মধ্যে কোনো গণতান্ত্রিক প্রশাসন বা গণতন্ত্রেও চর্চা ছিল বলে মনে হয় না। মোগল আমলে কোনো ভোটাভোটি ছিল না। ব্রিটিশ আমলে অবশ্য বিংশ শতাব্দির প্রথম থেকেই আংশিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয় বলে জানা যায়। তবে ১৯৩০ দশকের পর থেকে এই বিটিশ ভারতে গণতন্ত্রের চর্চা আরম্ভ হয় এবং নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রবর্তন হয়। জার্মানের স্বৈরশাসক হিটলারও (১৮৮৯-১৯৪৫) জনগণের ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা এসেছিলেন। ভোটের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন, মানুষের হাতে পায়ে ধরেছেন এবং বেশি ভোট পেয়ে ক্ষমতাসীন হয়েছেন। এরপর আর যায় কোথায়। এই যে ক্ষমতায় বসলেন আর ক্ষমতা ছাড়েন নি আমৃত্যু। অন্যায়ভাবে অকারণে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছেন। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য তাঁকে করুণ মৃুত্যুবরণ করতে হয়েছিল। অর্থাৎ আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে স্থায়ী শান্তির আবাস খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি নিজেই। কী মর্মান্তিক!
জর্জ ওয়াশিংটনও (১৭৩২-১৭৯৯) ছিলেন আমেরিকার প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে অসাধারণ যোগ্যতা প্রদর্শনের জন্য প্রথম মেয়াদ শেষ হবার পর ১৭৯২ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়েছিল। এই মেয়াদ শেষ হলে তৃতীয়বারের মতো তাঁকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব করা হলে, তিনি সবিনয়ে তা প্রত্যাখান করেন এবং বলেছিলেন, ‘অন্য কেউ আমার চেয়েও ভালভাবে দেশ পরিচালনা করতে পারবেন।’ তাঁর কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না। তাঁর দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দিয়ে নীরবে নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছিলেন। অন্য একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের (১৮০৯-১৮৬৫) কথা বলতে চাই। তিনি ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট। তিনি ছিলেন মানবতাবাদী, গণতন্ত্রকামী মহান রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর নির্বাচনী ইশতিহারে ছিল, তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারলে ক্রীতদাস প্রথা চিরতরে বিলুপ্ত ঘোষণা করবেন এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ গোত্র নির্র্বিশেষে সকলের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করবেন। তাঁর সিনিয়র সহকর্মীরা পরামর্শ দিলেন, তিনি যেন দাস প্রথা নির্মূল করার কথা না বলেন। তা না হলে, তিনি জনগণের সমর্থন হারাবেন এবং ভোটও পাবেন না। এই জন্যই বোধকরি তিনি ইলিনয় প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। তবুও তিনি বলেছিলেন, ‘মিথ্যা কথা বলে ভোট বা জনসমর্থন পাওয়ার চেয়ে, সত্যকথা বলে ভোট না পাওয়া অনেক ভালো।’ অবশ্য তিনি ভোট পেযেছিলেন এবং ১৮৬১ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৮৬৩ সালে ১ জানুয়ারি লিঙ্কন চূড়ান্তভাবে ক্রীতদাসদের মুক্তি ঘোষণায় স্বাক্ষর দেন। বড়ই দুর্ভাগ্য, লিঙ্কন দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দেশ পরিচালনার সুযোগ পাননি। ১৮৬৫ সালের ২৫ এপ্রিল, থিয়েটার হলে একটি অনুষ্ঠান উপভোগের সময় ঘাতকদের গুলিতে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন, যা ছিল অত্যন্ত মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক এবং আমেরিকা তথা বিশ্বের মানুষের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
১৯৮৪ সালের নভেম্বর মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে জাতীয় নির্বাচন হয়েছিলো, আমি তার প্রত্যক্ষদর্শী। সেই সময় আমি টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের রাজধানী অস্টিনে অবস্থান করছিলাম। বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে আমাদেরকে নির্বাচনের ভোট দান পদ্ধতি দেখানো হয়েছিল। সেখানে রিপাবলিকান পার্টির একজন মুখপাত্র বললেন, “ডব ধিহঃ ৎড়ঁময ধহফ ঃড়ঁময সধহ ষরশব জড়হধষফ জবমধহ, হড় পড়সঢ়ৎড়সরংব রিঃয জঁংংরধ. রাশিয়া অবশ্য তখনও ভাঙ্গেনি। এই নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির রোনাল্ড রেগান, ডেমোক্র্যাটিক পাটির মেন্ডেলকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হলে এবং গণতন্ত্রেও চর্চা ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে এই নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এই গণতন্ত্রের জয়জয়কার। কোনো দেশে আবার রয়েছে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র। সেখানে যা খুশি করা যাবে না। গণতন্ত্র মানেই যে, যা খুশি করবেন বা লিখবেন, তা নয়। দেশের স্বার্থ বিরোধী বা দেশে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন কিছু করা উচিত হবে না। কিংবা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়, এমন কিছু করাও সমীচীন নয়। পৃথিবীতে বেশকিছু দেশ আছে, যে গুলোতে গণতন্ত্রের লেবাসে চলছে স্বৈরশাসন। মানবাধিকার দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে, তাঁরা অগণতান্তিক কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে।
নির্বাচন সম্পর্কে এই ধারণা নিয়েই আমি আমার দীর্ঘ জীবনে যে সব নির্বাচন দেখেছি, ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছি, ফলাফল অবহিত হয়েছি, সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করেছি মাত্র। ১৯৪০ সালের দিকের কথা। তখন আমার বয়স ৯ বছর হবে। আমার দাদার এক ভাই এসে বলল, ‘জানিস এবার ভোট হবে বাইলট ভোট’। বাইলট ভোট আবার কী? আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে তিন ফুট লম্বা, ৪ ইঞ্চি বাই ৩ ইঞ্চি মাপের একটি কাঠকে বলা হয় বাইলট। এই কাঠের উপর মোটা বালি দিয়ে ঘষে দা, হাসুয়া, বঠি, ছুরি, মাংস কাটা চাপাতি ইত্যাদি শান দেয়া বা ধার দেয়া হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে জানলাম, শব্দটি আসলে ব্যালোট (ইধষষড়ঃ) বা গোপনে ভোট দান পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ভোট দেয়া অত্যন্ত নিরাপদ, কেননা এই পদ্ধতিতে আপনি যাকে খুশি ভোট দিতে পারবেন। কেউ জানবে না, আপনি কাকে ভোট দিলেন।
১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব গ্রহণের পর, হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়্ এবং দ্বিজাতির ভিত্তিতে পাকিস্তান নামে দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র হবে, এটা সে সময়ের হিন্দু নেতারা মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেন নি। অন্যদিকে পাকিস্তানের পক্ষে জোর প্রচারণা চলতে থাকে। আমাদের মসজিদের সামনে খোলা জায়গাটিতে প্রায় প্রতি শুক্রবারই সভা হতো এবং সেখানে, ‘আমরা চাই পাকিস্তান’- শ্লোগানে আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে উঠতো। ১৯৪৬ সালের প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচনে মুসলিম লীগ ৯৭ শতাংশ আসনে জয়লাভ করে, যার ফলে পাকিস্তানের পক্ষে আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সেই নির্বাচনও হয়েছিল যতদূর জানি গোপন ব্যালোটের মাধ্যমে।
১৯৪৮ সালে নবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাচন হয়েছিল। আমাদের বাড়ি ছিল তৎকালীন ৩ নং ওয়ার্ডে (বর্তমানে ১৪ নং ওয়ার্ড)। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অভ্যুদয় হলেও ব্রিটিশের নির্বাচন সম্পর্কিত আইন-কানুন তখনও প্রচলিত ছিল। সেই আইনানুসারে সকল সাবালক পুরুষ বা নারী কারো ভৌটাধিকার ছিল না। একটি বাড়ি থেকে মাত্র একজনই ভোট দিতে পারতেন, যিনি বাড়ির বা পরিবারের প্রধান। এখানেই তার শেষ নয়। বাড়ির প্রধান হলেও ভোট দিতে পারবেন না যদি না সেই হোল্ডিং থেকে বাৎসরিক কম পক্ষে দশ আনা (!) পৌরকর আদায় না হয়। যার ফলে সাবালক এবং বাড়ির প্রধান হলেও অধিকাংশ অধিবাসী, ভোটদান থেকে বিরত থাকতে হতো। তবে কেউ যদি ম্যাট্রিকুলেশন পাস হয় তবে সে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। আমি সেই বছরই ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। আমার দাদা, যিনি প্রার্থী ছিলেন, আমাকে নিয়ে পৌরসভার চেয়ারম্যানের কাছে গেলেন। তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন, ‘ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে।’ এখানে উল্লেখ্য যে, আমার দাদা চেয়ারম্যান মহোদয়ের অনুগত ছিলেন না। সেবার ৩ নং ওয়ার্ড থেকে তিন জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। শ্রীলক্ষণ চন্দ্র মন্ডল, জনাব সলিম মন্ডল এবং আবুল ফজল খাঁ সাহেব। বাবু লক্ষণচন্দ্র মন্ডল ৬৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন। জনাব আবুল ফজল খাঁ সাহেব পেয়েছিলেন ৪০ ভোট এবং সলিম মন্ডল পেয়েছিল ২২ ভোট।
তখন পৌরসভার চেয়ারম্যান সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হতোনা। ওয়ার্ড কমিশনারেরা তাঁদের পছন্দ মতো একজনকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতেন। জনাব মোহাম্মদ নজমুল হক দীর্ঘদিন যাবত চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবেও তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। তখন ভোটদান প্রথা ছিল ভিন্ন। ভোট গোপনেই হতো, তবে ভোটার ‘ক্রশ’ বা ‘সিল’ কোনো কিছুই দেয়ার সুযোগ পেতেন না। কারণ সেই যুগে অধিকাংশ ভোটারই ছিলেন নিরক্ষর। যা হোক, যে কক্ষে ভোট দেয়া হতো, সেখানে পোলিং অফিসার বসে থাকতেন এবং ভোটার তাঁর পছন্দের প্রার্থীর নাম বললে পোলিং অফিসার তাঁর পক্ষে ‘ক্রশ’ চিহ্ন দিয়ে দিতেন এবং তা ভোট বাক্সে ফেলে দিতেন। এই ধরনের ভোট দান পদ্ধতিতে পোলিং অফিসারে সততা, বিশ্বস্ততা এবং ‘ইনটেগ্রিটি’ মুখ্য ভূমিকা পালন করতো। সেবার পোলিং অফিসার ছিলেন যতদূর মনে পড়ে একজন প্রবীণ আইনজীবী বাবু অনিল বন্ধু ভাদুড়ী।
(চলবে)