পবায় ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ ধামাচাপার চেষ্টা ।। ধর্ষণের অভিযোগ আপস

আপডেট: নভেম্বর ১৭, ২০১৬, ১২:০২ পূর্বাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক



রাজশাহীর পবা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে গণধর্ষণের মামলা না নিয়ে আপস করে দেয়ার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের নামে চলছে সময়ক্ষেপণ। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা প্রথমে নড়েচড়ে বসলেও রহস্যজনক কারণে এখন অভিযোগ ধামাচাপার দেয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এলাকার মানুষ বলছেন, আসলে তদন্তের নামে ওসিকে অভিযোগের দায় থেকে কীভাবে রক্ষা করা যায় সেই চেষ্টাই করা হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব সাংবাদিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেয়ে ওসির অপকর্মের সংবাদটি সাহস নিয়ে করেছিলেন, তাদের ভয় দেখানোর জন্য নানাবিধ অপচেষ্টা করা হচ্ছে। এলাকাবাসী পবা থানার ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলি পুলিশের সিকিউরিটি সেল অথবা নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্তের দাবিও করেছেন।
সম্প্রতি ‘পবায় গণধর্ষণের মামলা না নিয়ে আপস ওসির’ শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে রাজশাহীতে তোলপাড় হয়। ওইদিনই এই ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) সুমিত চৌধুরীকে। তদন্ত প্রতিবেদন সাতদিনের মধ্যেই জমা প্রদানের নির্দেশ থাকলেও গতকাল বুধবার পর্যন্ত তিনি  প্রতিবেদন জমা দিতে পারেন নি। এমন কি তদন্তকাজ এখনো শেষ হয়নি বলে স্বীকারও করেছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, ওসি শরিফুল ইসলামকে অভিযোগ থেকে রক্ষায় মরিয়া হয়ে পড়েছেন জেলা পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা। খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তাই সরেজমিনে না গিয়ে নিজ কার্যালয়ে বসে বসেই তদন্ত কাজ করছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের রাজশাহী শাখার সভাপতি কল্পনা রায় বলেন, আমরা একাধিকবার বড়গাছীতে নির্যাতিত মেয়েটির বাড়িতে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পুলিশের ভয়ে তারা কথা বলতে রাজি হয় নি। ভিকটিম মেয়েটির প্রতিবেশিরা মহিলা পরিষদ নেতৃবৃন্দকে জানিয়েছেন, পুলিশ গিয়ে ও পরিবারটিকে কয়েকবার থানায় ডেকে নিয়ে মুখ না খোলার জন্য ভয়ভীতি দেখিয়েছে। সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন সময়ে থানার পুলিশ সাদা পোশাকে গিয়ে ভিকটিম ও তার পরিবারকে হুমকি ধামকি দিয়ে এসেছে।
তিনি আরো বলেন, মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা গত দুইদিন আগেও মেয়েটির বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখানকার লোকজন আমাদের জানিয়েছে পুলিশ এসে তাদেরকে শাসিয়ে গেছে। থানার কিছু দালালও মেয়েটিকে ভয় দেখিয়েছে কারো কাছে আর মুখ না খোলার জন্য। ওসির ব্যক্তিগত অভিযোগের এ দায় পুলিশের পুরো ডিপার্টমেন্ট নিতে পারে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা নিজের অফিসে বসে থেকে ভিকটিম ও তার পরিবারসহ সংশ্লিষ্টদের পুলিশ পাহারায় পবা থেকে নিয়ে এসে নিজেদের মতো করে জবানবন্দি নিয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার নিরপেক্ষ ও সত্য উদঘাটনে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না বলেও মন্তব্য করেন নারীনেত্রী কল্পনা রায়।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরী  বলেন, বিভিন্ন কাজের চাপের কারণে আমি এখনো সরেজমিনে যেতে পারি নি। তবে শিগগিরই যাবো। একই কারণে বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়া যায় নি। তবে তদন্তের প্রায় ৭০ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।  আর তিনি নিরপেক্ষভাবেই তদন্ত করে যাচ্ছেন বলেও দাবি করেন জেলা পুলিশের এ কর্মকর্তা।
এদিকে ওসি শরিফুলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে আলাদাভাবে তদন্ত কমিটি করে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি ।  তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নিশারুল আরিফ জানান, তদন্তকাজ এখনো শেষ হয় নি। আরো এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে  তাকে যে আপসনামার কপি দেয়া হয়েছে তাতে ধর্ষণের কথা উল্লেখ নেই। এলাকাবাসীর অভিযোগ, যে আপসনামাটিতে গণধর্ষনের ঘটনার আপস করা হয়, সেটির ডুপ্লিকেট কপি তৈরির করার সুযোগ দেয়া হয়েছে ওসিকে। আর সেটিকে অবলম্বন করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ওসিকে রক্ষার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। এলাকাবাসী আরো বলেছেন, এই বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করলেই ওসির আসল গোমর ফাঁক হয়ে যাবে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা সময়ক্ষেপণ করছেন।
জানা গেছে, থানায় বসে ওসি শরিফুলের সামনেই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল বারী খান এক সংখ্যালঘু সদস্যকে নির্যাতন করলেও কোনো ব্যবস্থা নেন নি তিনি। জয়কৃষ্ণপুর ভালাম গ্রামের ধীরেন্দ্রনাথ সরকারের ছেলে স্বপন চন্দ্র সরকার এবিষয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছিলেন কিছুদিন আগে। এতে বলা হয়, স্বপন চন্দ্র সরকার ব্যবসার কারণে আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তির কাছে এক লাখ ৪৯হাজার ৫০০টাকা পান। টাকা ফেরত চাইলে আবুল কালাম এক লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করেন। এনিয়ে থানায় অভিযোগ করেন আবুল কালাম। এর জের ধরে নওহাটা পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল বারী খান গত ১৪ এপ্রিল থানায় ওসির কক্ষে স্বপনচন্দ্রকে অকথ্য ভাষায় গালি দিয়ে কিলঘুষি মারেন। ওসি শরিফুলের সামনে এঘটনা ঘটলেও তিনি তাতে বাধা দেন নি। এদিকে পুলিশ সুপার এই অভিযোগ পাওয়ার পর ওসি শরিফুলকে শোকজ (সূত্র : স্মারক নং ৩৪১/সি তারিখ ১০/৭/২০১৬) করেন।
ওই শোকজে বলা হয়, জনসম্মুখে এঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণœ হয়েছে এবং পুলিশের অবস্থানকে জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। ওসির এমন কার্যকলাপ বিভাগীয় শৃঙখলা পরিপন্থী, দায়িত্ব কর্তব্যে চরম অবহেলা, অপেশাদারিত্ব এবং সরকারি দায়িত্ব পালনে উদাসিনতার পরিচায়ক। কেন তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিবেদন প্রেরণ করা হবে না তার ব্যাখার জবাবও চাওয়া হয়। সাতদিনের মধ্যে এই জবাব চেয়ে চিঠি দেন তৎকালীন পুলিশ সুপার নিশারুল আরিফ। তবে ওই ঘটনায় নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে গত ১৭ জুলাই ব্যাখ্যা দিয়ে পুলিশ সুপারের কাছে জবাব দেন ওসি শরিফুল ইসলাম। এরপরই পুলিশ সুপার নিশারুল আরিফ অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে বদলি হয়ে যান। ফলে বিষয়টিও চাপা পড়ে যায়। জানা যায়, ওইসময় ওসিকে তিনদিনের জন্য থানার কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তদবিরের জেরে ওসি আবার থানায় ফিরে যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সম্প্রতি পবার সোনাইকান্দিতে ফেন্সিসডিলসহ মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন এসআই প্রণয় কুমার রায়। এই ঘটনাটি জাতীয় ও স্থানীয় কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশ পায়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পরদিন পুলিশ সুপার সেই এসআইকে ক্লোজড করেন। ফেন্সিডিলসহ মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় ওসি ছুটিতে থাকার কথা বলে নিজে দায় এড়িয়ে যান।
এলাকাবাসী আরো জানায়, এসআই প্রণয় ছিল মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পবার ওসির টাকা আদায়ের  ক্যাশিয়ার। প্রণয় ক্লোজড হওয়ায় ওসি সাংবাদিকদের ওপর নাখোশ হন। কয়েকজন সাংবাদিককে তিনি দেখে নেয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন।