পহেলা বৈশাখের আশাবাদ

আপডেট: এপ্রিল ২০, ২০১৭, ১:২৪ পূর্বাহ্ণ

শুভ্রারানী চন্দ


প্রত্যেক জাতির দৈনন্দিন যাপিত জীবন, ভাষা, আচার, অনুষ্ঠান, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ধর্ম, চেতনা, ঐতিহ্য, তার সংস্কৃতির অংশ। দেশ, কাল, পাত্রভেদে সংস্কৃতির ধরনের ভিন্নতা থাকলেও প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে যা তার একান্ত প্রিয় ও আপন সত্ত্বার সাথে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। প্রতিটি মানুষের কাছে তার সংস্কৃতি অতীব মূল্যবান এবং এ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হচ্ছে ওই সংস্কৃতিতে বসবাসকারী ও বিশ্বাসী মানুষই। সংস্কৃতির খুব সহজ ধারণা হচ্ছে মানুষের জীবনাচর।
বাঙালি জাতিকে যেমন ভাষার জন্য লড়াই করতে হয়েছে, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে, তেমনি লড়াই করতে হয়েছে আমাদের সংস্কৃতির জন্য। মাত্র ৬ শতাংশ উর্দু ভাষাভাষী বাংলাদেশে (পূর্ব পাকিস্তান) বসবাস করা সত্ত্বেও ১৯৪৮ সালে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেবার সিদ্ধান্ত হলে বাঙালিরা রুখে দাঁড়ায় এর বিরুদ্ধে। পাকিস্তানিদের যুক্তি ছিল বাংলা মুসলমানদের ভাষা হতে পারে না অথবা যারা বাংলায় কথা বলে তারা মুসলমান হতে পারে না। বিভাজনের এ কূটচালটি পাকিস্তান সুকৌশলে চেলেছিল। সামান্য কিছু বাঙালির সমর্থন পেলেও এ চালটি অগ্রাহ্য ও প্রত্যাখ্যান করেছিল এ দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। পাকিস্তানিদের এ অনুদার ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এক সময় বাংলাদেশ রেডিও থেকে রবীন্দ্র সংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে। বাংলা ভাষাকে যেমন তারা গ্রহণ করতে পারেনি তেমনি বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ নতুন বছর অর্থাৎ ১ বৈশাখকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করাটাও ছিল পাকিস্তানি ভাবাদর্শের পরিপন্থী। সুতরাং, বাঙালির সংগ্রাম থেমে থাকেনি। যে কারণে আজ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয় ১ বৈশাখে। বর্ষবরণের নানা প্রস্তুতির ভেতরে যে “মঙ্গল শোভাযাত্রা” পালিত হয় দেশব্যাপি এবং তাতে যে নানা ধরনের মুখোশ বা ছবি বা চিত্রপট ব্যবহৃত হয় তা বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সংস্কৃতির ধারায় পরিবর্তন এলেও মূল ¯্রােত কখনও বিলুপ্ত হয় না এবং এখনও হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও এক শ্রেণির ঘরশত্রু বিভীষণ সব সময়ই বিদেশি শোষকদের পদলেহন করেছে। আজও তাদের অনুসারীরা নানা অপতৎপরতায় লিপ্ত। তার প্রমাণ পাই আমরা রমনার বটমূলে ১ বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা কিংবা যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলাসহ নানা কুকীর্তির মাধ্যমে। হেফাজতের প্রকাশ্য দাবি ছিল ১ বৈশাখের মঙ্গলযাত্রা নিষিদ্ধ করা। কিন্তু সাম্প্রদায়িক অপশক্তির সব সমালোচনা ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাঙালি উদারচিত্তে সামিল হয় মঙ্গল শোভাযাত্রায়, মেতে উঠে প্রাণের আনন্দে। সাধ ও সাধ্যের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ধনী-গরীব, শহর-গ্রাম, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বরণ করে ১ বৈশাখকে নানা আয়োজনে। বাঙালিরা নানা ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনকেও হার মানায় ১ বৈশাখ। কারণ ধর্মীয় উৎসবগুলো বিশেষ ধর্ম বা বর্ণের হওয়ায় সেখানে খানিকটা সম্প্রদায়গত আনুগত্যের বিষয় থাকলেও ১ বৈশাখ সার্বজনীন উৎসব।
মঙ্গল শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়াও মেলার আয়োজনে থাকে আবহমান বাংলার নানা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিলন। ঢোল, বাঁশি, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, পুতুল, গরু, ঘোড়া, হাতি, নানা খেলনা, মুড়ি, মুড়কি, পাটালী গুড়, জিলাপী, দানাদার, পিঠা, তরমুজ, ফুটি, বেল এমনকি নানা ধরনের দেশীয় মাছও মেলে এসব বৈশাখী মেলায় এবং এসব মেলা চলে কয়েকদিন ধরে। বিনিময় হয় একের সাথে অন্যের কুশল বার্তা। প্রকৃতিতেও সাড়া জাগে নতুনের আহ্বানে। কচি সবুজ পাতার সমারোহ গাছে গাছে বেলী, টগর, গন্ধরাজ, হা¯œাহেনা আর মাধবী ফুলের মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকে বাতাস। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস  নিতে নিতে জীবনীশক্তিও বেড়ে যায়। কোকিলের কলতান আমাদের পরম আনন্দ দেয়। সুতরাং, গণমানুষের এ সাংস্কৃতিক মেল বন্ধন, প্রাণের উচ্ছ্বাস, বাঁধভাঙ্গা আনন্দ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মূল্যবোধকে কোন সাম্প্রদায়িকতা কিংবা জঙ্গিবাদী কর্মকা- দিয়ে স্তব্ধ করা সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎসব উপলক্ষে লেখা-
“প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকী, কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ যে সমস্ত মানুষের সাথে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করিয়া বৃহৎ।” ১ বৈশাখ নতুন বছরের আগমনী বার্তা আমাদের একক “আমিকে” সম্মিলিত করে এক বৃহৎ মহীরূহে পরিণত করে, যাকে প্রতিহত করবার, রুখে দাঁড়াবার কিংবা সে প্রাণের মেলায় সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াবার স্পর্ধা কোন অপশক্তিরই থাকে না। এটাই বাঙালি সংস্কৃতি এবং বাঙালি সত্ত্বা। বাঙালি ধর্মপ্রাণ জাতি কিন্তু ধর্মান্ধ নয়।
এ বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একটু ভিন্ন হওয়ায় সরকারিভাবে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় সারা দেশে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা অনুষ্ঠান স্থলে যাওয়া-আসায় নানা বিধি-নিষেধ থাকায় অনেকে মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় একটু সমস্যায় পড়েছেন। অনুষ্ঠানগুলোর সময়সীমা বেধে দেয়ায় অনেকেরই সেটা পছন্দ হয়নি। কারণ অন্যান্য বছরগুলোতে সন্ধ্যার পরও থাকে মানুষের ঢল নানা উৎসব আয়োজনে এ বছরে সেটা সম্ভব হয়নি।
আনন্দের সময়সীমা বা আনুষ্ঠানিকতার সময়সীমা সীমিত হলেও মানুষ নিরাপদে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে পেরেছে এটা অনেক বড় স্বস্তির বিষয়। কারণ বিগত বছরে ১ বৈশাখের অনুষ্ঠানে ঢাকায় বিশেষভাবে মেয়েরা যে হয়রানির শিকার হয়েছিল পত্র-পত্রিকা বা পরিচিত অপরিচিতজন কারো কাছে তেমন একটি ঘটনার কথাও জানা যায় নি-এটা অনেক বড় পাওয়া। ধন্যবাদ জানাই সরকার, নিরাপত্তা বাহিনীসহ এদেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের। বেশি আনন্দ করতে গিয়ে বেসামাল বা বিশৃঙ্খল আচরণ কারো কাম্য নয়। কারণ আমরা জানি-“ংসধষষ রং নবধঁঃু.)
বাঙালি যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক আমাদের আগামী প্রজন্ম এটিকে নিয়ে যাবে এক নতুন উচ্চতায়। ১ বৈশাখের যে প্রাণের উচ্ছ্বাস, উজ্জ্বলতা, মহামিলনের যে মন্ত্র তা এ জাতি ও দেশকে অনুপ্রাণিত করবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে।
আমরা অত্যন্ত গর্বিত আমাদের ১ বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ “মঙ্গল শোভাযাত্রা” এখন ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত। তালিকায় আরো যুক্ত আছে আমাদের সুন্দরবন, পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার, ষাট গম্বুজ মসজিদ (বাগেরহাট), বাউল গান, জামদানি শাড়ি ইত্যাদি। এছাড়াও এদেশের পাট, আম ও ইলিশ মাছের কথাও শোনা যায় এ তালিকায় স্থান পাবে, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
আসুন ১ বৈশাখে আমাদের অঙ্গীকার হোক অসাম্প্রদায়িকতার মহামিলনকে মহাশক্তিতে পরিণত করে ঐক্যবদ্ধভাবে এদেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে নতুন সম্ভাবনা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে সমৃদ্ধ করি, বিনির্মাণ করি সোনার বাংলাদেশ।