পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ

আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০১৭, ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ

মো. আশরাফ আলী



বাঙালির প্রধান ও প্রিয় উৎসব পহেলা বৈশাখ। বাঙালি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ। বাংলা সনের প্রথম দিনটাই হলো পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ। পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালির আচার অনুষ্ঠান সমূহের মধ্যে অগ্রগন্য। কারণ এ দিনটা জাতি ধর্ম বর্ণ গোত্র গোষ্ঠী, সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলে যৌথভাবে উদযাপন করে থাকে।
বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক হলেন ভারত উপমহাদেশের অবিসংবাদিত মুঘল শাসক মহামতি সম্রাট আকবর। সম্রাট আকবর ১৬ মার্চ, ১৫৫৬ সালে সিংহাসন আরোহণের পর থেকেই বঙ্গাব্দ তথা বাংলা সন গণনা শুরু হয়। রাজকার্য সম্পাদনে হিজরি সাল নিয়ে কিঞ্চিৎ অসুবিধার সৃষ্টি হলে তিনি বঙ্গঁদেশ বা সুবে বাঙ্গাঁলার জন্য পৃথকভাবে বাংলা সন সৃষ্টির নির্দেশ দেন। তিনি তাঁর নবরতেœর বাইরে দশম রতœ প-িত, জ্যোতিষী এবং আমির ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজীকে বাংলা সন আবিষ্কারের দায়িত্ব দেন। সম্রাটের নির্দেশনুযায়ী প্রচলিত হিজরী সন এবং বাংলা সনের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে সম্রাটের রাজজ্যোতিষী মহাপ-িত আমির ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজী বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। আর তখন থেকেই মানুষ বাংলা নববর্ষে তাদের হিসাব-নিকাশ, দেনা-পাওনা, খাজনা পরিশোধ ও বিভিন্ন প্রকার লেনদেন সম্পাদন করে আসছে।
বাঙালি জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নববর্ষকে বরণের নিমিত্তে গ্রামে-গঞ্জে, শহর-বন্দরে, রাজনীতিতে বাংলা সন, পহেলা বৈশাখ ও নববর্ষ নিয়ে সাংস্কৃতিক উৎসবে মেতে উঠে। নববর্ষের দিনে চারুকলা ইন্সটিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীরা লোকজ চিত্রকলা এঁকে লোকজ সাজে হাতি, ঘোড়া ও পেঁচার মুখোশ তৈরি করে বৈশাখী র‌্যালিতে অংশ নিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত নাট্যকলা ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ছায়ানট এ দিনে ভোর থেকেই রমনার বটমূলে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মাধ্যমে এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করে থাকে। সকাল থেকেই বাঙালি জাতির শিরা-উপশিরা, ধমণী এবং প্রতিটা রক্তকণা কবিগুরুর আহবান-
‘‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো
তাপস নিঃশ্বাস বয়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক’’
এর মাধ্যমে নববর্ষকে সাদরে বরণ করে নেয়।
পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে ছেলেরা পাজামা-পাঞ্জাবী এবং মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাড়ি পরিধান করে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পহেলা বৈশাখের স্রোতধারাকে অব্যাহত রাখে। এ ছাড়াও বাঙলা নববর্ষে সকালে সেই পান্তা ভাতের সাথে বড় মাছ, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ ও বিভিন্ন  ভর্তা পরিবারের সকলকে খেতে দেওয়া হয়। বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি সম্পৃক্ত একটা আনন্দময় দিন। এই দিনটাকে যথাযথ মর্যাদায় পালনের নিমিত্তে বৈশাখী মেলা, হালখাতা এবং পুণ্যাহ ইত্যাদি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
বৈশাখী মেলাতে মৃৎ ও কুটির শিল্প জাত পণ্যাদির কেনা বেচা হয়। বৈশাখী মেলাতে মানুষের প্রধান আকর্ষণ থাকে বিভিন্ন মিষ্টি মিষ্টান্নের প্রতি। নানান মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসে মেলা। আর আগত ক্রেতারা কম বেশি সবাই মিষ্টি ক্রয় করে আপন আপন বাড়িতে ফেরে।
বাংলা নববর্ষের আর একটা অন্যতম দিন হলো শুভ হালখাতা। শুভ হালখাতার দিবসে সারা বছরের যত বকেয়া থাকে তা হিসাব-নিকাশ করে পুরাতন হিসাবের খাতা বাদ দিয়ে নতুন বছরের নতুন খাতা খোলেন ব্যবসায়ীরা।
“পুণ্যাহ” পহেলা বৈশাখের আর একটা সার্বজনীন অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠান শুধু জমিদার মহলেই প্রচলিত ছিল। দেশ বিভক্তির পরে জমিদার প্রথা উচ্ছেদের সাথে সাথে এ অনুষ্ঠান প্রায় বিলুপ্তির পথে। এখনও গ্রাম বাংলার প্রাচীন জমিদার বংশের উত্তরাধিকারীরা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে গ্রামবাসীকে আপ্যায়ন করে পুণ্যাহকে স্মরণ করে। মূলত পুণ্যাহ অনুষ্ঠানে জমিদাররা প্রজাদের কাছ থেকে পাওনা খাজনা আদায় করতো। প্রজাদের আপ্যায়নের জন্য জমিদার কাছারি বাড়িতে সারাদিন পান মিষ্টির আয়োজন করা হতো।
সর্বোপরি আমরা এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি পহেলা বৈশাখ হলো বাঙালি জাতির একটা ঐক্য তথা মিলনমেলার দিন। পহেলা বৈশাখের দিনে মানুষের মাঝে থাকে না কোন হিংসা বিদ্বেষ বিষবাষ্পের চিহ্ন। এই দিনে মানুষ একে অপরকে প্রীতির ডোরে আবদ্ধ করে দেয়। মানুষের মাঝে সৃষ্টি হয় এক অকৃত্রিম মেলবন্ধন।
পহেলা বৈশাখ মানুষকে নব উদ্যমে কাজ করার অনুকম্পা এবং অনুপ্রেরণা যোগায়। বিশেষ করে এই দিনে মানুষ পুরাতন বছরের যত ব্যর্থতা এবং গ্লানি সব মুছে ফেলে ফিনিক্স পাখির মত নতুন জীবনের সফলতা কামনা করে। পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ বাঙালির মনে নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলার প্রেরণা যোগায়। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি পহেলা বৈশাখের ঐতিহ্য তার বক্ষে ধারণ করে আছে এবং আমরা এই ঐতিহ্যকে লালন করছি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ।
লেখক : অধ্যক্ষ, আড়ানী ডিগ্রি কলেজ, বাঘা, রাজশাহী।