পাঁচ বছরে দরকার ৬৫ লাখ শ্রমশক্তি || বিকল্পহীন ডিপ্লোমা বাংলাদেশের সমৃদ্ধি

আপডেট: সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৭, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়


বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মহিতের সার্বিক তত্ত্বাবধানে অর্থমন্ত্রণালয়ের অনুদানে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডি-এর উদ্যোগে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এবং দক্ষ মানবসম্পদ ঘাটতি শীর্ষক গবেষণা মূলক একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
অর্থমন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গত ২৩ জুলাই ২৬৫ পৃষ্ঠার বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেন বিআইডিএসের মহাপরিচালক কেএস মুর্শেদী।
দেশ স্বাধীনের পর থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নমূলক প্রতিবেদন তৈরিতে অনেক কমিটি, উপ-কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সরকারের কোষাগার থেকে কাড়ি কাড়ি অর্থ ব্যয় করে সভা, সেমিনার, সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছে। অথচ বাস্তবধর্মী কোনো প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে। দেশের শ্রমবাজার এবং দক্ষ মানবসম্পদ ঘাটতিতে বাস্তবধর্মী গবেষণামূলক প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য অর্থমন্ত্রী, বিআইডিএসসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে ‘ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল’, বাংলাদেশ
বিশ্ব আজ প্রযুক্তি উৎকর্ষতার স্বর্ণশিখরে অবগাহন করছে। বিশ্বের যেই দেশ যত বেশি এই উৎকর্ষতার সাথে নিজেদের মেলাতে পারছে তারাই উন্নয়ন, অগ্রগতিতে এগিয়ে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত এবং অব্যাহত উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপি সামগ্রিক দক্ষতার ক্ষেত্রে প্রায় ৪০/৪২ ভাগ ঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বলা হচ্ছে। এ অবস্থায় বিশ্বের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহে চলমান ও আগামীর দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি মোকাবেলায় নানামুখি কার্যযজ্ঞ শুরু হয়েছে বিশ্বময়।
বাংলাদেশে সর্বক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন দক্ষতার ঘাটতি ভয়াবহ। ফলে জাতীয় উন্নয়ন-উৎপাদনে প্রত্যাশিত লক্ষ্য ও গতি ব্যাহত হচ্ছে। প্রযুক্তিজ্ঞান উদ্দ্যেশ্যহীন শিক্ষা জাতির কল্যাণে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে না। শিক্ষা এবং শ্রমশক্তি উদ্দ্যেশ্য করে বিআইডিএস তৈরি পোশাক, নির্মাণ, চামড়াজাত, কৃষি প্রক্রিয়াজাত- এ রকম নয়টি খাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৫ লাখ দক্ষ শ্রমশক্তি দরকার বলে হিসাব কষে দেখিয়েছেন। ‘বাংলাদেশে শ্রমবাজার এবং দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন অভিমত উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষ এমনকি আধা দক্ষ শ্রমশক্তির বেশি অভাব পোশাক খাতে। এর পরই রয়েছে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত। দুটিসহ নয়টি খাতে দক্ষ ও আধা দক্ষ শ্রমশক্তি প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৯ খাতের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি, ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। ৭ দশমিক ৭ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নির্মাণ খাত। কর্মসংস্থান তৈরিতেও এ দুই খাতের অবদান ভালো। তবে খাত দুটিসহ কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, পযর্টন, হালকা প্রকৌশল, চমড়াজাত পণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, জাহাজ নির্মাণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত শ্রমশক্তির বড় অভাব। প্রতিবেদনে তৈরি পোশাক খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দক্ষ ২২ লাখ ৫৮ হাজার, আধা দক্ষ ১২ লাখ ৩০ হাজার এবং অদক্ষ কর্মীর চাহিদা ছিল ৬ লাখ ১৮ হাজার। ২০১৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতের জন্য ৫০ লাখ ২৭ হাজার দক্ষ লোকের দরকার পড়বে বলে জানিয়েছে।
এছাড়া নির্মাণ খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দক্ষ ১০ লাখ ১০ হাজার, আধা দক্ষ ১২ লাখ ৬০ হাজার এবং অদক্ষ ৯ লাখ ১০ হাজার জনের চাহিদা ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই খাতের জন্য দক্ষ ১৫ লাখ ৪০ হাজার, আধা দক্ষ ১৯ লাখ ২০ হাজার এবং অদক্ষ ১৩ লাখ ৯০ হাজার জনের দরকার পড়বে। এভাবে মোট নয়টি খাতের ১০ বছরের একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হয়।
চিন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম পোশাক শিল্পে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের প্রারম্ভিক বেতন ৯ শত থেকে ১২ শত ডলার। কৃষি প্রক্রিয়াজাত কিছু কারখানাও তাদের মতো করে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়। তবে বেশির ভাগকেই নির্ভর করতে হয় অপর্যাপ্ত সরকারি প্রশিক্ষণ সুবিধার ওপর। দরকার এখন উপজেলা, জেলা পর্যায়ে প্রোল্ট্রি, মৎস্য ইনস্টিটিউট নির্মাণ করে আনুষ্ঠানিক ডিপ্লোমা প্রশিক্ষণের। সরকারি বরাদ্ধ ও প্রচারণায় শুধু নির্মাণ খাতে প্রশিক্ষণ হচ্ছে, তবে প্রশিক্ষণ সক্ষমতা যদি প্রতিবছর ১০ শতাংশ করেও বাড়ে, আগামী ১০ বছর পরও পরিস্থিতি একই জায়গায় থাকবে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের মধ্যে ডাক্তারের সংখ্যা ভালো থাকলেও অভাব রয়েছে সেবিকার (নার্স)। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ফার্মেসি কাউন্সিল, নার্সিং কাউন্সিল, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদ প্রদত্ত ডিগ্রি আন্তর্জাতিকমানের নয়। তবে সব মিলিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে অন্তত ৪১ হাজার লোকের প্রশিক্ষণের দরকার হবে। প্রতিবেদনমতে, পর্যটন খাতে বড় সমস্যা হচ্ছে বাস্তব প্রশিক্ষণের অভাব এবং আইটি ও ইংরেজি ভাষায় দক্ষতার ঘাটতি। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও পর্যটন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা ডিগ্রি শিক্ষা শুরুই করা হয়নি। ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাতে প্রশিক্ষণ দরকার ১ লাখ ৪৪ হাজার লোকের।
শিল্প খাত বড় সমস্যায় ভোগে মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকদের আইসিটি জ্ঞানের অভাব নিয়ে এবং এতে শিল্পের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি হয় না। প্রতিবেদনে বলা হয় ২০২০-২১ অর্থবছরে এই খাতে ১ লাখ লোকের প্রশিক্ষণের দরকার পড়লেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রশিক্ষণের দরকার পড়বে ১০ লাখ ৫৯ হাজার লোকের।
চামড়াজাত পণ্যের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের অবস্থা খুবই খারাপ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, বর্তমানে এই খাতে যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তা অনেকটা সমুদ্রের মধ্যে এক ফোঁটা পানি ফেলার সঙ্গে তুলনীয়। চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের দফায় দফায় নির্দেশনা হলেও লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কোন উদ্যোগই নেয়া হয়নি। তিন বছর পরই এই খাতে প্রশিক্ষণের দরকার পড়বে ১ লাখ ৮ হাজার এবং তার পাঁচ বছর পর দরকার পড়বে ১ লাখ ৫০ হাজার লোকের। গভীর পরিতাপের বিষয় যে, উল্লিখিত খাতসমূহে প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স চালু করার সুর্নিদিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়ে আমরা গত বিশ বছর ধরে সরকারের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারকদের দৃষ্টি আকষর্ণের চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে আমাদের কিছু প্রকাশনাও রয়েছে। কিন্তু সরকার এতদিন নির্বিকার দিনযাপন করছে।
যেখানে দক্ষ শ্রমিকের প্রকট অভাব সেখানে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা নিয়ে দেশি বিদেশি গবেষণা সংস্থা উদ্বিগ্ন। গবেষণা মতে বাংলাদশের ৪৭ শতাংশ যুবকই বেকার। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলছে, দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী বেকার যুবকের সংখ্যা ১ কোটি ৩২ লাখ। বাংলাদেশে এখন ১০ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ কর্মক্ষম, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬৬ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। দেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট রিসার্চ (সিডার) কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজার পর্যালোচনা ২০১৭’ শিরোনামে যে সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার উচ্চশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবেচেয় বেশি। বাংলাদেশে এখন ৪ কোটি ৩৪ লাখ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। তাদের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ এ মুহুর্তে পড়াশোনা করছে না, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে না এবং কোনো কাজকর্মও করছে না। অর্থাৎ, এই বিপুলসংখ্যক তরুণ-যুবা জীবনযাপনের জন্য সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞরা এদের নাম দিয়েছে ‘নিস্ক্রিয়’। এই নিস্ক্রিয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে দুর্ভাগা হলো ‘উচ্চশিক্ষিত’ অংশ।
ওই প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, যাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশি, তাঁর চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কম। যাঁরা ডিপ্লোমা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাঁদের মধ্যে বেকারত্বের হার শূন্য। আর যাঁরা অনার্স-মাস্টার্স পাস করেছেন, তাঁদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বাস্তবায়ন তখনই সম্ভব, যখন মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, প্রকৃত শিক্ষা, দর্শন, সততা, নৈতিকতা ও সার্বজনিন চিন্তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়। গবেষণা, প্রতিবেদন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষামন্ত্রীকে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার নামে ভণ্ডামি আর লুটপাট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর তা হলেই দেশ প্রত্যাশিত পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের দেশ-বিদেশের বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ ও ইনস্টিটিউটগুলোতে যুগোপযোগী নিত্যনতুন চাহিদা মোতাবেক টেকনোলজি বা বিভাগ চালু কতে হবে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মবান্ধব করতে হলে একে তার চিরচেনা ও গতানুগতিক ধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সরকারি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে হবে এবং বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দিতে হবে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত ভ্রান্তনীতির মাত্র একটি খাতের জন্য বৃত্তিমূলক নামীয় পরিত্যক্ত দর্শন বাতিল করতে হবে। আগামী ৮ বছরে ৯টি প্রধান খাতে ৬৫ লাখ দক্ষ শ্রমশক্তি প্রশিক্ষণের ভার বহনের সম্মিলিতভাবে সক্ষমতা অর্জনকারী নতুন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এক্ষেত্রে গবেষণালব্দ নয়টি খাতের সমন্বয়কারী হিসাবে দর্পের সাথে আবির্ভুত হতে পারে বিভাগভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড।
লেখকদ্বয় : সভাপতি ও মহাসচিব, ডিপে¬ামা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

Khanaranjanroy@gmail.com