পর্যালোচনার আগে ব্রাজিল থেকে মাংস আমদানি নয় : বাণিজ্যমন্ত্রী

আপডেট: অক্টোবর ২১, ২০১৯, ১:২৬ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


তৈরি পোশাকের বিনিময়ে বাংলাদেশে গরুর মাংস পাঠানোর যে প্রস্তাব ব্রাজিল দিয়েছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে তাতে সায় দেওয়া হবে না বলে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী জানিয়েছেন।
দেশের প্রাণিসম্পদ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা বরাবরই যে কোনো ধরনের মাংস আমদানির বিরোধিতা করছেন।
টিপু মুন্সী বলেছেন, “ব্রাজিল বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নিতে চায়। তবে তারা ব্রাজিলের গরুর মাংস বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই, আগে দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।”
শনিবার এক সেমিনারে মন্ত্রী একথা বলেছেন বলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এদিকে দেশ মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথে আমদানির বিষয়টি কপালে ভাঁজ ফেলেছে খামারি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তারা বলছেন, বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানি হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ, উৎপাদনকারী, খামারি ও শিল্প সংশ্লিষ্টরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তবে বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় আমদানির পক্ষেও মত দিয়ে আসছেন কেউ কেউ। বর্তমানে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে বাংলাদেশে হিমায়িত মাংস আমদানি হচ্ছে। তবে প্রাণিসম্পদ খাতের সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, বাংলাদেশ মাংস উৎপাদনে ‘স্বয়ংসম্পূর্ণ’ হওয়ায় আমদানির কোনও প্রয়োজন নেই।
এনিমেল হেলথ কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আহকাব) সভাপতি এম নজরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাংস আমদানি কেন? যেটার প্রয়োজন নেই সেটা আমদানি করতে হবে কেন? ”
ইতোমধ্যেই যে পরিমাণ মাংস আমদানি হচ্ছে তার প্রভাবও এই খাতে পড়েছে বলে মনে করছেন একজন ব্যবসায়ী। গাবতলী গবাদী পশুর হাটের ইজারাদার লুৎফর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গরুর মাংস আমদানিতে হাটে বেশ প্রভাব পড়েছে। গরু কেনা বেচা বেশ কমে গেছে, অন্তত ২০ ভাগ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মাংস ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা।” গত পাঁচ বছরে মাংস আমদানি ব্যয় তিনগুণের বেশি বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ২৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। দেশের খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় বিদেশ থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি না করার দাবি জানিয়ে গত সেপ্টেম্বরে সংবাদ সম্মেলন করে এ খাত সংশ্লিষ্ট ১০টি সংগঠন। ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরীফ আহমেদ চৌধুরী বলেন, জনপ্রতি দৈনিক ১২০ গ্রাম মাংসের চাহিদা ধরে দেশে বছরে মোট ৭২ দশমিক ৯৭ লাখ মেট্রিক টন মাংসের চাহিদা রয়েছে। আর ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি থেকে মোট ৭৫ দশমিক ১৪ লাখ মেট্রিক টন মাংস উৎপাদিত হয়েছে। অর্থাৎ ২ দশমিক ১৭ লাখ মেট্রিক টন উদ্বৃত্ত ছিল। “সরকারি তথ্যমতে, আমরা ইতোমধ্যে প্রাণিজ আমিষে স্বাবলম্বী হয়েছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, বিদেশ থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব বর্তমানে সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন। এটি বাস্তবায়ন হলে দেশীয় খামারি, উৎপাদনকারী ও সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শুধু তাই নয়, পরিবেশ ও কৃষিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।” আহকাব সভাপতি এম নজরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মাংস আমদানি বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতিতে। কারণ গ্রামীণ অর্থনীতি এই প্রানিসম্পদ খাতের ওপর ভর করেই গতিশীল হয়েছে। “এ খাতে প্রচুর নারী উদ্যোক্তাও রয়েছেন। তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।” বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সী বলেন, “আমাদের সরকারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই আজ বাংলাদেশ গরুর মাংস আমদানির প্রয়োজন হচ্ছে না। “একটি দেশের সাথে এফটিএ (মুক্ত বাণিজ্য) করার আগে দেশের শিল্প ও স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। সবদিক বিবেচনা করে বিশ্ব বাণিজ্য প্রসারের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় দেশের সাথে এফটিএ স্বাক্ষরের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হয়েছে।” দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ নিবন্ধিত গরু মোটাতাজাকরণ খামার এবং ৬০ হাজারের কাছাকাছি ডেইরি খামার রয়েছে। এই বাইরে রয়েছে অসংখ্য অনিবন্ধিত খামার। এছাড়াও গ্রামের দরিদ্র মানুষেরা পারিবারিকভাবে পশু পালন করে। এ খাতে সরাসরি অর্ধ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছাড়াও প্রাণির খাবার, চিকিৎসার মতো উপখাতগুলো শক্তিশালী হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান বাড়ছে।
এছাড়া পশুর চামড়া বাণিজ্য এবং চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পাদুকা শিল্পও মাংস আমদানি বেড়ে যাওয়ার অভিঘাতে ক্ষগ্রিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নজরুল ইসলাম বলেন, গত কয়েক বছর কোরবানির সময়ের বিপুল চাহিদারও যোগান আসছে দেশের পশু থেকে। “আর কিছু দিনের মধ্যেই মৎস্য ও সবজির মতোই বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাত বিশ্বে শীর্ষস্থানে চলে আসবে। তাহলে আমদানির প্রয়োজন কেন হচ্ছে?”-বিডিনিউজ