পরিশ্রম আর মেধা দিয়ে লড়ছেন রাজশাহী অঞ্চলের নারী ।। মজুরির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য বিদ্যমান

আপডেট: মার্চ ৭, ২০১৭, ১১:১৭ অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক


কর্মক্ষেত্রে মজুরি বৈষম্য মেনে নিয়েই অদম্য দৃঢ়তা নিয়ে পুরুষের সঙ্গে লড়ছেন নারীরা। পরিশ্রম, মেধা, আন্তরিকতা আর যোগ্যতার মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছেন রাজশাহী অঞ্চলের নারী। পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলে বেড়েছে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন এ অঞ্চলের নারী। আর এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে। কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং বিভিন্ন উন্নয়মূলক কমর্মকাণ্ডে নারীর সংখ্যা বাড়লেও, তৃণমূল পর্যায়ে পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য প্রকট। বিশেষ করে কৃষি এবং নির্মাণ শিল্প সেক্টরে নারীরা পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। পুরুষদের চেয়ে নারীরা অর্ধেক মজুরি পাচ্ছেন। রাজশাহী নগরী এবং গ্রামাঞ্চলে কর্মরত নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে রাজশাহীর অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত রচনায় এগিয়ে যাচ্ছেন নারী উদ্যোক্তারা। এ অঞ্চলের নারীরা সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণে এক পা, দুই পা করে সফলতার দিকে এগিয়ে চলেছেন। কৃষিপণ্য উৎপাদনেও সরাসরি জড়িত রাজশাহী অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ নারী। বিশেষ করে এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধ লাখ আদিবাসী নারী শ্রমিক কৃষি সেক্টরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এছাড়াও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, ব্যবসা, চাকরি এমনকি শিল্প কারখানায় পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন এ অঞ্চলের নারীরা। দিন দিন তাদের সংখ্যা বাড়ছেই।
রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত নিলয়-ওসমান মোটর ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহমুদুন্নবী জুয়েল জানান, কারাখানাটির ফেব্রিকেশন বিভাগে ১৭২ জন পুরুষ কর্মীর পাশাপাশি ৩০ জন দক্ষ নারী কর্মীও কাজ করছেন। পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি তারাও ভারি কাজ করছেন। কারখানাটিতে এখন প্রতিঘণ্টায় একটি করে ‘নিতা টেম্পু’ তৈরি হচ্ছে। আর প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে ১৬টি।
এভাবে রাজশাহীর অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। গ্রামীণ নারীদেরও অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। যদিও এ সূচকে এগিয়ে রয়েছেন শহরের নারীরাই। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসেবে মতে, গত এক দশকে রাজশাহীর অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ২ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর মধ্যে দশমিক ৪৪ শতাংশ গ্রামীণ এবং ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ শহুরে নারী।
বিভাগীয় পরিসংখ্যান কর্মকর্তা আশরাফুল আলম সিদ্দিকী জানান, শিক্ষা-দীক্ষা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা এগিয়ে নিয়েছে শহুরে নারীদের। ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ হারে বর্তমানে কর্মরত শহুরে নারীর সংখ্যা ২৫ হাজার ৫৭ জন। এক দশক আগেও এ সংখ্যা ছিল ৮ হাজার ৭১৮ জন। যা ছিলো মোট শ্রমবাজারের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এক দশকে তা বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে রাজশাহীতে মোট ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৮১ জন কৃষি বহির্ভুত পেশায় জড়িত। এর মধ্যে ৪৯ হাজার ৯৬৯ জন নারী। এক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর কৃষিখাতে মোট ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১১৩ জন মানুষ কর্মরত। এর মধ্যে ৯৩ হাজার ৩৫৮ জন নারী। এক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। এই হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
অপরদিকে পুরুষের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের খেত-খামারে কাজ করছেন আদিবাসী নারী শ্রমিকরা। এসব আদিবাসী নারী শ্রমিক মূলতঃ ধানের চারা রোপণে বিশেষ পারদর্শী। নিড়ানী ও ধান কাটা-মাড়াইয়েও এদের যথেষ্ট দক্ষতা রয়েছে। ফলে এ অঞ্চলে কৃষি কাজে শ্রমিক হিসেবে আদিবাসী নারী শ্রমিকদের চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। তবে পুরুষ শ্রমিকদের সাথে এদের মজুরির রয়েছে বড় ব্যবধান। একজন পুরুষ শ্রমিক দৈনিক মজুরি আড়াইশ টাকা। অথচ সমান কাজ করে আদিবাসী নারী শ্রমিকরা পাচ্ছেন দেড়শ টাকা।
এ বিষয়ে কথা হয় বরেন্দ্র অঞ্চল খ্যাত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের গোলাই গ্রামের আদিবাসী নারী শ্রমিক কল্পনা মুর্মুর সঙ্গে। তিনি বলেন, স্বামী-স্ত্রী দুজনেই অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে আমরা কাজ করি। দুজনের আয় দিয়েই চলছে সংসার। স্বামী মজুরি হিসেবে দিনপ্রতি পান আড়াইশ টাকা। অথচ আমাকে দেয়া হয় দেড়শ টাকা।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় থেকে মজুরির ক্ষেত্রে এ বৈষম্য চলে আসলেও ভয়ে আমরা মুখ খুলতে পারছি না। কারণ, মজুরি কম পাবার প্রতিবাদ করলে জমির মালিক কাজে নেবেন না। ফলে পরিবারের আট সদস্য নিয়ে কষ্টের মধ্যে পড়বো। কারণ, আমরা দুই জনে কাজ না করলে সংসার চলবে না। আদাবাসী নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে একই ধরনের পরিস্থিতি অন্য অঞ্চলগুলোতেও।
এ বিষয়ে কথা হয় আদিবাসী সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক গণেশ মার্ডির সঙ্গে। তিনি বলেন, এ অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীরা অধিকাংশই ভূমিহীন। অতিদরিদ্র আদিবাসী নারীরা পুরুষের পাশপাশি তেত-খামারে কাজ করেন। কিন্তু এ অঞ্চলের কৃষকরা সবসময় নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করছেন।
মজুরির ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের একই ধরনের অবস্থা নির্মাণ শিল্পের ক্ষেত্রেও। রাজশাহী নগরীর উদীয়মান নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে কয়েক হাজার নারী সম্পৃক্ত। শেফালি বেগম নামে এরকমই এক নারীর সঙ্গে কথা হয় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে। তিনি কাজ করছিলেন নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনে। তিনি বলেন, আমরা একইসঙ্গে আশি জন শ্রমিক কাজ করছি। এর মধ্যে ৫০ জন পুরুষ এবং ৩০ জন নারী। পুরুষ শ্রমিকদের তিনশ করে মজুরি দেয়া হলেও আমরা নারীরা পাচ্ছি দুইশ টাকা করে। আমরা অবিলম্বে এ ধরনের মজুরি বৈষম্যের অবসান চাই। একইভাবে রাজশাহী জেলায় চাতাল রয়েছে প্রায় দুই শতাধিক। চাতালগুলোতেও নারী শ্রমিকরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
তবে আশার কথা হচ্ছে, সারাদেশের মতো রাজশাহী অঞ্চলেও নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ধরনের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজও এগিয়ে চলেছে। এ ব্যাপারে জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহনাজ বেগম জানিয়েছেন, রাজশাহী নগরীর নারীদের কর্মমুখি করে তুলতে বছরে পাঁচটি ট্রেডে নারীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। দর্জি বিজ্ঞান, বিউটিশিয়ান, মোবাইল সার্ভিসিং, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শপিং ব্যাগ তৈরির এই প্রশিক্ষণে প্রতি তিন মাসে প্রতিটি ট্রেডে মোট ৫০ জন করে নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এর ফলে প্রতিবছর মোট দুইশজন নারীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া চারঘাট ও ও তানোর উপজেলাতেও এই প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু আছে। বাকি উপজেলাগুলোতেও শুরু করার পরিকল্পনা তাদের আছে। শহরের নারীরা এসব প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেরা কর্মমুখি হয়ে উঠছেন। অনেকেই ছোট ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলছেন।
অন্যদিকে কিছু সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন রাজশাহী উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রোজিটি নাজনীন। তিনি বলেন, এগিয়ে চলা নারী উদ্যোক্তাদের পিছুটান দিচ্ছে ব্যাংক ঋণ। ঋণ পেতে এখনও পদে পদে হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন প্রশিক্ষিত নারী উদ্যোক্তারা। তাদের কেউ কেউ ঋণ পেলেও তা চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়ার হার পুরুষ উদ্যোক্তাদের চেয়ে ভালো হলেও ব্যাংকগুলো নারীদের ঋণ প্রদানে আগ্রহ দেখাচ্ছে কম। এ সমস্যার দূর না করলে নারীর অগ্রগতি বাঁধাগ্রস্ত হবে।
নারী অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী অঞ্চলে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট (এসিডি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সালীমা সারওয়ার বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের গ্রামীণ ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পে এখন নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপক। ব্যবসা-বাণিজ্যেও জড়িয়ে পড়ছেন নারীরা। নারীরা তাদের শ্রম, মেধা আর যোগ্যতার মাধ্যমে লড়ছেন। জয়ী হচ্ছেন। তাই নারীদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে। তাহলে নারীরা আরও এগিয়ে যাবেন। এর ফলে রাজশাহী অঞ্চলের পাশাপাশি সারাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি তরান্বিত হবে।