নৌকায় ভোট দিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন || রাজশাহী চিনিকল মাঠে জনসমুদ্রে শেখ হাসিনা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৭, ১২:১৬ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


চিনিকল মাঠে জনসমুদ্রে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপরে আ’লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম,যুগ্মসম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক ও এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনসহ নেতাকর্মরিা-সোনার দেশ

হরিয়ান চিনিকল মাঠের বিশাল জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য আমি রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ। আপনারা আবার নৌকায় ভোট দিয়ে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন বলে বিশ্বাস করি। রাজশাহী বিভাগের সব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিজয়ী করুন। পাশাপাশি রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে জয়যুক্ত করে রাজশাহী নগরীর উন্নয়ন অব্যাহত রাখুন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজশাহীতে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ অর্থনৈতিক জোন এ অঞ্চলের কৃষি ও শিল্পের বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে রাজশাহীর রেশম শিল্পের উন্নয়নে কার্যকরি উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। আমার কাছে দাবি করার প্রয়োজন নেই। উন্নয়ন কীভাবে করতে হয় তা আমি জানি। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর উপকণ্ঠ রাজশাহী সুগার মিল মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সারাদেশের উন্নয়নের জন্য ব্যাপকভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমি জাতির পিতার মেয়ে, আমি জানি দেশের উন্নয়ন কীভাবে করতে হয়।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নয়ন হয়। আর বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে দেশে সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, বাংলা ভাইয়ের জন্ম হয়। মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে যায়। এমনকী জনগণের টাকা, এতিমখানার টাকা- সে টাকাও তারা চুরি করে খায়।
প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, বিএনপি সরকারের আমলে একজন প্রতিমন্ত্রীর নিজের লাভের কারণে একটি মোবাইল ফোনের দাম নিয়েছেন এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। তখন মোবাইলে কথা বলতে প্রতি মিনিটে খরচ হতো ১০ টাকা। আওয়ামী লীগ সরকার মোবাইলের দাম হাজার-বারশো টাকায় নামিয়ে এনেছে। এখন মানুষ সস্তায় কথা বলতে পারছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তার লক্ষ্য- দেশে শান্তি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জাতির পিতার ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তাই উত্তরবঙ্গে এখন আর কোনো মঙ্গা নেই। রাজশাহীর উন্নয়নে যা যা করা দরকার তার সবই করবে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে ১১০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছে তার সরকার। রাজশাহীতেও এই বিশেষ অর্থনৈতিক জোন স্থাপন হবে। ইতোমধ্যে সরকার এখানে আইটি পার্ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। সেখানে কম্পিউটার, ল্যাপটসহ নানা ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন হবে। এ অঞ্চলের কৃষি নিয়ে আরও বেশি গবেষণা করতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েরও সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তার সরকার কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ২০ প্রকারের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করছে। বিনা পয়সায় দেয়া হচ্ছে বই। দেশের এক কোটি ৭৩ লাখ শিক্ষার্থী এখন সরকারের বৃত্তি পাচ্ছে। এক কোটি ৩০ লাখ মায়ের মোবাইলে চলে যাচ্ছে বৃত্তির টাকা।
প্রধানমন্ত্রী তার ৩০ মিনিটের ভাষণে সরকারের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন জনসভায়। ২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই মেয়াদে রাজশাহীর কি কি উন্নয়ন হয়েছে, তাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি আগামীতেও নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের স্থান নেই। বিএনপি-জামায়াত-জোট রাজশাহীকে সন্ত্রাসের জনপদ তৈরির চেষ্টা করেছিল। বাংলা ভাইকে মাঠে নামিয়ে এ অঞ্চলের অসংখ্য শান্তিপ্রিয় মানুষকে হত্যা করেছে। আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে জামায়াত-বিএনপি রাজশাহী অঞ্চলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের খুন করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিরোধ করেছে। সাধারণ মানুষের প্রতি আওয়ামী লীগের সমর্থন অব্যাহত আছে। গণমানুষকে নিয়েই বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস কঠোর হস্তে দমন করা হবে।
তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন চাইলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদেরই ভোট দিয়ে বিজয়ী করতে হবে। এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ঘর তৈরি করে দিবে সরকার। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোও দ্রুত মেরামত করা হবে। সেসব সড়ক সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া কেউ যেন জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য অভিভাবক, শিক্ষক ও মসজিদের ইমামদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
জনসভায় বিএনপি-জামায়াত জোটের হামলায় নিহত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ইউনূস. ড. আবু তাহের, শফিউল আলম, রেজাউল করিম সিদ্দিকী, রাজশাহী অঞ্চলের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী, পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থসহ সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বিএনপি-জামায়াতের ক্যাডারদের হামলায় নিহত হয়েছেন, তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হবে। করা হবে বিচারের মুখোমুখি।
বিকেল তিনটায় রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান চিনিকল মাঠে জনসভায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জনসভাস্থলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মঞ্চে উঠে হাত নেড়ে জনসভায় আগতের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। বিকেল ৩টা ৩৫ মিনিটে ভাষণ শুরু করে ৪টা ৫ মিনিটে শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী। ৩০ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের আমলে রাজশাহীর উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর এই জনসভা উপলক্ষে দুপুরের আগেই নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় চিনিকলের মাঠ। তুমুল বৃষ্টি উপেক্ষা করে দুপুর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করেন দূর-দূরান্ত থেকে যাওয়া নেতাকর্মীরা।
এর আগে সকালে তিনি জেলার চারঘাট উপজেলার সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাকাডেমির একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন।
জনসভায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট বাংলা ভাইয়ের মাধ্যমে রাজশাহী অঞ্চলে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি করেছিল। এ বাংলা বাহিনীর হাতে অসংখ্য মানুষ খুন হন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাজশাহী অঞ্চল শান্তির জনপদে পরিণত হয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য।
তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ২০১৪ সালে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছে। নির্বাচন বন্ধের জন্য তারা আগুন সন্ত্রাস করেছে। বাস পুড়িয়েছে। সরকারি সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আগামি নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর আছে। আর একারণে খালেদা জিয়া লন্ডনে বসে তার পুত্র তারেককে নিয়ে আবারো ষড়যন্ত্রের চেষ্টা করছে। কিন্তু খালেদা ও তার পুত্রকে যেকোনো ষড়যন্ত্রের সমূচিত জবাব দেয়া হবে।
সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও রাজশাহী মহানগর সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এক কোটি বাঙালি ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভারত আমাদের সহমর্মিতা জানিয়েছিল। একইভাবে মায়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মায়ের মমতা ও বোনের ভালোবাসা দিয়ে তাদের আশ্রয় দিয়েছেন। শেখ হাসিনা যে মানবিক নেতা, রোহিঙ্গা আশ্রয় দিয়ে তা আবারো প্রমাণ করলেন।
লিটন বলেন, রাজশাহীর মানুষ আগামি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকায় ভোট দেবেন। কারণ বিগত সময়ে সাধারণ মানুষ দেখেছেন আওয়ামী লীগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়েই রাজশাহী অঞ্চলের সবকটি সংসদীয় আসন এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি শেখ হাসিনাকে উপহার দেয়া হবে।
জনসভায় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ছাড়াও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাংসদ ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাংসদ আয়েন উদ্দিন প্রমূখ।
পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলীর সভাপতিত্বে জনসভায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিএম মোজাম্মেল হক, রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, সাংসদ এনামুল হক, আবদুল ওয়াদুদ দারা, বেগম আখতার জাহান, রাজশাহী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী সরকার, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন আসনের সাংসদ এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন জেলার শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী যেসব প্রকল্প উদ্বোধন করেন তার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদফতরের নবনির্মিত অফিস, বাগমারা উপজেলা কমপ্লেক্সের সম্প্রসারিত প্রশাসনিক ভবন ও হল রুম, রাজশাহীর পবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ কাজ, মহানগরীর টিকাপাড়ায় আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রকল্পের আওতায় ছয়তলাবিশিষ্ট সিআরএইচসিসি (কম্প্রিহেনসিভ রিপ্রোডাক্টিভ হেলথ কেয়ার সেন্টার) নির্মাণকাজ, তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও নগরীর বনলতা বাণিজ্যিক এলাকা সম্প্রসারণ এবং আবাসিক এলাকা উন্নয়ন।
এ ছাড়া একই সময় প্রধানমন্ত্রী আরও বেশকিছু প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রকল্পগুলো হলো: রাজশাহীর পদ্মা নদীর সোনাইকান্দি থেকে বুলনপুর পর্যন্ত এলাকা রক্ষা প্রকল্প, পদ্মাপাড়ে ৩১ দশমিক ৬৩ একর জমির ওপর ২৮১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে হাইটেক পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর, রাজশাহী মহানগরীর তালাইমারী মোড়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্কয়ার নির্মাণ, রুয়েট থেকে রাজশাহী সিটি বাইপাসের খড়খড়ি পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ