পাঠকের মতামত- ইদুল আজহা : গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আপডেট: জুলাই ১৮, ২০২১, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ

অধ্যক্ষ মজিবুর রহমান:


মুসলিম বিশ্বে তিনটি ঈদ পালিত হয়ে থাকে। ১. ইদুল আয্হা ২. ইদুল ফিতর এবং ৩. ইদে মিলাদুন্নবি। ইদে মিলাদুন্নবি পালিত হয় নবী করিম (সা.) এর আবির্ভাবকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য। এটি পালিত হয় তাঁর জন্ম দিন ১২ রবিউল আউয়াল তারিখে। যা মুসলমানদের নিকট ইদে মিলাদুন্নবি নামে পরিচিত। ইদুল ফিতর পালিত হয় গোটা রমজান মাসের রোজা শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে। মুসলমানদের নিকট এটি একটি বিশেষ আনন্দের দিন হিসেবে পালিত হয়।
ইদ অর্থ খুশির দিন। ইদ অর্থ আনন্দের দিন। আরবি ‘কুবর’ শব্দ থেকে কুরবানি শব্দের উৎপত্তি। কুবর অর্থ নৈকট্য, কুরবান অর্থ উৎসর্গ করা। কুরবান শব্দটি উর্দ্দু, হিন্দি এবং ফারসি ভাষাতে বহুল প্রচলিত। অর্থাৎ আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় যা কিছু উৎসর্গ করা হয়, তাই কুরবানি। এ লক্ষ্যে স্বচ্ছল ব্যক্তি গরু, ছাগল, দুম্বা, উট ইত্যাদি পশু কুরবানি দিয়ে থাকে। মুসলমানদের নিকট মানব সভ্যতার ইতিহাসে পশু কুরবানি দেয়া এক প্রাচীন রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসছে। ইদুল আজহা তাই আত্মত্যাগের স্বমহিমায় উজ্জ্বল পবিত্র একটি দিন। সত্যের সুকঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর আনুগত্যের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা আজও অবিস্মরণীয়। এই ঈদের সূচনা হয়েছিল হযরত মোহাম্মদ (আ.) এর পূর্ব পুরুষ হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর স্বপ্নের তাহির বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মক্কা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মিনা এলাকায়। যেখানে বর্তমানে মসজিদে ‘খায়ফ’ অবস্থিত। সেখানেই হযরত ইসমাইল (আ.) একটি পাথরের উপর শুয়ে পরেন পিতার আদিষ্ঠ স্বপ্নের ছুরির নীচে। নিজেকে কোরবানী করার জন্য। কিন্তু আল্লাহ পাকের ইশারায় তিনি কোরবানী না হয়ে হয় জান্নাত থেকে আসা একটি দুম্বা। হযরত ইব্রাহিম (আ.) চোখ খুলে দেখতে পান যে তাঁর প্রাণপ্রিয় ছেলে ইসমাইল (আ.) কোরবানি হয়নি, হয়েছে জান্নাতের দুম্বা। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে, হে ইব্রাহিম তুমিতো স্বপ্নাদেশ সত্যি সত্যিই পালন করলে, এই ভাবে আমি সৎ কর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করবো। নিশ্চয় এটা ছিল একটি পরীক্ষা, তুমি এ পরীক্ষায় পাশ করেছ। আমি ইসমাইলকে মুক্ত করেছি কুরবানির বিনিময়ে। আমি আশাকরি পরবর্তীরা তা স্মরণ করবে। সূরা- সাফফাত : আয়াত- ১০২।
আমরা সবাই জানি যে, হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে মহান আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিয়েছিলেন তার অতি প্রিয় বস্তুকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি করার জন্য। হযরত ইব্রাহিম দেখলেন তাঁর সর্বাধিক প্রিয় তাঁর ৮৬ বছর বয়সে যে সন্তান লাভে পিতৃত্বের সৌভাগ্য অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) তাঁর সর্বাধিক প্রাণপ্রিয় জন। তাই তিনি আল্লাহকে খুশি করতে প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইলকে কোন প্রকার দ্বিধা না করে কুরবানি দেয়ার জন্য নিয়ে যান মিনার প্রান্তরে। শয়তান তাঁকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে ৭ টি পাথর মেরে শয়তানকে বিতাড়িত করেন। তাই আজও হাজিরা সেই স্থানে শয়তানকে লক্ষ্য করে সাতটি কংকর পাথর নিক্ষেপ করেন। আল্লাহ ইরশাদ করেন, আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি। সূরা- হজ্জ : আয়াত- ৩৪।
হযরত আদম (আ.) এর দুই পুত্র ‘হাবিল ও কাবিল’। যখন তারা উভয়েই কুরবানি দিয়েছিল তখন একজনের কুরবানি কবুল হয়। অপরজন কাবিলের কুরবানি কবুল হয়না। সে বলে আমি তোমাকে হত্যা করব, কেন আমার কুরবানি কবুল হলোনা। তখন অপরজন হাবিল বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন। সূরা- মায়িদা : আয়াত- ২৭। অর্থাৎ আমাদের মুত্তাকিন হয়ে কুরবানি করতে হবে। হযরত মুসা (আ.) কে আল্লাহ একটি হলুদ বর্ণের তাজা গরু কুরবানি দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি যখন তার নিজ কওমকে বলেন, আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবেহ করার আদেশ দিয়েছেন। কীরকম গরু জানতে চাইলে মুসা (আ.) বলেন তার রং হলুদ অর্থাৎ উজ্জ্বল গাঢ় হবে, যাকে দর্শকরা ভালো বলে। সূরা- বাকারা : আয়াত- ৬৭, ৬৮। অর্থাৎ কুরবানির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এবং তাকওয়া অর্জন করা। আল্লাহর নিকট পৌছেনা কুরবানির পশুর গোশ্ত ও রক্ত বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। সূরা- হজ্জ : আয়াত- ৩৭।
পবিত্র ইদুল আয্হা সেই কুরবানীর চেতনাকে সমুন্নত করেছে। ইদের দিন গোসল করে সাধ্য অনুয়ায়ী ভালো ও পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করে আতর-সুরমা লাগিয়ে, “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ” সমস্বরে পড়তে পড়তে ইদগাহ/মসজিদে যাওয়া, ইমামের পিছনে ছয় তাকবিরের সঙ্গে দু’রাকাত ইদুল আজহার ওয়াজিব সালাত আদায়, ইমাম সাহেবের কুরবানির মাহাত্ম্য বর্ণনার খুদবা শ্রবণ করা ওয়াজিব। কুরবানির পশু জবেহ এর পূর্বে দোয়ায় বলা হয় নিশ্চই আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ সম্পূর্ণ মহান রাব্বুল আলামিনের জন্য।
এই পবিত্র দিনে আমাদের প্রার্থনা, হে নিখিল বিশ্বের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান ¯্রষ্ঠা, আমাদের প্রতি রহমত বর্ষিত করুন এবং বর্তমানের কোভিড-১৯ নামক রোগ থেকে মুক্ত করুন। সকলের মঙ্গল করুন। আমিন।