নোবেলজয়ী আবদুলরাজাক গুরনাহ’র সাক্ষাৎকার

আপডেট: অক্টোবর ২২, ২০২১, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

অনুবাদ : বনিতা ইয়াসমিন :


এবছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ৭৩ বছর বয়সী তানজানিয়ার ঔপন্যাসিক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তিনি ১০টি উপন্যাস লিখেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : প্যারাডাইস (১৯৯৪), বাই দ্য সি (২০০১) এবং ডেজারশন (২০০৫)। ইতোপূর্বে তার উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’ বুকার প্রাইজের শর্টলিস্টে এবং ‘বাই দ্য সি’ লংলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গুরনাহর লেখায় ঔপনিবেশিকতার দুঃখ-দুর্দশা এবং শরণার্থীর কষ্টকর জীবনধারার গল্প উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি, ফ্রাঙ্কফুটে তার এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন ফেবিয়ান রোথ, মারা হোলজেনথল, লিসা জিংগেল।
প্রশ্ন : বিশ্বসাহিত্য, উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্য এবং গ্লে¬াবাল সাউথের মতো সাহিত্যের লেবেল সম্পর্কে আপনি কী ভাবছেন? আপনি কি মনে করেন এগুলো সাহিত্য বা একইসঙ্গে আপনার লেখা বিচারে উপযোগি কিছু? আপনি কি লেখক হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করার সময় এই মানদ-ে বিচার করেন কিনা?
আবদুলরাজাক গুরনাহ : লেবেল অবশ্যই দরকারি, প্রথমত, তা প্রাতিষ্ঠানিক কারণেই। কেউ তাদের বিদ্যায়তনে তুলনা করতে, বাণিজ্যিক কারণে বা প্রকাশনার স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। আপনি মানুষকে বোঝাতে পারেন এটি এমন একটি বিশেষ কিছু, যাতে তারা আগ্রহী হয়ে উঠবে। যাই হোক, আমি নিশ্চিত নই তাদের সাংগঠনিক উদ্দেশ্য ছাড়াও এগুলোর দরকার কতটুকু। নিজেকে বর্ণনা করার জন্য আমি এই মানদ- ব্যবহার করবো না, এগুলো সংস্কৃতি উৎপাদনের প্রক্রিয়া নয়। এইসব লেবেল সাহিত্যকে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রীতি-নির্ভর সমালোচনা করে এবং কিছু বলতে ও কিছু শনাক্ত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে এইসব লেবেল সাহিত্যের ব্যাখ্যাকে একপ্রকার সীমাবদ্ধই করে। কারণ সাহিত্যে বর্ণনার চেয়েও বেশি কিছু রয়েছে।
প্রশ্ন : তাহলে আপনি কি নিজেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক বা বিশ্বসাহিত্যের লেখক মনে করেন?
আবদুলরাজাক : আমি এইসব প্রপঞ্চের কোনোটিই ব্যবহার করব না। আমি নিজেকে কোনো ধরনের লেখক বলিও না। আসলেই আমি নিশ্চিত নই যে, আমি আমার নাম ছাড়া অন্য আর কী বলার আছে। আমি অনুমান করি, যদি কেউ আমাকে চ্যালেঞ্জ করে-‘আপনি কি একজন …এর মধ্যে একটি …?’ আমি সম্ভবত ‘না’ বলব। আমি চাই না আমার সঙ্গে কিছু জুড়ে থাকুক। অন্যদিকে এটি নির্ভর করে কিভাবে এই প্রশ্ন উত্থাপন করা হবে-উদাহরণ স্বরূপ যদি একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন ‘আপনি কি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক’, তখন তিনি প্রশ্নের উত্তরে তিনি কী লিখবেন? কিন্তু আমি তা নই। আমি এরমধ্যেরও জটিল একটা কিছু।

প্রশ্ন : এই বর্ণনা কি অপরিহার্য ?
আবদুলরাজাক : এটি এমন কোনো অপরিহার্য পদ্ধতি নয়, যা আমি নিজে মনে করি, কিন্তু সাংবাদিকের জন্য এই জিজ্ঞাসা অপরিহার্য হতে পারে। তিনি আমাকে তার বোর্ডে তর্জনী তুলে বলতে পারেন, উনি একজন বিশ্বসাহিত্যের লেখক। আমি ধারণাকে এভাবেই দেখি। এই ধরনের গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিহত করার একপ্রকার প্রাকৃতিক প্রবণতা রয়েছে, যেমন আমি আপনাকে এখন একটু জটিল করে উত্তর দিচ্ছি।
প্রশ্ন : আমাদের পরবর্তী প্রশ্ন পূর্ববর্তী প্রশ্নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত-বিশ্বসংস্কৃতি প্রায়শই দক্ষিণ এবং উত্তর গোলার্ধের সংস্কৃতি থেকে আলাদা। আপনি এই লেবেলগুলোকে কীভাবে দেখেন, বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে?
আবদুলরাজাক : পৃথিবী সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণ হিসেবে তৈরি করা হয়নি। তবে এটিকে এমন করে বর্ণনা করা ফ্যাশনেবল মনে হচ্ছে। ‘থার্ড ওয়াার্ল্ড’ বা ‘অনুন্নত বিশ্ব’-এর মতো বিভিন্ন শব্দ ব্যবহার করার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু উত্তর এবং দক্ষিণ শব্দ দুটি অন্যান্য শব্দের তুলনায় আরো চলনসই বলে মনে হচ্ছে। যাইহোক, এটিই বাস্তবতাকে বর্ণনা করে, ঐতিহাসিক পার্থক্য বর্ণনা করে এবং অবশেষে এটি অন্য আরেকটি কুৎসিত শব্দ ‘উপনিবেশবাদ’ থেকে পরিত্রাণ দেয়। তাই এই বিষয়গুলি সম্পর্কে কথা বলার জন্য উত্তর-দক্ষিণ শব্দ ব্যবহার করা ভালো। ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যকার এই পার্থক্যগুলো একীভূত করেছে এবং উপনিবেশিকতার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং সংহত সমস্ত ধ্যানধারণার কারণে আমি মনে করি এসব এখনও অব্যাহত আছে। তাই আমি বলতে চাই যে, হ্যাঁ, পার্থক্য আছে এবং উত্তর ও দক্ষিণ শব্দদুটি পুরোপুরি যথার্থ না হলেও, এই পার্থক্যগুলোর বর্ণনা করার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নিরপেক্ষ উপায় এই শব্দদুটির মধ্যে রয়েছে। আপনার এই শব্দদুটিকে স্থান হিসাবে বিবেচনা করা উচিত নয়: এগুলো মনোভাব, বোঝাপড়া, প্রত্যাশা প্রভৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই চিনের এমন কিছু অংশ থাকতে পারে যা পশ্চিমের মতো সমৃদ্ধ এবং কিছু অংশ সমৃদ্ধ নয়। এটা আসলে জায়গার বিষয় নয়। যখন আপনি নিরপেক্ষ বা মধ্যবর্তী থাকার চেষ্টা করেন, তখন এটি স্থানের দিক থেকে কিছুটা বিবেচনা করে। যখন ‘মধ্যবর্তী’ সত্যিই উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে নয়, কিন্তু এই দুটি লেবেলের মধ্যে এক ধরনের মধ্যবর্তী বা অনির্দিষ্টতা আছে। সেখানেই আমি মনে করি, আপনি নিজেকে উদার মানুষ হিসেবে ভাবেন, নিজেকে বিশ্বের মানুষ হিসেবে এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেন। যাইহোক, এখানে আসল পার্থক্য আছে-আসুন আমরা বলি আপনার জীবনের ধরন-আপনি যেই হন না কেন, আপনি উত্তর দিকেরই হন বা দক্ষিণ দিকেরই হন আমাদের জীবন ভিন্ন হবে, আপনি চান বা না চান। এই সংস্কৃতিতে রাষ্ট্র আপনাকে হাসপাতাল, স্কুলসহ নানান সেবা ও সুবিধা দিয়ে থাকে। কিন্তু অন্যান্য দেশে [অনুন্নত দেশ] তাদের কাছে এরকম কিছুই নেই, তাই এই জায়গাগুলির মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যার ফলে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহাসিক ঘটনা বিভিন্ন সমাজে ঘটেছে।
প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন ‘শরণার্থী সংকট’ অনেক পরিবর্তন এনেছে? যদি তথাকথিত দক্ষিণ দেশগুলোর লোকেরা জার্মানিতে আসে-উদাহরণ স্বরূপ, তারাও জার্মানির পরিবর্তন করে-যেমন অন্যান্য অনেক দেশ পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
আবদুলরাজাক : ঠিক আছে, আমি বলছি না যে সবকিছু চিরকালের মতো একই থাকবে; অবশ্যই সবকিছুর পরিবর্তন ঘটছে। অন্যদিকে, কী বা কারা পরিবর্তিত হবে বলে আপনি মনে করেন? যদি বলা যায়, এক মিলিয়ন শরণার্থী জার্মানিতে আসলো, কাদের বদলে যাওয়াার সম্ভাবনা বেশি- জার্মানির নাকি শরণার্থীর ? সুতরাং এই প্রশ্নে আমার মত হলো, কিছুটা হলেও এটি একটি পার্থক্য তৈরি করবে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ভবিষ্যতে যেকোনও প্রত্যাবাসনের একটি শর্ত : তারা সরাসরি ইংরেজি শিখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও এতে কোনো সমস্যা নেই, তবে এটাকে ইতোমধ্যে একটি শর্ত হিসেবে তৈরি করাই বলে দেয় যে, অন্যরা যখন এখানে আসবে তাদেরকে আমাদের মতোই হতে হবে।