পরিভাষায় সহজবোধ্য বিদেশি শব্দ ব্যবহার করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২২, ৮:৩৭ অপরাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক:



বিদেশি পরিভাষা বাংলায় যুক্ত করতে রক্ষণশীল না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খটমট পরিভাষা ব্যবহার করলে মানুষ সেটা সহজে বুঝতে পারে না বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বহুল প্রচলিত ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত ও ব্যবহৃত শব্দগুলো যে ভাষা থেকেই আসুক, সেগুলোকে আমাদের গ্রহণ করতে হবে। পরিভাষা ব্যবহার করতে গিয়ে কোনও কিছু বুঝবো না, বলতে পারবো না, সেটা যেন না হয়। সব জায়গায় প্রতিশব্দ বা পরিভাষা করতে হবে, আমি এটা বিশ্বাস করি না।’
সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আয়োজিত চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সংযুক্ত হন।
ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা পরিভাষা ‘আধেয়’ বললে অনেকে বুঝতে পারবে না উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ‘কনটেন্ট বললে সবাই সহজভাবে বুঝবে। কাজেই প্রচলিত বৈজ্ঞানিক শব্দগুলোর পরিভাষা করে, তা আরও দুর্ভেদ্য না করে ফেলা ভালো। সেগুলো আমাদের বাংলা ভাষার সঙ্গে মিশে যাবে। এটা মানুষের জন্য বুঝতে, পড়তে, জানতে এবং কমিউনিকেশনে আরও সহজ হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞান যেভাবে বিস্তার লাভ করছে, সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষা কিন্তু আছে। ইংরেজি ভাষা যেমন আছে, ফ্রেন্সসহ অনেক দেশের অনেক ভাষা আছে, এর ভেতরে যুক্ত হয়ে গেছে। আর আমাদের বাংলা ভাষায় প্রায় আট হাজারের ওপর বিদেশি শব্দ মিলে গেছে। এজন্য আমরা এই ব্যাপারে খুব বেশি রক্ষণশীল না হলে প্রচলিত শব্দগুলো, প্রচলিত বিজ্ঞানের যে টার্মগুলো, সেগুলো দিয়ে বাংলাভাষায় সহজভাবে বিজ্ঞান শিক্ষার ব্যবস্থাটা করা যেতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী নতুন নতুন আবিষ্কারগুলো দেশের মানুষের কাছে সহজভাবে আমাদের ভাষায় ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি দেখতে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউকে অনুরোধ করেন। তবে তিনি পরিভাষা ব্যবহারে সতর্ক থাকার কথাও বলেন।
কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটে বাংলা কনটেন্ট তৈরি করা এবং বাংলা ভাষা ব্যবহার করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে বাংলা কি-বোর্ড এসেছে, কিন্তু সেটাকে আরও সহজ করে দেওয়া কারণ, আমাদের যুক্তাক্ষরগুলো এত খটমট যে, আমি নিজে এক সময় বাংলা টাইপ করা শিখেছিলাম, যেন তাড়াতাড়ি শেখা যায়, এটা প্রাকটিস না থাকলে তাড়াতাড়ি ভুলেও যেতে হয়। কাজেই এটাকে আরও সহজভাবে করা দরকার।অবশ্য এ ব্যাপারে কাজ চলছে। তবে এটাতে আরও গবেষণা করে মানুষ যাতে সহজে বুঝতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। মোবাইল ফোনে যেন বাংলা শব্দ ব্যবহার করতে পারে। মেসেজ দিতে পারে। এটা একটা শুভলক্ষণ।’
ভাষার ওপরে গবেষণার প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘মাতৃভাষা সংগ্রহ করা, এর ওপর গবেষণ করা সেটাও যেমন করবে, সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষেত্রটা দেখতে হবে। আমরা এই ভাষাকে কীভাবে মানুষের জন্য সহজবোধ্য করা ও সহজভাবে ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি। এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করা একান্ত প্রয়োজন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী নই। নিরেট বাংলার ছাত্রী। কিন্তু আমি মনে করি, বিজ্ঞানের বিস্তার ছাড়া একটি জাতি এগোতে পারে না। যে কারণে জাতির পিতা শিক্ষা কমিশন গঠনের জন্য তখনকার যুগে আমাদের দেশের বিখ্যাত বৈজ্ঞানিককে দায়িত্ব দিয়েছেন। তিনি সেই বিজ্ঞানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।’
অনুষ্ঠানে পাঠ করা প্রবন্ধে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বিজ্ঞান চিন্তা তুলে ধরার প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা জাতির পিতার রাজনীতির দিকটা যতটা ধরি। তার ভেতরে যে একটি বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনা ছিল, সেটা কিন্তু সেভাবে প্রকাশ হয় না। এই প্রবন্ধের মধ্য থেকে সেটা বেরিয়ে এসেছে।’
ভাষা আন্দোলনে জাতির পিতার অবদান স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘১৯৪৮ সালে আমাদের ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। বায়ান্ন সালে রক্ত দিয়ে ভাষা শহীদরা মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার রক্তের অক্ষরে লিখে দিয়ে যায়। রক্তদান করে নিজের ভাষা-সাংস্কৃতি রক্ষা করার দিন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে দিনটি পালন করা হচ্ছে। যখনই পাকিস্তানি শাসকেরা বাংলা ভাষার পরিবর্তে উর্দুকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন ছাত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধু সেটার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং ভাষার জন্য সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন।’
তিনি বলেন, ‘‘১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলেন। ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে এবং তমুদ্দিন মজলিশ নামে একটি সংগঠনকে নিয়ে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট ঢাকায় হয়। সেই ধর্মঘটে তিনি গ্রেফতার হন। ১৫ মার্চ মুক্তি পান। ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ভাষার অধিকারের জন্য যে সভা হয়, সেখানে তিনি সভাপতিত্ব করেন। আমাদের আন্দোলনের সূচনা এভাবেই। বার বার তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। বন্দি হয়েছেন। এই ভাষা আন্দোলন করতে গিয়েই তাকে দীর্ঘ সময়ে কারাবরণ করতে হয়েছে। ১৯৪৯ থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হয়েছে। কিন্তু সেখানে তিনি বসে থাকেননি। ওই বন্দিখানা থেকেও ছাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। যখনই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য এসেছেন, যোগাযোগ করেছেন, তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে’ আমরা এটা পাই।’’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার এই সংগ্রামই কিন্তু ধাপে ধাপে আমাদের স্বাধীনতার চেতনা উদ্বুদ্ধ করেছে এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন জাতিসত্তা হিসেবে আত্মপরিচয় পেয়েছি। একটি জাতিরাষ্ট্র পেয়েছি।’
শহীদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজকে দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বাঙালি জাতি হিসেবে এটা আমাদের গর্বের। ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন। আমিও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলছি।’
বিজ্ঞানের চর্চা এবং গবেষণা ছাড়া কখনও এগোনো যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের সময় দেখি, গবেষণার জন্য বাজেটে আলাদা অর্থ বরাদ্দ কখনও ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের বাজেটের মধ্যদিয়ে যতটুকু সম্ভব সেটা করছে। কিন্তু এখানে বিজ্ঞান চর্চার জন্য আলাদা করে বিশেষ কিছু করা দরকার, গবেষণার জন্য আলাদা ফান্ড দরকার, এ বিষয়ে কারও কোনও লক্ষ্য ছিল না। আমরা এ বিষয়ে আলাদাভাবে টাকার ব্যবস্থা করি। প্রথমে আমরা ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেই। পরের বছর ১০০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রেখে দিই গবেষণার জন্য। সেই গবেষণা শুরু করেছিলাম বলেই বাংলাদেশ আজকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিজ্ঞান চর্চায় আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। বিজ্ঞানের সঙ্গে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রযুক্তির শিক্ষা আমাদের নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর গুরত্ব দিয়েছি। বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় করছি। একই ধরনের নাম হলে আকর্ষণ থাকে না। এজন্য সাবজেক্ট-ওয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় করে বহুমুখী শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি, যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে শিক্ষা নিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে সমানতালে চলতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের ছেলেমেয়েরা বিজ্ঞান মনষ্ক ও মেধাবী। তাদের মেধা বিকাশের সুযোগ করে দিলে অসাধ্য সাধন করতে পারে। বিজ্ঞান মেলা ও প্রতিযোগিতায় তাদের মেধার কিছু পরিচয় আমরা পাই। অনেক কিছু তাদের আবিষ্কার করতে হবে। কাজেই তাদের সুযোগ করে দিতে হবে। এই বিষয়ে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।’
অনুষ্ঠানে সরাসরি যুক্ত হতে না পারার আপেক্ষ করে তিনি বলেন, ‘আমার খুব খারাপ লাগে দূরে বসে বসে কথা বলতে। যদিও ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি। সেই ডিজিটাল পদ্ধতিতে সবার সঙ্গে কথা বলতে হয়। কিন্তু নিজের যাওয়া, উপস্থিত থেকে কথা বলা, আশা করি করোনার প্রাদুর্ভাব থেকে আমরা মুক্তি পাবো। বাংলাদেশ আবারও এগিয়ে যাবে। আমাদের অর্থনীতির গতি চলমান আছে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন