নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী আজও ভোলে নি মীরগঞ্জের মানুষ

আপডেট: এপ্রিল ৪, ২০১৭, ১২:৩২ পূর্বাহ্ণ

আমানুল হক আমান, বাঘা



শোষকগোষ্ঠী ইংরেজদের পতন ঘটেছে অনেক আগে। তাদের শোষণের নানা স্মৃতিচিহ্ন আজও বহন করে চলেছে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মীরগঞ্জ গ্রামের মানুষ। এই গ্রামে নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী আজও ভোলে নি সাধারণ মানুষ। তবে এই নীলকুঠি বর্তমানে রেশম বীজাগার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বাঘা উপজেলার মীরগঞ্জের মাটি নীলচাষের জন্য ওই সময় উপযুক্ত ছিল। ফলে এখানে আগমন ঘটে ইংরেজদের। এই গ্রামে গড়ে তোলে নীলকুঠি। আর আজও সেই নীল চাষের স্বাক্ষ্য বহন করছে উপজেলার পদ্মা নদীর তীরবর্তী মীরগঞ্জ গ্রাম। এই গ্রামে রয়েছে শ্রমিকগোষ্ঠী ও কুঠির ধবংসাবশেষ নীলকুঠি।
রেশম বীজাগারের শ্রমিক ও স্থানীয়রা জানান, নীল চাষের সুবিধার্থে ইংরেজরা এই অঞ্চলের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ঘটায়। নীলকররা বেশিরভাগ সময় ঘোড়ায় যাতায়াত ও চলাফেরা করতো। ব্যাপক কষ্টদায়ক ও নির্যাতনমূলক নীলচাষ করতে কৃষকরা একপর্যায়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করে। ১৮৬০ সালের দিকে এই অঞ্চলে নীল চাষের বিরুদ্ধে নির্যাতিত কৃষকরা বিদ্রোহ করে। ওই সময় হাজার হাজার কৃষক ইংরেজদের নীল চাষ বন্ধের প্রতিশ্রুতি আদায় করেন। সরকার ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই নীলকররা নির্যাতনমূলক চাষ আবারও শুরু করে। ১৮৮৯ সালে উপজেলার মীরগঞ্জ নীলকুঠির আশপাশের গ্রামের কৃষক একত্রিত হয়ে নীলচাষ বন্ধ করে দেয় এবং নীলকুঠিতে আক্রমণ করে। নীল চাষের জন্য নীলকররা এ অঞ্চলে অনেকগুলো যৌথ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিল। ওইসব প্রতিষ্ঠানকে বলা হতো কনসার্ন। কনসার্নের অধীনস্থে হাজার হাজার বিঘা জমি ছিল। ন্যায্যমূল্য না দেয়া ও বাধ্যতামূলক নীল চাষ করানোর প্রতিবাদে ওই অঞ্চলে বিভিন্ন সময় নীলচাষ করতে স্থানীয় লোকজন অনাগ্রহ ও বিদ্রোহ করতে থাকলে নীলকররা আদিবাসীসহ ভারতের বিহার প্রদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত অধিবাসীদের এনে শ্রমিক হিসেবে নীলকুঠিতে নিয়ে আসে। এরা বুনো ও সাঁওতাল শ্রেণিভুক্ত। যেখানে নীলকুঠি ছিল সেখানে এই বুনো ও সাঁওতাল বসতি এখনো লক্ষ্য করা যায়।
তবে ওই এলাকার পাশের গ্রামে অর্ধশতাধিক সাঁওতাল সম্প্রদায়ের লোকজন তখন থেকে বসবাস করে আসছে। বুনোরা দীর্ঘদিন ধরে এদেশে বসবাস করলেও এদের আচার-আচরণ, হালচাল, সামাজিক কর্মপদ্ধতি, উচ্চারণ ভঙ্গি ও জীবণযাত্রার বৈশিষ্ট্য প্রমাণ করে এরা স্থানীয় নয়। এদের মধ্যে এক শ্রেণি মাছ ধরে জীবিকা-নির্বাহ করে। অপর শ্রেণি গাছ কাটা, মাটি কাটা ও শ্রমিকের কাজ করে। কঠিন ও পরিশ্রমী কাজ করতে এরা শারীরিকভাবে অসুবিধা বোধ করে না। এদের অনেকে সাপ নিয়ে খেলা দেখাতো। মেয়ে পুরুষ উভয়ে সমানভাবে কাজ করতে পারে। একটি অংশ সর্দার হিসেবে পরিচিত। বাদুর, কাছিম, শিয়াল এদের প্রিয় খাদ্য। তবে এখন তারা বাঙ্গালি লোকদের মতো চলাফেরা ও খাওয়া দাওয়া করে।
বাঙালি হিন্দুদের মতো আচার-আচরণ করলেও সামাজিক ও কর্মপদ্ধতির দিক থেকে হিন্দুর সঙ্গে এদের বেশ পার্থক্য রয়েছে। রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হলে ঝাড়-ফোঁক, গাছের ডাল, বাকল ও শিকড় দিয়ে দেশিয় পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে। তবে আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে ওই চিকিৎসা।
এ বিষয়ে রেশম বীজাগারের ব্যবস্থাপক মাসুদ রেজা বলেন, ভবনগুলো কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে ইংরেজদের সেই নীলচাষ আর নীলকুঠি। তবে ১শ বিঘা জমির উপর বর্তমানে রেশম বীজাগার স্থাপন করা হয়েছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ