পঁচিশে বৈশাখ চলেছে ‘জন্মদিনের ধারাকে বহন করে’ জীবনের জয় ঘোষণায়

আপডেট: মে ৮, ২০২২, ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ

গোলাম কবির


শরণ্য ব্যক্তি বা বিষয়কে মানুষ স্মরণ করে। সে স্মরণ ব্যক্তিক, যৌথ, জাতীয় বা বিশ্বজনীন হতে পারে। স্মরণার্হ যিনি, কোনো মতবাদ, যতই বৈপ্লবিক হোকনা কেন, সবার চেতনায় সমান সমাদৃত হয় না। সেখানে ভিন্ন রুচির ব্যক্তি বা অভিষন্ধির মানুষ ভিত্তিহীন চমক সৃষ্টি করে।

মরমের সত্যকে জীবনের প্রয়োজনে যাঁরা নিজের ভাবনাকে সবার ভাবনায় রূপান্তর করতে পারেন, তাঁরা মানুষের চেতনালোকে বারবার ফিরে আসেন। রবীন্দ্রনাথ তেমনি এক ব্যক্তিপুরষ যিনি মানুষের সুকুমার ভাবনাকে সর্বজনীন করার অবিরাম সাধনা করে গেছেন। আমরা তাই তাঁকে স্মরণ করে নিজেদের ধন্য মনে করি।

জীবনধর্মী মননের সৃজনধারা নিয়ে যে-সব প্রতিভার আবির্ভাব, তাঁরা আনন্দের আকর হয়ে আছেন। রবীন্দ্রনাথ তাদের অন্যতম আমাদের অতুল মাতৃভাষার বিশ্বপ্রতিনিধি তিনি।

রবীন্দ্রনাথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করে জজ-ব্যারিস্টার-আমলা হবার চেষ্টা না করে মানসভূমি কর্ষণের মাধ্যমে জীবনের আনন্দ-বেদনার ফুল ফোটানোর সাধনা করে গেছেন। দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর আমলা হয়েছিলেন, ‘সাহিত্য বৃত্তির ব্যাপক অনুসরণ করেননি।’ বিলেতে ইউনিভার্সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য পাঠের আয়োজনের কালে লোকেন্দ্রনাথ পালিত তার সহপাঠী ছিলেন। তিনি বৃটিশ আমলা হয়ে রাজশাহীতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পালিত মহাশয় আমলার ইতিহাসে আর কালেকটরেটের কড়িকাঠে হয়তো দীর্ঘদিন থাকবেন। রবীন্দ্রনাথ বৈষয়িক বিদ্যালাভের বৃথা চেষ্টা না করে মানবহৃদয়ে স্থান লাভের জন্য অবিশ্রান্ত সাধনা করেছেন। ‘হৃদয় আমার ক্রন্দন করে মানব হৃদয়ে মিশিতে/নিখিলের সাথে মহারাজ পথে মিলিতে দিবস নিশীথে।’-বিশ্বনৃত্য, সোনারতরী। তাইতো তিনি বিশ্ববাসী, বিশেষ করে বঙ্গভাষী মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

উনিশ শতকের নব্বই এর দশকে লোকেন্দ্রনাথ পালিত রাজশাহীর জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে কর্মরত থেকেছেন, আর রবীন্দ্রনাথ রাজশাহীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোলাহলহীন এক নিভৃত পল্লীর নাগর নদীতে কখনো বোটে, কখনো আবার পতিসরের কুঠি বাড়িতে অবস্থান করেছেন।

এখানে পিতৃআড্ডায় তাঁকে জমিদারির সেরেস্তায় কাজ দেখতে হলেও মানস-নির্দেশে জীবনের সুখ-দুখের বাতায়ন খুলে দিয়ে দুখি মানুষের দৈনন্দিন কর্মপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করতে ভোলেন নি। তাকেই তিনি সুদীর্ঘকালের পথরেখায় শিল্পীত রূপ দিয়ে গেছেন। ১৩০২ বঙ্গাব্দের ২১ শে চৈত্র ‘চৈতালির’ ‘দিদি’ কবিতায় যাকে আমরা ‘জননীর প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে পাই। এযেন সোনার তরীর ‘চারি বৎসরের কন্যাটির মতো বিশ^ ব্যাপৃত।’

বলা হয়ে থাকে, যদিও পুরাতন কথা, রবীন্দ্রনাথ জন্ম রোমান্টিক। তিনি তা অকপটে মেনে নিয়েছেন, আমরা অস্বীকার করিনা। তবে প্রশ্নের অবকাশ রাখে কল্পনা আর আবেগ ছাড়া সৃষ্টি আসবে কোথা থেকে! এই যেন নিরেট বাস্তববাদী বলে কিছু দর্শন, তাকি শুষ্কং কাষ্টং! দার্শনিক নিরালায় জীবনের সুখ-দুখের কল্পনা করেন না। এ কল্পনা যদি রোমান্টিক হয় হোক, ‘তাহাতে ক্ষতি বল কিবা কার, বহিতে পারি যদি হৃদি ভার।’

রবীন্দ্রনাথ মনে রাখা ভালো জগতের তাবৎ কবি-শিল্পী অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশেলেই জীবন চিত্রের পট আঁকেন। শেক্সপীয়র ষোড়শ শতকের এলিজাবেথীয় যুগের প্রধান জীবনশিল্পের পুরোহিত। তিনি যে সেব চরিত্র অংকন করেছেন তা যেন বাস্তব জীবনকেও হার মানায়। আর রবীন্দ্রনাথ মানব হৃদয়ের যাবতীয় ভাব-কল্পনাকে এমন বাণীরূপ দিয়েছেন যা ‘রক্তের অক্ষরে’ দেখা।
মানুষের চিন্তা সমান্তরাল চলেনা। রবীন্দ্র আবির্ভাবের সমকালে তার সৃষ্টি নিয়ে বিরূপ সমালোচনা কম হয়নি।

তিনি গ্রাহ্য করেননি। ‘শনিবারের চিঠি’ আর ‘কৃত্তিবাসী’রা জোট বেঁধে রবীন্দ্র হিমাদ্রি লংঘনের বৃথা অপচেষ্টা করেছেন। তাঁদের ঘর্মাক্ত শ্রম বৃথা গেছে। সেকালে জীবননানন্দ দাস ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি গডডলিকায় গা না ভাসিয়ে বরং ‘কবিতার কথা’য় সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানিয়ে চিরকালের সত্যকে স্বাগত জানিয়ে লিখেছিলেন: “রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভাষা, সাহিত্য, জীবন দর্শন ও সময়ের ভিতর দিয়ে সময়ান্তরের গরিমার দিকে অগ্রসর হবার পথ যে রকম নিরঙ্কুশভাবে গঠন করে গেছেন পৃথিবীর আদিম কালের মহাকবি ও মহাসুধীরাই তা পারতেন: ইদানীং বহুযুগ ধরে পৃথিবীর কোনো দেশই এরকম লোকোত্তর পুরুষকে ধারণ করেনি।” আমরা ভাগ্যবান অনায়াসেই পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথের কথায়, ‘না চাহিলে যারে পাওয়া যায়।’

আজকের দিনের কতিপয় স্বাঘোষিত পণ্ডিত কিছু কোটেশন মুখস্থ করে আর কাটিং ও পেস্টিং এর ভারবাহী হয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বাতুলতা প্রকাশ করেন। এরা উপেক্ষণীয়।

মহাকবি গ্যেটে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মহৎ মন্তব্য আছে। রবীন্দ্রনাথের পরে গ্যেটের আবির্ভাব হলে তিনি কী মন্তব্য করতেন তা অনুমান সাপেক্ষে হলেও বলা যায়, তিনি বলতেন, মানব অনুভূতির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ বিষয় রবীন্দ্র মনন জগৎকে এড়িয়ে যেতে পারেনি। লেখাবাহুল্য এসবের প্রতিবিম্ব তিনি রূপ দিয়ে গেছেন, যা মানবিক।

স্বঘোষিত পণ্ডিতদের চেয়ে আত্মপরিচয় গোপনকারী কিছু রবীন্দ্র অনুরাগী ব্যক্তিকে জানার সুযোগ হয়েছে আমার। তিনি স্পর্শকাতর বিভাগে উচ্চতর পদে সমাসীন। সবচেয়ে বড়ো কথা তিনি রবীন্দ্রসংগীতের অনুপম ভাব সুধায় নিবেদিত। এমন মানুষের সাহচর্যে একটা অমলিন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

আমরা বলছিলাম আনুভূতিক সত্যের প্রকাশে রবীন্দ্রনাথ অনন্য। তাই বলে যাপিত জীবনকে স্বচ্ছন্দ সুন্দর করার প্রয়াস তাঁর কম ছিলোনা। ছিলোনা বলেই জনসমাজ উপেক্ষিত। ওই যে নাগরনদী তীরে তিনি বিশ্ব জননীর রূপ দেখেছিলেন, তার সন্তানদের আপন মাহাত্ম্যে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্য যেসব জনহিতকর কর্মধারা পতিসর শিলাইদহে শুরু করেছিলেন, তা বাস্তবায়নের হাতে-কলমে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন বিশ্বভারতীতে। কেবল অরূপ সাধনা নয়। মানবকল্যাণ চিন্তা তাঁর সৃষ্টির অনন্য ফসল। ‘জীবনের জয়’ খোঁজা তাঁর জন্মদিন স্মরণের অন্যতম চাবিকাঠি। মতবাদ অনুসন্ধান নয়।
লেখক: সাবেক শিক্ষক রাজশাহী কলেজ