পাকিস্তানের ফেলে আসা হিন্দুদের বাড়ি কেমন আছে?

আপডেট: সেপ্টেম্বর ৬, ২০১৭, ১:০৭ পূর্বাহ্ণ

সোনার দেশ ডেস্ক


লাহোর থেকে প্রায় ৩২০ কিলোমিটার দূরে ডেরা ইসমাইল খাঁ।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়ে সেখান থেকে বেশ কিছু হিন্দু পরিবার নিজের ঘর থেকে ভারতে চলে এসেছিলেন। কিন্তু সে ফেলে আসা ডেরা ইসমাইল খাঁয়ের চিহ্ন এখনও রয়ে গেছে ভারতেই।
ডেরা থেকে আসা মানুষরা সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতি, জীবন যাপনের পুরনো রীতি এখনও মেনে চলেন।
কিন্তু সেই সব হিন্দুদের বাড়িঘর এখনও অক্ষত রয়ে গেছে ডেরা ইসমাইল খাঁয়ে। ঘরের বাইরে এখনও দেখা পাওয়া যায় খোদাই করে রাখা হিন্দু গৃহকর্তাদের নাম।
কোনও বাড়ির সদর দরজার ওপরে লেখা আছে ‘বাবা ভগবান দাস, ১৯১৬’। কারও বাড়ির ছাদে রয়ে গেছে সেই সব কিছু চিহ্ন, যা থেকে পরিবারের টুকরো টুকরো কাহিনী এখনও জানা যায়। হিন্দু আর শিখ পরিবারগুলোর বাড়িতে তাদের নাম ফলক অটুট রয়েছে এখনও।
দিল্লির লাগোয়া গুরু গ্রামের বাসিন্দা প্রেম পিপলানি দেশভাগের সময়ে ডেরা ইসমাইল খাঁ থেকেই এসেছিলেন ভারতে।
৭০ বছর পরেও তিনি ডেরার স্থানীয় ভাষা ‘সরাইকি’তেই কথা বলেন।
বিবিসি-র কাছে দেশভাগের স্মৃতি তুলে ধরছিলেন প্রেম পিপলানি।
“খুব অশান্ত পরিস্থিতি চারদিকে। একবার তো আমার ওপরেই তলোয়ার দিয়ে হামলা হল। বহু লোক ভারতে চলে এসেছে সেই সময়ে। যে যেখানে পেরেছে, মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরি করে নিয়েছে। আমি নিজেই ৫০ বছর জলন্ধরে ছিলাম, তারপরে গুরুগ্রামে এসেছি,” বলছিলেন মি. পিপলানি।
ব্যবসার কাজে প্রায় সারা পৃথিবীই ঘুরেছেন মি. পিপলানি। কিন্তু ফেলে আসা দেশের কথা কখনও ভোলেন নি। চলে আসার ৫৭ বছর পরে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন তিনি – ডেরা ইসমাইল খাঁয়ে নিজের বাড়ি খুঁজতে।
“ডেরায় পা রাখতেই সেই চেনা মাটির গন্ধ নাকে লাগল। চারপাশটা খুব চেনা লাগছিল। একটা অদ্ভুত ভাল লাগা ঘিরে ধরেছিল। আমার বয়স ৮৫, কিন্তু নিজেকে মনে হচ্ছিল ৪০ বা ৫০ বছর বয়সের লোক। এতদিন পরেও কিছুই বদলায় নি। আমাদের বাড়িটা রয়ে গেছে, গোয়ালঘর, মন্দির – সব রয়েছে,” স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন প্রেম পিপলানি।
মি. পিপলানির ঠাকুরদা ১৮ শতকে তৈরি করিয়েছিলেন তাঁদের বাড়িটা।
এত বছর পরে সেটা দেখতে পেয়ে যে কী আনন্দ হয়েছিল, তা কথায় প্রকাশ করা কঠিন মি. পিপলানির পক্ষে। তাঁদের বাড়িতে এখন সরকারি স্কুল চলে।
প্রেম পিপলানি যেমন অবাক হয়েছিলেন এতো বছর পরে পৈত্রিক বাড়ি দেখে, তেমনই অবাক হয়েছিলেন ডেরা ইসমাইল খাঁয়ের বর্তমান বাসিন্দারাও – মি. পিপলানির মুখে ‘সরাইকি’ ভাষা শুনে।
বুলন্দ ইকবাল বিবিসিকে বলছিলেন, “ভারত থেকে এসে কেউ আমাদের সরাইকি ভাষায় কথা বলছে জেনে সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। কথায়-কথায় জানতে পারি ভারতে এমন বেশ কিছু মানুষ আছেন, যারা একদম আমাদেরই মতো!”
শুধু ভাষাই নয়, ডেরা ইসমাইল খাঁয়ের জীবনযাপনের খুঁটিনাটিগুলো এখনও মনে আছে মি. পিপলানির। কিন্তু তাঁর পরিবারের নতুন প্রজন্ম সেসবের বিশেষ খোঁজ রাখে না।
তাঁর মেয়ে নীলিমা ভিগ বলছিলেন, “আমি সরাইকি ভাষার কয়েকটা শব্দ বুঝতে পারি, কিন্তু পুরো ভাষা জানি না। বিশেষ বিশেষ দিনে বা কোনও উৎসবে বাবা ঠিক সেইরকম পোশাক-আশাক পড়েন, যেগুলো ডেরার বাসিন্দারা পড়ে থাকেন।”
গুরুগ্রামেই আরও এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যারা পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে এসেছিলেন।
ডেরা থেকেই চলে আসা রাজকুমার বাওয়েজা বলছিলেন, “ডেরার পরিবেশটাই অন্যরকম ছিল। হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গেই থাকতাম, সব উৎসবও একসঙ্গেই পালন করা হত। সীমান্ত তৈরি হয়ে গেল, আর সব কিছু বদলে গেল হঠাৎ করেই।”
“আমাদের পরিবারের মানুষরা সবাই আলাদাভাবে এসেছিলেন ভারতে। এদিক ওদিক ছড়িয়ে গিয়েছিলেন সবাই। সকলে আবার এক জায়গায় হতে প্রায় সাত মাস লেগেছিল,” বলছিলেন সহদেব রাত্রা।
ডেরা ইসমাইল খাঁ থেকে আসা মানুষদের মধ্যে এখনও খুব কমই জীবিত আছেন যারা সেখানকার ভাষা বলতে পারেন।
কিন্তু তাঁরা যখন কোনও উৎসবে এক জায়গায় মিলিত হন, তাঁরা নিজেদের ফেলে আসা দেশের ভাষা ‘সরাইকি’তেই কথা বলেন, ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি হাতড়ান বা কেউ গেয়ে ওঠেন সরাইকি লোকগান।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা