নোবেলজয়ী পোলিশ লেখক ওলগা তোকারচুকের সাক্ষাৎকার : পরিযায়ী মানুষের আত্মপরিচয়

আপডেট: অক্টোবর ১৩, ২০১৯, ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ

কামরুল হাসান


ওলগা তোকারচুক বর্তমান পোলান্ডের লেখকদের মাঝে সম্ভবত সবচেয়ে প্রতিভাবান এবং নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত। গত বছরই তিনি ম্যান বুকার পুরস্কার জিতেছিলেন এবং সেই ২০১৮ সালের জন্যই পেলেন সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার- নোবেল প্রাইজ। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৬২ সালে পোলান্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় সুলেখোফ শহরে। বাবা ছিলেন গ্রন্থগারিক, শৈশব থেকেই বইয়ের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বড় হন। তিনি ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং একজন মনোসমীক্ষক হিসেবে প্রশিক্ষিত হন। কবিতার হাত ধরে সাহিত্যের আঙ্গিনায় পা রাখা তার প্রথম উপন্যাস দ্য জার্নি অব দ্য বুক-পিপল প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। তার রচনার সংখ্যা বিপুল নয়, কিন্তু মূল্যবান। এ পর্যন্ত নয়টি উপন্যাস ও কয়েকটি ছোটগল্প ও প্রবন্ধের বই লিখেছেন। তার সবচেয়ে আলোচিত বই দ্য বুকস অব জ্যাকব নয়শ পৃষ্ঠার এক মহাকাব্যিক উপন্যাস যার পটভূমি অষ্টাদশ শতকের পোলান্ড। নোবেল কমিটি ওলগা তোকারচুককে বলেছেন তার প্রজন্মের পোলান্ডের সবচেয়ে মেধাবী লেখক। তার লেখনি সম্পর্কে কমিটির উদ্ধৃতি ‘সীমারেখা ভেঙেচুরে চলা মানবজীবনের চিত্র গভীর মমতায়, কল্পনায় ও আগ্রহে তিনি তুলে ধরেছেন’। তোকারচুকের উপন্যাসের জগৎ সেসব যাযাবর মানুষদের নিয়ে রচিত যারা আত্মপরিচয় ও একটি আবাসভূমি খুঁজছে। বর্তমান দুনিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও দেশান্তরিত মানুুষের প্রেক্ষাপটে তার রচনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। নিম্নোক্ত সাক্ষাৎকারটি আবর্তিত হয়েছে মূলত তার ফ্লাইটস উপন্যাস ঘিরে, যে গ্রন্থের জন্য তিনি ম্যান বুকার পুরস্কার লাভ করেছিলেন। অনূদিত এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল ঞধহশ গধমধুরহব নামক এক সাহিত্য সাময়িকীতে ২০১৮ সালে গ্রীষ্ম সংখায়। জ্যা-পিটার ওয়েসটাডের নেয়া সাক্ষাৎকারটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।
অনুবাদ : কামরুল হাসান

জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আমি আপনার উপন্যাস ফ্লাইটস দিয়ে শুরু করতে চাই। এ উপন্যাসটি ক্রমাগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে, আর মনে হয় এর শিরোনামটিও ভাষান্তরে বদলে যায়। আমি যখন এই বইটি প্রথম নরওয়েজিয় ভাষায় দেখি, তখন এর শিরোনাম অনুবাদ করা হয়েছিল রানারস, আর ধারণা করি পোলিশ ভাষায় নিশ্চয়ই এর শিরোনামটি ভিন্নতর।
ওলগা তোকারচুক : পোলিশ শিরোনাম হচ্ছে বাইগুনি, এই বইয়ে যে জনগোষ্ঠির উপস্থিতি রয়েছে তার নাম সেটি। আপনার মনে আছে? সপ্তদশ শতক থেকে একটা রুশ উপজাতি ছিল যারা বিশ্বাস করতো মানুষদের অবশ্যই সর্বদাই চলাচলের ভেতর থাকা উচিৎ, কেননা, থেমে গেলেই শয়তান তাদের পাকড়াও করবে। তাদের কাছে পরিব্রাজ্যা ছিল একধরনের প্রার্থনার মতো, আর এটা আমার কাছে সাম্প্রতিক সময়ের পরিব্রাজকদের একটি প্রতিকী চিত্রকল্প বলে মনে হয়েছে।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আমার ভালো লেগেছে কী করে বিমানবন্দরটি- যে স্থান দিয়ে আপনার উপন্যাসের আত্মজীবনী বয়নকারীগণ যাতায়াত করেছে, আপনার বর্ণনাসমূহের একটি কেন্দ্রীয় হাব হিসেবে কাজ করেছে। আধুনিক ভ্রমণের কোন বিষয়টি আপনাকে এত বেশি টানে?
ওলগা তোকারচুক: আধুনিক ভ্রমণের সবকিছু এই বইতে ধরা আছে- কোনো কিছু এড়িয়ে যাওয়া, পলায়ন। আবার আঙ্গিকের একটি বর্ণনা হিসেবেও এটি কাজ করে। এটি কোনো সরলরৈখিক কাহিনী নয়, বরঞ্চ আমি এ উপন্যাসকে বলি, কাহিনীসমূহের এক পুঞ্জিভুত রূপ।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : পুঞ্জিভত ঘটনার উপন্যাসের ধারণা সম্পর্কে আমি আগেও শুনেছি। এ সম্পর্কে একটু বিস্তারিতভাবে বলবেন?
ওলগা তোকারচুক : আমি উপন্যাসটিকে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া বলে মনে করি। যখন আমরা কোনো উপন্যাস পড়তে শুরু করি, এটা এমনভাবে আমাদের এমন এক অনুভূতি দেয় যেন আমাদের মনের সম্মুখে একটি জায়গা খুলে গেছে। পরের দিন বিকেলে যখন আমরা পুনর্বার উপন্যাসটির কাছে ফিরে আসি আমরা আমাদের মনের ভিতর সেই একই জায়গায় ফিরে আসি। এই প্রক্রিয়ার প্রধান স্রষ্টা পাঠক, লেখক নন। লেখক হিসেবে আমার কাজ হলো আমার পাঠকদের অভিজ্ঞতা অর্জনের ও টেক্সট পাঠের একটি জায়গা তৈরি করে দেওয়া। তাদের অনেকেই আমার চেয়ে অনেক বেশি বুদ্ধিমান, তাই আমি সুখি যে তারা এই নক্ষত্রপুঞ্জের মতো ছোটগল্প, চিহ্ন, ছবি, দৃশ্য এবং অন্যান্য কিছু নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নেন। রাতের আকাশে নক্ষত্র দেখে এই চিত্রকল্পটি আমার মনে এসেছে। নক্ষত্রসমূহ, অতি অবশ্যই পুরোপুরিই অগোছালো, এলোমেলো, কিন্তু আমাদের মস্তিস্ক, আমাদের ইন্দ্রিয়জ ধারণা একটি চিত্র তৈরি করে। এইসব চিত্রের কিছু আমরা পেয়েছি পৌরাণিক কাহিনী থেকে, আবার এইসব চিত্রের কিছু আমাদের মস্তিষ্ক ওইসব বিন্দুকে জুড়ে দিয়ে যে শৃঙ্খলা খুঁজে পেয়েছে তা থেকে সৃষ্টি। মহৎ উপন্যাসের সময় উনবিংশ শতকের মানুষদের আমরা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ভিন্নরূপে দেখি। বাস্তবকে আমরা কোনো সরলরৈখিক কাহিনী বলে মনে করি না, বরং কম্পিউটারে আমরা যে উইনডোজ নিয়ে কাজ করি, তার মতো দেখি। আমরা ক্রমাগত জানালা খুলছি আর ঝাপিয়ে পড়ছি অন্য সব জানালায়, তৈরি করছি এক নতুন ধরনের শৃঙ্খলা। এই হলো আমাদের বাস্তবের অভিজ্ঞতা, যা আমি ওই আঙ্গিকে ধারণ করার চেষ্টা করছি।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : এক অর্থে, এ হলো আপনার ফ্লাইটস উপন্যাসের অভিজ্ঞতা, পেছনদিকে লাফিয়ে পড়ে সেই গল্প বলা যা আপনি প্রথম লিখেছিলেন ২০০৭ সালে। উপন্যাসটি সম্পর্কে আপনার ধারণা কি এখন বদলেছে?
ওলগা তোকারচুক : এটা ছিল আমার জন্য কঠিন কাজ, কেননা আমি এর পরে দ্য বুকস অব জ্যাকব, যাকে আমার শ্রেষ্ঠ কীর্তি (ম্যাগনাম ওপাস) বলে মনে করা হয় এবং আরো একটি বই লিখেছি। আমি এখন আমর জীবনের একটি আলাদা পর্যায়ে রয়েছি। আমার ইচ্ছা ফ্লাইটস যদি আরও একটু সাম্প্রতিক হতো। যেমন ধরা যাক, উপন্যাসটিতে কোনো শরণার্থী নেই। আমি যদি ওই উপন্যাসটি আজ লিখতাম তবে এই গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাদায়ক বিষয়টি, যা ১২ বছর আগে এখনকার এইরূপে ছিল না, তা অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতাম। সুতরাং, আমার মনে হয়, এ বইতে কিছু একটার ঘাটতি রয়েছে।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আমার মনে হয় যদি ভিন্নভাবে ভাবি তাহলে ফ্লাইটসে বর্তমান সময়ের স্পন্দন রয়েছে। আপনি যেরকম বিস্তারিতভাবে ক্ষুদ্র ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতাকে ফুটিয়ে তোলেন তা আমাকে প্রায়শই খুব সুক্ষè, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভেতর নিয়ে যায়। সিঁড়ি, কিংবা হোটেল লবি বা অভ্যর্থনা ডেস্ক- যে কোনো জায়গার বা যে কোনো কিছুর যে বর্ণনা আপনি দেন তা আমি ভালোবাসি। মনে হয় সেসব মুহূর্তে ঘটনাসমূহ যেভাবে ঘটছে তা আপনি ধারণ করছেন এবং সেভাবেই বর্ণনা করছেন। এখনো কি আপনি ওভাবেই লেখার পরিকল্পনা করছেন?
ওলগা তোকারচুক : হ্যাঁ, আমি সব জায়গায় নোট নেই। লেখালেখিও একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া। আমি যখন একটি বই লিখি, তখন আমি সেই বইটির সমগ্র স্পেসে, তার দুনিয়ার ভেতর ডুবে যাই। আমি যখন এই প্রক্রিয়ার ভেতর থাকি তখন আমার প্রত্যক্ষ করা প্রতিটি বস্তু দরকারি হয়ে পড়ে। সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ। আমি ছোট ছোট নোট নিতে থাকি: বাড়ি ফিরে আসার পরে আমি এই সকল নোটস জড়ো করে সাজাতে থাকি।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আপনার লেখার ভেতর খুব শক্তিশালী ঐতিহাসিক দিকও রয়েছে। আমি শুনেছি আপনি বলেছেন, “সাহিত্য হলো পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণের বিষয়,” আর আপনার গবেষণালব্ধ বিষয় অন্য এক ধরনের যাত্রায় (সাহিত্যে) তুলে রাখেন।
ওলগা তোকারচুক : যেসব বইয়ে পুঙ্খনাপুঙ্খ বিবরণ নেই সেসব বই আমাকে টানে না; অভিযাত্রী মানুষের কাহিনী যেখানে ক্ষুদ্র সকল বিষয়ের, যেমন যে-ধরনের চেয়ারে তারা বসে, বা যে-ধরনের বস্ত্র তাদের পরিধানে, তার বর্ণনা ছাড়া পড়তে ভালো লাগে না। পাঠক হিসেবে প্রতিটি গ্রন্থকে আমি একটি বিপুল সংবেদনশীল অভিজ্ঞতা হিসেবে পাই, এবং আমাকে জানতে হয় টেক্সটের প্রকৃত ও বাস্তব দুনিয়াটি কী রকম! যখন দ্য বুকস অব জ্যাকব লিখছিলাম, তখন অষ্টাদশ শতকের পোলান্ড, যে পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত, আর খুঁটিনাটি ও সুক্ষè বিষয় নিয়ে অবসেসড ছিলাম। সেসময়ের লোকেরা দেখতে কেমন ছিল বা তারা কী খেত, এটা না জেনে আমি একটি দৃশ্য রচনা করতে পারতাম না। সেটা ছিল এক বিপুল গবেষণার শুরু, এবং স্বীকার করবো, অতি অবশ্যই অনেক ভুল ছিল। আমার মনে আছে একটি দৃশ্যের কথা, যেখানে একদল নারী বসে আছে, সেলাই করতে করতে তারা পরস্পরের সাথে কথা বলছে। সেখানে একটি মনোহর বাক্য আছে, তাদের সূচের উপর মোমবাতির আলো চমৎকারভাবে প্রতিফলিত হয়ে পড়েছে, তা নিয়ে। বাক্যটি লেখার পরেই আমার মাথার ভেতর একটি সতর্কঘণ্টা বেজে উঠেছিল, আমি অনুসন্ধান করে পেলাম যে ওই সময়ে তারা ধাতব সূঁচ ব্যবহার করেনি, তখন ছিল কেবল কাঠের সূঁচ। আমাকে তখন ওই দৃশ্যের পুরো বর্ণনাটি পাল্টাতে হয়েছিল। এটি একটি তুচ্ছ বিষয়, কিন্তু আমি আমার কল্পনায় নেই জগৎটিকে পুনর্গঠন করার চেষ্টায় আনন্দ খুঁজে পাই।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আমি অনুমান করতে পারি যে ফ্লাইটস লেখার জন্য শরীরবিদ্যার ইতিহাস নিয়ে গবেষণা খুব তৃপ্তিকর অভিজ্ঞতা ছিল। আপনি একই প্রকার আগ্রহ নিয়ে লোকদের জানার চেষ্টা করছেন, তাদের বিস্তারিত বিবরণসহ।
ওলগা তোকারচুক : সে ছিল সত্যিকারের এক আনন্দ। আমি ঐতিহাসিক শরীরবিদ্যা নিয়ে অবসেসড ছিলাম, বিশেষ করে মানবশরীর সংরক্ষণ বিষয়ে গভীর আগ্রহ ছিল। সে সময়ে আমি হল্যান্ডে আবাসিক লেখকের মর্যাদায় ছিলাম, সুতরাং সবকিছু পরীক্ষা করার এক সুবর্ণ সুযোগ আমার ছিল। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন শরীরবিদ্যার যাদুঘরে কাটিয়েছিলাম, গুন্থার ভন হাজেনের প্রতিটি প্রদর্শনী দেখেছি। নিজের অবসেসনকে অনুসরণ করা সবসময়েই ভালো। এটা একটি উপন্যাস লেখার জন্য চমৎকার শক্তি যোগায়।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : এটা এসে যায়। শরীরের দৈহিক সংরক্ষণ ও মনের প্রতি মনোযোগ দেবার একটি টেনশন আগাগোড়াই ফ্লাইটসের ভেতর কাজ করেছে। আপনি কী করে আপনার উপন্যাসের চরিত্রসমূহের অন্তস্থ বিষয়গুলো লেখেন?
ওলগা তোকারচুক : আমার মনে হয় এক্ষেত্রে সহমর্মিতা হচ্ছে যথোপযুক্ত শব্দ। যখন আমার মনে একটি চরিত্রের খসড়া এসে উপস্থিত হয়, তখন পরবর্তী পদক্ষেপ হয় তার চোখ দিয়ে দুনিয়াকে দেখার চেষ্টা করা। তখন আমি এই মানুষটির ভেতরের আত্মাকে অনুভব করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক, ড্রাইভ ইউর প্লাউ ওভার দ্য বোনস অব দ্য ডেড গ্রন্থে, যেটি সেপ্টেম্বরে ইংরেজিতে প্রকাশিত হবে, একজন বয়স্কা নারী আছেন যিনি একজন লড়াকু প্রতিবাদী নারী। তার প্রতি সহমর্মিতা দিয়ে আমি অনুভব করলাম কোনো কোনো আবেগ, যেমন ক্রোধ ও অতৃপ্তি, আমার মধ্যে সঞ্চারিত হচ্ছে। এটি একেবারেই একটি আবেগগত প্রক্রিয়া, যা কখনো কখনো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। আমি আমার ই-মেইল তার কণ্ঠস্বর ও ভাষায় লিখতে শুরু করলাম। ফ্লাইটসে আমি বলেছি, লেখালেখি হচ্ছে, “একটি নিয়ন্ত্রিত পাগলামি।”
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড: এটা আমার পছন্দ হলো। আমার মনে পড়লো আপনার একটি অসাধারণ সংক্ষিপ্ত দার্শনিক চিত্রকলাসমৃদ্ধ লেখার কথা, যা একইসঙ্গে বাস্তবতাকে অনুধাবন করার ভারসাম্য টলিয়ে দেয়। একটা উদাহরণ আমার সবসময়েই মনে পড়ে, যখন একজন প্রকৃতিবিজ্ঞানী জানতে পারে যে মাইটোকন্ড্রিয়া জীবের শরীরের মধ্যে বাধা পড়ার আগে, নিজেরাই স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ধারণ করতো।
ওলগা তোকারচুক : নিজের সম্পর্কে বলতে পারি, আমি একজন চিন্তাশীল মানুষ। আমার কাছে চিন্তা করার অর্থ হলো সঠিক প্রশ্নগুলো করতে পারা, দ্বৈত বা দুটো বিপরীত উত্তর সত্য হতে পারে এমন প্রশ্ন, প্রাত্যাহিক জীবনের কৌতুহলগুলোতে ব্যপৃত থাকা। ফ্লাইটস উপন্যাসে আমি সেই ক্ষণটি পছন্দ করি যখন উপন্যাসের নায়িকা বিলবোর্ডে লেখা একটি মেসেজ দেখতে পায় যেখানে লেখা, “যিশু এমনকি তোমাকেও ভালোবাসে”। তখন সে বলে, “কী? কেন সেখানে লেখা ‘এমনকি’? এর অর্থ কী?” এই একটি বাক্যে একটি গোটা কাহিনী বলা আছে। এটি একটি সহজ প্রশ্ন, কিন্তু তা আপনাকে অস্বস্তিতে ফেলবে।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : এরপরে আছে সেইসব ভ্রমণ মনঃস্তত্ত্ববিদগণ যারা বিমানবন্দরের লাউঞ্জে বসে সঙ্গী ভ্রমণকারীদের জ্ঞান বা উপদেশ দেয়। ভ্রমণকারীরা হচ্ছে সবচেয়ে ভালো কিংবা সবচেয়ে বাজে শ্রোতা। তারা ভ্রমণের মাঝেই তাদের মনকে ধরে রাখে আর বক্তৃতার মাঝপথে ফ্লাইট ধরার জন্য চলে যায়। বইটি কত প্রকার কাল্পনিক উপায়েই না এইসব বিপরীতমুখিন সত্যকে ধরার চেষ্টা করেছে।
ওলগা তোকারচুক : আমি মনে করি এই মনঃস্তত্ত্ব থাকা উচিৎ, কেননা এটি আমাদের সময়ের দুনিয়াকে বর্ণনা করার এ্কটি উপায়। আমাদের প্রয়োজন আর একটি নতুন ধরনের মনঃস্তত্ত্ব, যা বিষয়বস্তুকে তার গতির ভেতরেই ধারণ করার চেষ্টা করবে, একটি স্থির প্রেক্ষাপটে প্রতিস্থাপন করে নয়। আমরা সবসময়েই গতির ভেতর, চলাচলের মধ্যে আছি আর আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন উল্টো-দার্শনিকতা যাতে এই নতুন উলম্ফনযুক্ত, বিভক্ত হয়ে পড়া পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে পারি। আমরা ইন্টারনেট থেকে নতুন জ্ঞান আহরণ করতে পারি, কিন্তু এই জ্ঞান খুব বিশৃঙ্খল ও ভাসাভাসা। সাধারণ ঐক্যসূত্রে পৃথিবীকে জানার কোনো উপায় আমাদের কাছে নেই। এই অভিজ্ঞতাকে অর্থপূর্ণ করে তোলার সম্ভাবনা একমাত্র উপন্যাসের আছে। সাহিত্য ঘটনাকে, নিত্যদিনের ঘটনাকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত করতে পারে। এ ছাড়া আমাদের কাছে কিছু খণ্ড খণ্ড তথ্য আছে, যাদের কোনো অখণ্ড অর্থ নেই।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আমি অনুভব করি ভ্রমণের একই প্রকার প্রভাব রয়েছে।
ওলগা তোকারচুক : হ্যাঁ, আমি মনে করি ভ্রমণ মনের একটি বিশেষ অবস্থা নির্দেশ করে, বিশেষ করে কেউ যদি একাকী ভ্রমণ করে। অন্যদের সঙ্গে ভ্রমণ, যেমন প্রেমাস্পদের সাথে, স্বামী বা স্ত্রী কিংবা সন্তানদের সাথে ভ্রমণের অর্থ হলো আপনি পিঠে করে একটি গোটা পরিবারের ভার বহন করে চলেছেন। একাকী ভ্রমণ মানে আপনি একা, আর কেউ নয়, এবং আপনার চোখ দিয়ে পৃথিবীকে প্রত্যক্ষ করা। আপনি চতুর্পার্শ্বের প্রতি অনেক বেশি সংবেদনশীল ও উন্মুক্ত।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : আমার ধারণা ফ্লাইটসে বেশ কিছু স্মরণযোগ্য মুহূর্ত তৈরি হয়েছে যখন চরিত্রসমুহ তাদের স্ব স্ব দেশে থেকে আসা ভ্রমণকারীদের চিহ্নিত করতে পেরেছিল। কোনো কোনো চরিত্রের জন্য এটা ছিল স্বস্তির, কিন্তু মাঝে মাঝে তা ছিল একটি বোঝার মতো, আর তারা এর পরিপ্রেক্ষিত এড়িয়ে যেতে চেয়েছিল। বর্ণনাকারী ব্যাখ্যা করছিল একজন বয়স্কা নারী হিসেবে সে কীভাবে অনেকের কাছেই অদৃশ্য হয়ে ছিল, কিন্তু এটা যে মুক্তিকামিতার প্রকাশ তা বোঝা যায়। আপনি কেন এ ধরনের একটি অবস্থান চান?
ওলগা তোকারচুক : এটা একটি মজার প্রশ্ন, বিশেষ করে এই গ্রন্থে সন্নিবেশিত নারী ও পুরুষ চরিত্রের মধ্যকার ভিন্নতার প্রসঙ্গে। আমি মনে করি আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল দ্বারা চিহ্নিত ও সংজ্ঞায়িত হই। আমরা ক্রমাগত আমাদের সম্পর্কে অন্যদের মতামত কী তার দ্বারা সংজ্ঞায়িত হই। সুতরাং আপনি যখন নিরুদ্দিষ্ট হন, তখন অনেক বেশি মুক্ত থাকেন। আত্মপরিচয় সম্পর্কিত প্রশ্নের চিন্তা আমাকে নার্ভাস করে। কীভাবে আমরা আমাদের পরিচয় দিতে পারি? বাইরে থেকে বর্ণনা করা বস্তু হিসেবে আমাদের কতটুকু অস্তিত্ব রয়েছে? নিজেদের পরিচয় সৃষ্টি করার কোনো ক্ষমতা কি আমাদের আদৌ আছে? আমি মনে করি ভাষা একটি বড় ফ্যাক্টর। কখনো কখনো আমি যতক্ষণ পর্যন্ত না মুখ খুলি এবং কিছু বলি আমাকে পোলিশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় না। আমি সত্যি সত্যি সেসব লোকদের প্রশংসা করি যারা ভাষাকে বদলে দিতে পারে। তখন তাদের দুটি পরিচয় সৃষ্টি হয়, ভিন্ন দুটি পরিচয়। তারা তখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।
জ্যা-পিটার ওয়েসটাড : এ থেকে আমি যা বলতে পারি তা হলো ফ্লাইটসে যেরকম যাযাবর জনগোষ্ঠির পরিচয় খোঁজা হয়েছে, তার বিপরীতে দ্য বুকস অব জ্যাকব গ্রন্থে খুব নির্দ্দিষ্ট করে পোলিশ জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের ইতিহাসটি তুলে ধরা হয়েছে। আমি কি সঠিক বলেছি?
ওলগা তোকারচুক : হ্যাঁ, একদিক দিয়ে দেখলে দুটো উপন্যাস একই বিষয়– আত্মপরিচয় নির্ধারণ নিয়ে লেখা। ফ্লাইটস হলো একটি ক্ষুদ্র ইহুদি জনগোষ্ঠির কাহিনী যারা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটি এমন এক জনগোষ্ঠির গল্প যারা যাযাবর প্রকৃতির, সর্বদাই ঘুরে বেড়ায় কিন্তু বসতি গেড়ে থিতু হবার জন্য একটি স্থান খুঁজে বেড়াচ্ছে। নিজেদের পরিচয় পুরোপুরি বদলানো যে কতটা কঠিন- এ গল্প তারও। এটা ভিন্ন ভিন্ন মানুষদের সময়ের ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখা হতে পারে, কিন্তু দ্য বুকস অব জ্যাকবের মূল বিষয়টি ফ্লাইটস-এর মূলের সাথে মিলে যায়, এবং সম্ভবত আমার সকল গ্রন্থের মূল বিষয় এগুলোই- আত্মপরিচয়, দেশান্তর ও পরিভ্রমণ।
(বিডিনিউজ২৪ডটকম এর সৌজন্যে)