পথে হলো দেখা

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৭, ১২:০৬ পূর্বাহ্ণ

নাঈমা আফরোজ সম্পা


প্রথম তাকে যেদিন দেখেছিলাম, মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার চলার পথে বিস্তীর্ণ হয়ে লুটিয়ে ছিলো সে। কতবার তাকে প্রাণ ভরে দেখেছি, সে আমাকে ডেকে ডেকে নিয়ে গেছে কতবার হিসেব রাখিনি। এমনি করে কতটা সময় পেরিয়েছি তাও জানিনি। একদিন সে আমাকে বললো, আমাকে ভুলে গেছো বুঝি? আমার চোখে চোখ রাখো না যে! আমি অবাক হলাম। তাইতো!
কতদিন এই বিস্তীর্ণ প্রান্তরে চোখ রাখিনি, কতদিন দৃষ্টি বিনিময় হয়নি তার সাথে। কী করে, কী করে সে আমার প্রতিদিনের মতো হয়ে গেলো! গাড়ী থামালাম। না কেউ নেই এখানে। শুধু আমি, একা। কর্মক্লান্ত আমি লুটিয়ে পড়লাম ওর বুকে। ঠিক তখনই বুকের ভেতর থেকে প্রাণবিন্দু বিচ্ছুরিত হয়ে আকাশে মিলিয়ে গেলো। চোখের কপাট বন্ধ হলো। এই প্রশান্তি আমি জীবনেও পাবো না। এ আমার, একার।
কিছুক্ষণ পরে একটা তুলোট কণা আঁখিপল্লবে নাড়া দিয়ে বললো, ওঠো! আমাদের দেখবে না? চোখ বন্ধ করে উঠে গেলাম। আকাশে যেমন করে ছড়িয়ে থাকে তারা, ঠিক তেমনি ওরাও এই বিস্তীর্ণ সবুজে তারার মতো ফুটে আছে। আচ্ছা, কদম ফুল নয়তো! কে যেন বললো, ধুর বোকা, তুমি এখন তোমার দেশ থেকে বহুদূরে আছো। বর্ষা কাল, কদম ফুলের ঘ্রাণ কোথায় পাবে তুমি! ওরা কদম নয়, ওরা ঘাসফুল।
ভাবছি আর এক ঝাঁক সাদা কার্পাসের মতো ঘাসফুলের উড়ন্ত দল আমাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আমি ওদের ভালোবাসা স্নাত, অভিনন্দিত, হেঁটে যাচ্ছি একাকী যুবকের মতো, প্যান্টের পকেটে হাত আর মাথা নিচু করে। যেতে যেতে দেখি একটা সিঁড়ি নির্জন দাঁড়িয়ে, একেবারে নিচে নেমে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। আজ যেন আমি চলতেই এসেছি, তাই সিঁড়ির সোপানে পা রাখলাম। একটু দাঁড়ালাম আর চোখের সম্মুখে বিশাল এক অরণ্যানী খুলে গেলো।
উঁচু নিচু মৃত্তিকার ঢেউয়ে আশ্রয় নিয়ে মৃদু বাতাস আর ভোরের অভিনব রোদ্দুরের সাথে খেলা করছে ও। এক ফোটা ধুসর জমিন নেই, সবুজের প্লাবন এসেছে এখানে। আমি দর্শক, প্রশান্ত দর্শক, মুগ্ধ দর্শক, নির্জনতায় দাঁড়িয়ে নিসর্গের প্রশংসায় অবনত হচ্ছি বারবার। দেখতে দেখতে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম যখন, একদল মহীরুহ স্বাগত জানালো, দুপাশে ওদের পত্রসুশোভিত দেহ নৃত্য করছে আর আমি মাঝখানে। মাথা উঁচু করে ওদের চূড়ায় দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম। জানি না কেন এত ভালো লাগলো!
আমার ভালোলাগার সাক্ষী শুধু এই অরণ্য, এই নির্জনতা আর কেউ না। গাছেরা কেমন করে দাঁড়িয়ে আছে, একে অন্যের দিকে ঝুকে কথা কইছে! আমিও ওদের বিহ্বল বন্ধু যেন, ওদের বিশালত্বের সখ্য পেতে গেছি। এখানে আমি আগে আসি নি কেন!
হাঁটছি। হঠাৎ দেখলাম, এক ঝাঁক নীল ধোঁয়া বৃক্ষের শুন্য গলে আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। এই নির্জনতায় আগুন লাগালো কে! কৌতূহল আমাকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেলো। ও আচ্ছা তাহলে এই? এক পরিবার আগুনে পুড়িয়ে সকালের খাবার খাবে, সেখান থেকেই নির্গত হচ্ছে এই নীল ধোঁয়া। থাক ওরা ওদের মতো, আমি আর একটু যাই। যেতে যেতে ওরা আমার দিকে তাকিয়ে শুভ সকাল বললো। হেসে দিলাম। আমার অপলক চোখের সামনে একটা স্তেু, একটু বাঁকা।
একটি কাকচক্ষু সংকীর্ণ নদীর দুধার জোড়া দিয়েছে। সেই রঙিন সেতুর রেলিং এ কনুই ঠেকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। কি অপরুপ। মনে হলো, এই আমাদের গ্রাম, এখানে আমি চুপচাপ একটা ডোবার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। তার স্বচ্ছ জলে মুকুর বানিয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি জানি না। জলে ফুটফুট করছে মাছ।
ঘাসফুল দাঁড়িয়ে আছে হাঁটু গেঁড়ে। পানিপোকা মাকড়সার জাল বুনে যাচ্ছে। বসিয়েছে ওদের মিলন মেলা। পাড় থেকে খুলে খুলে পড়ছে হিজল ফুল। চিকচিক চিইইই-একটা তীক্ষ্ণ অনুরণন তারপর, বাতাসে ছড়িয়ে নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া। আমার মুগ্ধতা যেন ভাঙল! মা যেন আমাকে ডাকছে। আরে! একে তো আমি চিনি। এত পরিচিত। এই ডাক আমি কতোবার যে শুনেছি! কতবার তার হিসেব নেই। কোথায় ও? ওকে দেখার জন্য সাঁকো পেরিয়ে আরো ঘন অরণ্যে পা ফেললাম।
এখানে আগে আসিনি, এই পথ চিনি না। তবুও মনে হলো, এ আমার আপনজন, জন্ম জন্মান্তরের চেনা, বিদেশ বিভুঁই নয়। আলাদা নয়, পরিচিত, সবাই তাকে চিনে। যতবার এই শব্দ শুনি, আমি কাঠবিড়ালী হয়ে যাই, লেজ নাড়িয়ে দশদিকে ইতস্তত ঘুরছি ওকে দেখবো বলে। তবুও দেখা পেলাম না আমার প্রিয় পাখিনীর- আমি জানি ওর নাম চড়ুই। আর ঐ যে পাতার ফাঁকে লুকিয়ে ছিলো এক থোকা শুভ্র পুষ্প, ভেবেছিলাম এ কামিনি।
কিন্তু না, ওর নাম পাথুরে জাম। এরপর যখন পাশ ফিরে তাকালাম দেখি একটা পথ, গোলাপী, সুড়কির রঙ্গে রঙিন। কারো পায়ের চিহ্ন রাখেনি পথটি, এমনি নতুন। তাহলে কী এই পথে আমিই প্রথম! সেই পথ বৃক্ষ ছায়া পথ, পুষ্প শোভিত পথ। বুনোফলও ধরেছে তার পাশে। কারো নাম চোখ চেরী, কারো নাম পাথুরে জাম।
মনে পড়ে গেলো, আমার শৈশবের কথা, কাকের ঠুঁটির কথা, যার পাতায় তুলো দিয়ে বাসা বাঁধে ছোট্ট টুনিটুনি। আমি তো অনেক বুনোফল খেয়েছি। অবাক হলাম, আমি কেন বুনো ফল খেতাম। এ আমাকে কে শিখালো! আমার পূর্বপুরুষেরা খেয়েছে। অবশ্যই খেয়েছে। না খেলে কেন আমি এই বুনোফল নির্ভয়ে মুখে পুরলাম? কতোবার যে ঘুম থেকে উঠে আমাদের বাড়ির অদূরে ঝোপের পাশে সবুজ কাকের ঠুঁটির লাল রঙের জন্য প্রতিক্ষা করেছি!
সকালে ঘুম থেকে উঠে এই কাকের ঠোঁটই ছিলো আমার একমাত্র আকর্ষণের বস্তু। হয়তো তেমনি এই পাথুরে জাম। কিছুক্ষণ আগে যে খৃষ্টান দম্পতি দেখেছিলাম, তাদের পাশে সাদা রঙের জামা পরা একটা ছোট শিশু হাত নেড়ে নেড়ে কি যেন খুঁজছিলো। হয়তো ওর এখন পাথুরে জাম খাওয়ার সময়! বনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।
ইচ্ছা হলো, একদিন কাউকে না জানিয়ে আমি এই বনে চলে আসবো অনেক রাতে। একটা মশারী, একটা মাদুর, দেয়াশলাই নিয়ে চলে আসবো। কেউ জানবে না। এরপর মাদুর বিছিয়ে, মশারী খাটিয়ে এই এখানেই অনেকক্ষণ জেগে থাকবো, শুয়ে থাকবো। কেউ থাকবে না আমার পাশে। হঠাৎ একটা পাখির বা তক্ষকের ডাক শুনবো, পাতার শব্দ শুনবো। গাছের কথা শুনবো, বনের অন্ধকার অনুভব করবো, তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়বো জানবো না।
একটা অরণ্য, তার ভেতর দিয়ে একটা নির্জন পথ, আর আমি-এ আমার আরাধ্য ছিলো। আর সেখানেই আমি! থোকা থোকা ফুল, শুভ্র, নীল, তুলট বর্ণ বা হলুদ। ওরা সবাই বুনো ফুল। স্নিগ্ধ লাগছে, একটা শীতল বাতাস অনুভব করছি গায়ে। হয়তো এই বনে বৃষ্টি নেমেছিলো আমি আসার আগে। শীতল প্রকৃতি তার অবারিত সুন্দর নিয়ে একটা বাঁকা পথে মোড় নিলো। হঠাৎ করে দুটো রঙিন হাঁস ঝিকঝিক করে উড়ে ঠিক সামনে এসে পড়লো।
ঠিক আমাদের হাঁস যেন। ধুসর আর কালো হাঁস, তার গলায় ময়ুরকণ্ঠী নীল মালা। আমাকে দেখেই বুনোগোলাপের ঝোপের উপর দিয়ে উড়ে গেলো যখন ওর গলার মালায় আমার চোখ পড়লো, মনে পড়লো আমার মায়ের তো এমনি একটা শাড়ি ছিলো-নীল। আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম গলার নীল মালার দিকে। শাড়িটা ছিলো খুব কম দামী, কিন্তু অপূর্ব সুন্দর। মা, আমাদের সবুজে ঘেরা বাড়ির কথা মনে হলেই, কেমন অগোছালো হয়ে পড়ি।
ভাবতে ভাবতে একটা ঢালু জমি বেয়ে উপরে এসে দেখি লোকালয়। কি অদ্ভুত! আমি এখানে এলাম কি করে! কত কাছে জনবসতি, টের পাইনি। অথচ তার পাশেই পাখিরা থাকে, হাঁস চরে, বুনো ফুল ফুটে থাকে অবাধে। কেউ ওদের কিছু বলে না।
মনে হলো, মানুষ যত সভ্য হবে, সে তত হবে প্রকৃতি প্রেমিক, অপত্য শিশুর মতো আগলে রাখবে নিসর্গকে তার বুকে। পৃথিবীর এই সভ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে টের পেলাম কেন জীবনানন্দ দাশ এত আপন, কেন তিনি আমার এত প্রিয়। মনে হলো প্রকৃতির কথা যিনি লেখেন, তিনি এগিয়ে গেছেন সহস্র বছর।
মানবসমাজ যত সভ্য হবে, সে তত প্রকৃতির শিশু হয়ে তার কোলে ফিরে যাবে। না হলে এই সভ্য সমাজ কেন এত প্রকৃতিপ্রেমিক, প্রিয়তম জীবনানন্দ দাশ? কেউ আমাকে বললে, পড়ো পড়ো তোমার প্রিয়তম কবির কবিতা পড়ো।
‘তুমি তা জানো না কিছু-না জানিলে,
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে;

যখন ঝরিয়া যাবো হেমন্তের ঝড়ে
পথের পাতার মতো তুমিও তখন

আমার বুকের ’পরে শুয়ে রবে?

অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!

তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষ’য়ে যাবে সেদিন সকল?

আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই;

শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে;

আমি ঝ’রে যাবো-তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধ’রে সেইদিন পৃথিবীর পরে,

আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।’