নেকলেসে নীল সন্ধ্যা

আপডেট: আগস্ট ৫, ২০২২, ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ

আরিফুল হাসান:


দেবদারু গাছটার কাছাকাছি বসে আছি। পুরু পাতাগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। একটু এগিয়ে গেলেই ছায়া। উঠছি না। পায়ে শিকড় গজিয়েছে, অদৃশ্য চুম্বকক্ষেত্র টেনে রাখছে কোলে। দরদর করে ঘামছি। রোদের কিরণ ফালাফালা করে কাটছে মুখের ত্বক। গায়ের জামাটা লেপ্টে আছে দেহে। কাছেই কোথাও একটা কূপ আছে পেয় জলের। বুকটা ফেটে যাচ্ছে তৃষ্ণায়। গিয়ে চুমুক দিচ্ছি না জলে। মরুর-জাদু বশ করে রেখেছে তীব্রভাবে। জিভ শুকিয়ে পাথর। ছাইরঙা একটা বর্তমান অচঞ্চল করে রাখছে ভেতরে বাইরে। দুয়েকটা পাখি উড়ে এসে কাছাকাছি বসছে, আবার চলে যাচ্ছে। কোত্থেকে একদল মাছি এসে নাকেমুখে বিরক্ত করছে। পায়ের গোড়ালিতে কামড়াচ্ছে লাল পিঁপড়েরা। বিষ লাগছে, কিন্তু সরে যাচ্ছি না। পায়ের উপর দিয়ে একটা সরীসৃপ সরসর করে ছুটে গেলো, দুটো ফড়িং এসে শার্টের কলারে বসলো আবার উড়ে গেলো। একটা ফিঙে একাকী পাক খাচ্ছে খোলা মাঠে। কেউ দেখছে না। মানুষজন সব দূরে চলে গেছে। কে কোথায় গেছে তারও হদিস নেই। তবে গেছে যে তার প্রমাণ এই খা-খা শূন্যতা। বুকের ভেতরটা কেমন ধ্বক করে উঠে, ভয়ের একটা ¯্রােত বয়ে যায় মেরুদ-ের নদী ধরে। দৌড়ে পালায় না।
মাটি হয়ে গেছি। জায়গাটার নাম ধূলিশ্বর। এখানে একসময় আমার প্রেমিকা থাকতো। তার ছিমছাম পরিবার থাকতো। ছোটো দ্’ুভাইকে নিয়ে ঘুরতে বেরুতো অর্পিতা। আমি তার চুলের ছন্দে, দেহের ঔজ্জ্বল্যে দিশেহারা হতাম। সে রোজই আমাকে দেখতো আর এমন করে চলে যেতো যেন সে কিছুই দেখেনি। একেবারে অগ্রাহ্য করতো আমাকে। আমিও নাছোড়বান্দা। প্রতিদিন আসতাম। অপেক্ষা করতাম তার বাইরে আসার। যথা নিয়মে সে আসতো। একজোড়া সাদা স্লিপার পরে, রুপোর রিনিঝিনি নূপুর থাকতো পায়ে। হাতে থাকতো একটি মেঘরঙের ডায়েরি সে প্রতিদিনই আসতো, এর ব্যত্যয় হতো না। ছোট ভাই দুটোকে সবুজে ছেড়ে দিয়ে ডায়েরির পাতায় মুখ গুঁজে কি যেন লিখতো। আমি তখন বসতাম এই দেবদারু গাছটির নিজে। প্রতিদিনই বসতাম। বসে বাঁশি বাজাতাম। সে আমার বাঁশির সুর শুনতো। কখনো মনে হতো, ডায়েরিতে শুধু ঝুঁকে আছে, আসলে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে আমার বাঁশির কান্না। আমার আরাধনাগুলো তার কাছে পৌঁছতো কিনা জানি না, তবে সুরের রাগে প্রায়শই সে মাতাল হয়ে যেতো। সে তার ভাইদেরকে ডাকতে ভুলে যেতো আর ইত্যবসরে নেমে আসতো সন্ধ্যা।
আমিও একটানা বাঁজিয়ে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। গলা শুকিয়ে রক্ত উঠতো মুখে, তবুও থামতাম না। সন্ধ্যা আঁধারের এলোকেশ ছেয়ে ফেলতো আমাদেরকে। এমন সময় অর্পিতার বাবা আসতেন ডাকতে। আমি আধো অন্ধকারের ভেতর তার চলে যাওয়া রেখা ধরে অপেক্ষা করতাম। পরদিন আবার আমরা আসতাম। বিকেল নেমে যাওয়ার পূর্বেই আমি নেমে পড়তাম পথে। বাঁশিটি কোমরে গুঁজে বাউলিয়া হাঁটতে হাঁটতে চলে আসতাম দেবদারু গাছটার নিচে। আমার আগেই এসে পৌঁছতো অর্পিতা। আমি দূর থেকে লক্ষ্য করেছি, যতক্ষণ আমি না আসতাম ততক্ষণ সে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেবদারু গাছটার দিকে চাইতো। বোধহয় আমারই প্রহর গুনতো মনে মনে। কিন্তু কি আশ্চর্য, আমার উপস্থিতি টের পেলেই তার চোখ নিবদ্ধ হতো ডায়েরিতে এবং সেখান থেকে একবারের জন্যও সে চোখ তুলতো না। ছোট ভাই দুটি সবুজের বুকে অগাধ উল্লাসে মেতে উঠতো আর তাদের হাতে প্রায়ই থাকতো একটি ফুটবল। অর্পিতা নিবিষ্ট মনে লিখে চলতো ডায়েরির পাতা। পাতার পর পাতা সে লিখে চলতো যতক্ষণ না আমি আমার বাঁশিটিতে সুর তুলছি। বাঁশিতে সুর উঠার সাথে সাথেই তার লেখা থেমে যেতো এবং একটি পাতার ভেতর সে ধ্যানে পড়ে যেতো। আমি মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করেই বাঁশির সুর থামিয়ে দিতাম এবং লক্ষ্য করতাম কিছুক্ষণ ঝিম মেরে থেকে সে আবার লেখা শুরু করতো।
আমি তার আঙুলগুলোর সঞ্চালন লক্ষ্য করতাম এবং কান পাততাম তার ডায়েরির পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দে।
দূরত্ব যদিও আমাকে কোনোটিতেই সফলতা দিতো না, কিন্তু আমি দমে যেতাম না। একটানা তাকিয়ে থাকতাম পলকহীন। তারপর কখন যে আনমনে আঁবার বাঁকা বাঁশের বাঁশিটি ঠোটে চলে আসতো আর সেও কেমন উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। আমাদের শেষ বিদায়ের দিন, মনে আছে, সে আমাকে একটি ডায়েরি উপহার দিয়েছিলো আর আমি দিয়েছিলাম আমার প্রাণের বাঁশিটি। দীর্ঘ তেরো বছর হলো আমি আমার উপহারটা খুলে দেখিনি। মনে হয়েছে একটু ছুলেই ঝরঝর ঝরে পড়বে অর্পিতার সমস্ত স্পর্শ। ফলে আমি
র‌্যাপিং পেপারটিও খুলে দেখিনি কোনো দিন। ঝিনুক বুকে গোপন করেছি রতœ। তেরোটি বছর ধরে আমি ডায়েরিটি বহন করছি। নিজেকে যে জায়গায় নিয়েছি, সেখানেই সাথী করেছি মোড়কাবরণের ডায়েরিটি। অনেকে আমার কাছে প্রশ্ন রাখতো, কী আছে ওতে। জানি না আমি বলতাম। লোকেরা আরও কৌতূহলী হতো এ ব্যাপারে। বলতো, খুলে দেখুন। উত্তর দিতাম, তাহলেই তো ফুরিয়ে যাবে। লোকের আমার উপর বিরক্ত হতো। কেউ কেউ পাগল ভাবতো আমাকে। আর এই ভাবাভাবির মধ্য দিয়েই দীর্ঘ তেরোটি বছর কেটে গেছে এবং এতো বছর পর আমি একটি জীর্ণ, বিধ্বস্ত, বিরান স্মৃতির ধূলিশ্বরে এসে দাঁড়িয়েছি। আমি আশেপাশে খোঁজ নিতে পারতাম। দুতিনটা গাঁয়ের মানুষকে জিজ্ঞেস করতে পারতাম আসলে ঘটনা কী
ছিলো? কিন্তু আমার আর জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হচ্ছিলো না এবং আমি ধপ্ করে বসে পড়লাম সে জায়গায় যেখানে আমার অর্পিতা বসে থাকতো। এই দুপুরের রোদে, এরকম শূন্যতার আগুন বুকে নিয়ে আমি বসে আছি। আছি তো আছিই। কতক্ষণ আছি জানিনা। দেখি, মাথার উপর থেকে সূর্যটা ক্রমশ হেলে পড়ছে পশ্চিমে আর আমি দক্ষিণমুখী হয়ে বসে আছি দৃষ্টিটা ঠিক সে যায়গায় স্থির করে যেখানে অর্পিতার ছোট দু ভাই খেলা করতো।
আমি জীবন থেকে হারিয়ে গিয়ে ছিলাম আর কেউ ভাবেনি আমাকে কোনোদিন আর ফেরত পাবে। আসলে আমি সহ্য করতে পারছিলাম না আমাদের বিচ্ছেদ আর মেনে নিতে পারছিলাম না তাকে ছাড়া বেঁচে থাকা। অর্পিতা আমার হাত ধরলো আর জানালো কাল তার বিয়ে হতে চলেছে। আমি অনেক্ষণ তাকিয়েছিলাম তার নিষ্পাপ দুটো চোখে আর বুঝে গিয়েছিলাম যে এটি ঘটবেই। অর্পিতা আমাকে তার ডায়েরিটি দিয়ে চলে যাচ্ছিলো। আমি তাকে ফেরালাম, কোমরে গুঁজা বাঁশিটিকে বের করে একটি করুণ সুর তুললাম সন্ধ্যায়। অর্পিতা কেঁদে দিলো। আমি আমার বাঁশিটিকে তার চুলের খোঁপায় গুঁজে দিলাম। সে অন্ধকারের মতো চলে গেলো। সে রাতে আমি আমার নিজেকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নিলাম আর একটি পত্র লিখলাম আমার আমার সমাজের প্রতি। সমাজের প্রতি এ জন্য যে আমার আপন বলতে নিজের কেউ ছিলো না। জন্মের সময় মা মারা গেছেন আর পিতা অর্পিতাও যদি চলে যায় তাহলে আমার আর বাঁচার অবলম্বন
কী? এ জীবন আমি রাখতে চাই না তাই সিদ্ধান্ত নিলাম আত্মহত্যা করবো। সে মোতাবেক অর্পিতার ডায়েরিটিকে বুকে ধরে বাড়ির চৌদ্দ মাইল দূরে রেলস্টেশনের দিকে আমি রওনা দিলাম এবং অন্ধকারে পথ ভুলে সারারাত কোথায় যে হাঁটলাম তার কোনো ইয়ত্তা নেই। সকাল হলে আমি আমার নিজেকে আবিষ্কার করলাম এক পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়িতে জঙ্গলের ভেতর। কিন্তু দিনের আলোতে নিজেকে শেষ করতে আমি প্রস্তুত ছিলাম না ফলে সারারাতের নির্ঘুম ক্লান্তি আমার দুইচোখে জেঁকে বসলো আর আমি ঘুমিয়ে গেলাম। সারাদিন মরার মতো ঘুমিয়ে প্রথম প্রহর সন্ধ্যার শেষে আমি জেগে উঠলাম। তখন কেনো যেনো দিনের আলোর অর্পিতার ডায়েরিটি খুলে দেখার ইচ্ছে হলো আমার। ফলে সে রাতেও আর মরতে পারলাম না। পরদিন মনে হলো যে ডায়েরিটি আমাকে নিশ্চিত একটি রাত্রের আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছে সেটি আঁকড়ে নিশ্চয়ই আমি জীবনও পার করতে পারবো। দিনের আলোয় পথ চিনে আমি চললাম শহরের দিকে। তারপর কেটে গেছে বিষণœ তেরোটি বছর, আমি আর জন্মগ্রামের দিকে মুখ করিনি। হ্যা, তবে ডায়েরিটি সযতেœ রেখেছি বুকের কাছাকাছি যা আমাকে উষ্ণতা দিতো মায়ের আঁচলের মতো আর জিয়ন শক্তি দিতো অর্পিতার নিবিষ্টতার প্রতিরূপ। এভাবে আমি আমার তেরোটি বছর অতিক্রম করলাম, বলা যায় বেঁচে ছিলাম। এই বেঁচে থাকা আমাকে অন্তঃসারশূন্যতা শিখিয়েছে ফলে এ যাবৎ আমার ঘরসংসার হয়ে উঠেনি। আজও একা আছি। কোনো পিছুটান নেই, আজ মরলে কাল কেউ কাঁদার নেই। শুধু জানি অর্পিতা কাঁদবে এবং সে জেনে যাবে কেউ তাকে না জানালেও।
অর্পিতার জন্য আমার ভীষণ মন খারাপ হয়, শুধু তার জন্যই বেঁচে আছি। তার চোখের অশ্রু যে আমি পরপার থেকেও সইতে পারবো না এ কথা অনুধাবনে আমার বিন্দুমাত্র অক্ষমতা নেই। যাযাবর জীবন যাপন করছি। কি আর করতে পারতাম মেট্রিকের পর ঘর ছাড়া উন্মূল এক একাকী বিরহী? দুঃখে পাথর হয়ে গেলাম, তবু বেঁচে আছি। হাবিয়া হয়ে গেলাম তবুও পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব আছে। এ অস্তিত্বযাত্রায় নিজেকে এবার টেনে আনলাম নিজগ্রামে। দীর্ঘ তেরোটি বছর! এরই মধ্যে গ্রামের অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমার ভিটিটি নেই, নেই অর্পিতাদের ভিটিও। অর্পিতা যেখানটায় বসে থাকতো আমি এখন সেখানে বসে আছি। সামনের সবুজ প্রান্তরটি নেই। শুধু কালের সাক্ষী দেবদারু গাছটা ক্ষয়িষ্ণু জীবনের বোঝা নিয়ে প্রেমবিচ্ছেদের ছবি হয়ে বেঁচে আছে। আমি আমার বুকের কাছে অতিযতেœ রাখা অর্পিতার ডায়েরিটি বের করলাম।