নৌকা পেয়েও অস্বস্তিতে বাদশা নেই ১৪ দলের কেউ, কর্মীরও সঙ্কট

আপডেট: ডিসেম্বর ২৬, ২০২৩, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


টানা চতুর্থবারের মতো নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। ২০০৮ সালে নৌকা নিয়ে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পর থেকে তিনি এই আসনের সংসদ সদস্য। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তার সাথে জোটের অন্য নেতাদের দুরুত্ব সৃষ্টি হয়েছে। এবার এই আসনে ভোট করছে ১৪ দলের শরীক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল মাসুদ শিবলী। আছে জাতীয় পার্টিরও প্রার্থী। একই সাথে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বি হয়েছেন শফিকুর রহমান বাদশা। তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। এরা কেউ এবার ফজলে হোসেন বাদশাকে ছাড় দিতে রাজি নয়।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নৌকার পক্ষে কাজ করেছিলেন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের শরীকরা। কিন্তু এবার তার ব্যতিক্রম। নিজ দলের গুটি কয়েক নেতাকর্মী বাদে কেউ পাশে নেই বাদশার। ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বের হয়ে বেশ কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী শফিকুর রহমান বাদশাকে সমর্থন দিয়েছে। তারা কাঁচি প্রতীকের পক্ষে প্রচারণাও চালাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণার ৭ দিন পার হয়ে গেলেও মাঠে দেখা যায়নি আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মীকে। তিনি নিজ দলের ৫০ জন নেতাকর্মী নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ১৮ ডিসেম্বর থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারে মাঠে নামে। ব্যত্যয় ঘটেনি সদর আসনে নৌকার টিকেট পাওয়া বাদশার ক্ষেত্রেও। তিনি ওয়ার্কার্স পার্টির নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে গত ৬ দিন থেকে নির্বাচনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তবে শুরু থেকেই তার সঙ্গে ছিলো না স্থানীয় আওয়ামী লীগের একজন নেতাকর্মীও।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল, সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশাসহ বেশ কয়েকজন নৌকার টিকেট চেয়ে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করেছিলেন। কামালকে নৌকার টিকেটও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জোট রক্ষার স্বার্থে হাইকমান্ড শেষ পর্যন্ত ওয়ার্কার্স পার্টির বাদশাকেই নৌকা দিয়েছে। তবে হাল ছাড়েননি নগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশা। ঘোষণা দেন তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সদর আসনে নির্বাচনে লড়বেন।

ঘোষণা অনুযায়ী, ‘কাঁচি প্রতীক’ নিয়ে সদরে ফজলে হোসেন বাদশার নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে নির্বাচনী মাঠে লড়ছেন। আর তাকে জয়ী করতেই একাট্টা হয়ে মাঠে নেমেছে মহানগর আওয়ামী লীগসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

জানা গেছে, ১৮ ডিসেম্বর প্রচার শুরুর পর রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নৌকা প্রতীকের প্রার্থী বাদশার পক্ষে কেউ প্রচারণায় নামেননি। তারা সমর্থন দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশাকে।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর ধরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফজলে হোসেন বাদশার শীতল সম্পর্ক চলছে। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, বাদশা একটানা ১৫ বছর রাজশাহী-২ আসনের সংসদ-সদস্য। গত তিনটি নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়ে সংসদে গেছেন। কিন্তু শেষ পাঁচ বছর বাদশা সচেতনভাবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন। সভা-সমাবেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। কখনওবা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। বাদশার এসব বক্তব্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফলাও হয়ে প্রচার হয়েছে। এতে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নেতাকর্মীদের মাঝে বেড়েছে ক্ষোভ।

সূত্রমতে, এবারও নৌকা প্রতীক পাওয়ার পর প্রথমদিকে বাদশা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেননি। এমনকি রাসিক মেয়র লিটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ পর্যন্ত করেননি। বাদশা কেবল মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠিয়ে লিটনের কাছে নির্বাচনে সমর্থন চেয়েছেন। ২১ ডিসেম্বর রাজশাহী মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু ও সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ প্রামাণিক দেবু মেয়র লিটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নৌকাকে জেতাতে ভূমিকা রাখার অনুরোধ করেন। এ সময় মেয়র লিটন নৌকাকে জেতাতে সর্বাত্মক চেষ্টার আশ্বাস দেন। কিন্তু এরপরও রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নৌকামুখী হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে বাদশা প্রশ্নে আওয়ামী লীগের মাঠের নেতাকর্মীরা দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নির্দেশকেও আমলে নিচ্ছে না।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নৌকাবিমুখ হওয়ার বিষয়টি ফজলে হোসেন বাদশা ইতোমধ্যে ১৪ দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুকে জানিয়েছেন। পরে আমু রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের বাদশার জন্য মাঠে নামতে নির্দেশ দেন। কিন্তু তাতেও কোনো ফল হয়নি। নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যক্ষ বাদশার পক্ষেই প্রচার চালাচ্ছে। শুক্রবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ মিলনায়তনে কাঁচি প্রতীকের নির্বাচনি সভায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতিসহ সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।

স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল আলম বেন্টু। তিনি বলেন, আমরা মহানগর আওয়ামী তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে এই বিষয়ে দুটি সভা করেছি। আমাদের যেটি অভিযোগ তিনি ১৫ বছর এমপি ছিলেন কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিলেন না। এজন্য তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবির আলোকেই মহানগর আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগের একজন লোককে সেটা হোক স্বতন্ত্র প্রার্থী তাকে মনোনিত করে নির্বাচন জয়ী করা।

রাজশাহী মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি লিয়াকত আলী লিকু বলেছেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নৌকা তুলে দিয়েছেন ফজলে হোসেন বাদশাকে। সেখানে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছেন। লিটনের বক্তব্যে জোটে ভাঙন দেখা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি লাভবান হবে।

তিনি আরও বলেন, মহানগর আওয়ামী লীগ নেতারা বর্তমানে মুখে নৌকার পক্ষে কথা বলছেন বটে; কিন্তু দলটির মাঠের নেতাকর্মীরা দলবদ্ধভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। ফলে আমরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি।

রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী কামাল বলেন, ফজলে হোসেন বাদশার নৌকা আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক। আমরা দলীয় নির্দেশনায় নৌকার পক্ষে প্রচারে নামতে নেতাকর্মীদের বলেছি। শুরুতে নেতাকর্মীরা কিছুটা অনমনীয় থাকলেও বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড-মহল্লায় নৌকার পক্ষে কাজ করছে আমাদের দলের নেতাকর্মীরা। অনেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষেও কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু বলেছেন, নিজেদের জনপ্রিয়তায় প্রার্থীদের জিতে আসতে হবে। আমরা চাই মুক্ত পরিবেশে নির্বাচনটা হোক।

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও নৌকার প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা রাজশাহী মহানগর ১৪ দলের নেতাদের জরুরি সভা ডাকতে বলেছেন। সভা হলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে মাঠে নির্বাচনি প্রচারে সক্রিয় হবে বলে আশা করছি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ